রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ার পদ্মাপাড়ে চলছে মাতম। বুধবার বিকেলে বাসডুবি ঘটনার পর ২৪ ঘণ্টায় উদ্ধার হয়েছে ২৬ জনের মরদেহ। শুরুতেই ১১ জন যাত্রী নানাভাবে প্রাণে বেঁচে ফিরলেও সৌহার্দ্য পরিবহনের অন্তত ১২/১৩ জন যাত্রী নিখোঁজ বলে ধারণা করা হচ্ছে। বুধবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি পল্টুনে ফেরির জন্য অপেক্ষা করছিল। এ সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে যায়। প্রায় সাত ঘণ্টার প্রচেষ্টায় উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা বাসটিকে টেনে ওপরে তোলে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল বাসের মধ্যে থেকে ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করে। অনেক মরদেহ স্রোতে ভেসে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন উদ্ধারকারীরা। ডুবে যাওয়া এ বাসের যাত্রী ছিলেন রাজীব সরদার। তিনি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, 'বাস পানিতে পড়ার পর জানালা ধরে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। বাসের ভেতরে নিচের দিক থেকে পানি ঢুকে যে স্রোত তৈরি হইছে তার সঙ্গেই আমি ভেসে যাই।কোন জায়গা দিয়ে বের হইছি বা কীভাবে বের হইছি আমি নিজেও জানি না। উপরওয়ালা জানে।' দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির সব আসনেই যাত্রী ছিল বলে জানান রাজীব। বাসডুবির ঘটনায় বেঁচে ফিরেছেন কুষ্টিয়ার খোকসার যুবক খাইরুল ইসলাম। বাসটির সামনের দিকে বি-২ আসনের যাত্রী ছিলেন তিনি। দুর্ঘটনার সময় কমপক্ষে ৪০ জন নারী ও শিশু যাত্রী ডুবে যাওয়া বাসের মধ্যে আটকা পড়েছিল বলে জানান তিনি। ডুবে যাওয়া বাসটির ভেতরে মায়ের কোলে বসেছিল আট বছর বয়সী আলিফ। বাসটি ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে মা তাকে জানালা দিয়ে বের করে দেন। উপরে ভেসে উঠলে সাঁতরে আলিফ পন্টুনের কাছে আসে। তখন অন্যরা গামছা ফেলে তাকে টেনে তুলে। আলিফের মা বাসটি থেকে বের হতে পারেননি। সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রী ছিলেন ঝিনাইদহ শৈলকুপার নুরুজ্জামান। বাসটি ঘাটে থামতেই নুরুজ্জামান মেয়েকে নিয়ে চিপস কিনতে নীচে নামেন। ৭ মাস বয়সী পুত্রসহ স্ত্রী ছিলেন বাসের ভেতরে। চিপস কিনে ফিরতেই দেখেন বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। স্ত্রী ও পুত্র সন্তানকে রক্ষা করতে পারেননি নুরুজ্জামান। সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটির প্রায় অর্ধশত যাত্রীর মধ্যে মাত্র ১১ জনের প্রাণে বেঁচে ফেরার কথা জানা গেছে। এদিকে যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে পড়ে হতাহতের ঘটনা অনুসন্ধানে ৬ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সরকার। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মুহিদুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে গঠিত তদন্ত কমিটি ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্তকরণের লক্ষ্যে কাজ করবে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- রাজবাড়ী জেলা প্রশাসকের একজন প্রতিনিধি, নৌ পুলিশের একজন প্রতিনিধি, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর একজন প্রতিনিধি, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)-এর একজন প্রতিনিধি এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের একজন প্রতিনিধি। কমিটি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।