শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬
শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬
মিররবাংলা

জুলাই সনদ নিয়ে সংসদে সংশয়

জাতীয় সংসদে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে। বিদ্যমান সংবিধান সংস্কার নয়, সংযোজন-পরিমার্জন করা হবে বলে মত সরকারি দলের। এ নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের বাহাসে উত্তপ্ত সংসদ অধিবেশন। রবিবার (৫ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে দু’টি আলাদা বিল পাস হয়েছে। আর মাইক বিভ্রাট ও হট্টগোলের কারণে দু’দফা অধিবেশন মুলতবি করা হয়। বিকাল সাড়ে ৩টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্যদিয়ে অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। এর মধ্যে নামাজের জন্য দুই দফায় ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট বিরতি দেয়া হয়। সংসদ অধিবেশন শেষ হয় রাত সাড়ে ৯টায়। সোমবার বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন স্পিকার। সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। অধিবেশনে নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুকের ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫: “ভবিষ্যতের পথরেখা”-এক মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নেন সরকারি দল ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। এর মাঝে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা সর্বোচ্চ ৩২ বছর নির্ধারণ করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশ এবং সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন করে দু’টি আলাদা বিল পাস হয়। রবিবার সংসদের দর্শক গ্যালারিতে সারাদেশ থেকে আসা ৬০ জন জুলাই গণ-আন্দোলনে শহীদ হওয়া পরিবারের সদস্য এবং আহতরা উপস্থিত ছিলেন। অধিবেশনের বিরতির ফাঁকে দর্শক গ্যালারিতে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অধিবেশনে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন,  সংবিধান সংস্কার হয় না। সংবিধান রহিত হয়, স্থগিত হয়, সংশোধন হয়। সংবিধান তো সংস্কার হয় না। সংশোধনকে আমরা সংস্কার মনে করে যদি একসঙ্গে বসতে পারি ভালো। বিরোধীদলীয় নেতা সংবিধান পরিবর্তন চেয়েছেন। সংবিধান পরিবর্তন তো সংশোধনের মাধ্যমে হতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অভিপ্রায়কে আমরা সম্মান জানাতে চাই। ২৪-এর জুলাই জাতীয় সনদ ও জুলাই ঘোষণাপত্রের নির্যাসকে আমরা সংবিধানে ধারণ করার অঙ্গীকার করেছি। এটি চতুর্থ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তবে মনে রাখতে হবে, ৭১-এর স্বাধীনতার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা চলে না। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অনেক লেজিসলেটিভ ফ্রড বা আইনি প্রতারণা করা হয়েছে। হাইকোর্ট ইতোমধ্যে এর কিছু অংশ অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে। বাকি অংশগুলো এই সার্বভৌম সংসদই সিদ্ধান্ত নিয়ে বাতিল বা সংশোধন করবে। বিশেষ করে ৫, ৬ ও ৭ নম্বর তফসিলে যে ভুল ইতিহাস ও তথাকথিত স্বাধীনতার ঘোষণা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা বিলুপ্ত করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ এইটা গণ-অভ্যুত্থানের কলিজা। কেউ জুলাইকে গণ-অভ্যুত্থান বলেছেন। কেউ কেউ তো বিপ্লব বলতে বলতে ফেনা তুলে ফেলে। জুলাই ছাত্র গণ-অভ্যুত্থান, এটা স্বীকৃত। জুলাই জাতীয় সনদের সমস্ত জায়গায় এটা লেখা আছে। এখানে বিপ্লব কোথাও লেখা নাই। আর উনারা যে আদেশের কথা বলছেন। ওখানে কোনো বিপ্লবের নামগন্ধ নাই। বিরোধী দলের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আসুন সরকারি দল, বিরোধী দল এবং স্বতন্ত্র সদস্যরা মিলে বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে বসে আলোচনা করি। সংবিধান কীভাবে সংশোধিত হবে, তা এই সংসদেই নির্ধারিত হবে। বাইরে থেকে আমদানি করা কোনো প্রেসক্রিপশনে নয়। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একটিমাত্র দল, যে দলের নিবন্ধন কেড়ে নেয়া হয়েছে, প্রতীক কেড়ে নেয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত জুলাই বিপ্লবকে ব্যর্থ করার জন্য ডাইভার্ট করার জন্য এই দলটাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেই দলের উপর যদি এ ধরনের অপবাদ দেয়া হয় তাহলে এই সংসদের জন্য একটা লজ্জা। একজন সংসদ সদস্য বলেছেন যে, আমরা সংবিধান ছুড়ে ফেলার কথা বলেছি। এই মহান সংসদকে সাক্ষী রেখে বলছি- আমাদের কেউ কখনো এই কথা বলেন নাই। আমরা এই সংবিধানের পরিবর্তন চেয়েছি। যাতে একটি ন্যায়ভিত্তিক ইনসাফভিত্তিক সমাজ কায়েম এবং ফ্যাসিবাদমুক্ত একটা দেশ আমরা পাই। যে সমস্ত আইন সংবিধানের ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছিল, আমরা ওগুলা ফেলে দিয়ে নতুন বাংলাদেশ চাই। আমরা চাই, যতটুকু সংস্কার হওয়ার সংস্কার হবে, যেখানে সংশোধন হওয়ার সংশোধন হবে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জুলাই সনদের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় সংবিধানকে গ্রহণ করা হয়েছে: জুলাই জাতীয় সনদ নিজেই স্ব-ব্যাখ্যায়িত ও স্বচ্ছ একটি দলিল এবং এর বাস্তবায়নের একমাত্র পথ হলো সংসদীয় প্রক্রিয়ায় সংবিধানের সংশোধন। সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে অন্য কোনো পদ্ধতিতে এর বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তিনি গণভোটের কিছু প্রক্রিয়াকে ‘ফ্রড অন দি কনস্টিটিউশন’ বা সংবিধানের ওপর প্রতারণা হিসেবে অভিহিত করেন। মূলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় সরকারি জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, আমাদের জুলাইযোদ্ধাদের সঙ্গে ডিল করার জন্য আরও অনেক ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। উনারা আহত হয়েছেন, অনেকে নিহত হয়েছেন। উনারা মূল্য দিয়েছেন বলেই আমরা আজ এখানে আছি। তাই আমাদের সহ্য ক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। তবে সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো ‘সংস্কার পরিষদ’ নয়, বরং সংবিধানের রীতিনীতি মেনেই প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে বিএনপি’র অবস্থানের সমালোচনা করেন রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ধাপগুলো চূড়ান্ত হওয়ার পর এখন বিএনপি সেই আলোচনা থেকে পিছিয়ে গিয়ে ‘প্রেসিডেন্সিয়াল ফর্ম’ বা পুরোনো অবস্থায় ফিরে যেতে চাইছে। এদিকে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান বলেন, এই সংসদকে বলতে হবে মজলুমদের মিলনমেলা। এখানে এমন একজনকেও পাওয়া যাবে না, যে গত ফ্যাসিস্ট আমলে জুলুমের শিকার হয়নি। আমি সেই অন্ধকার ঘর থেকে ফিরে এসেছি যেখানে আমার মতো আরও শত শত লোককে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যারা আর ফিরে আসেনি। আইসিটি অ্যাক্ট ১৯৭৩-এ গুমকে ‘ক্রাইম এগেইনস্ট হিউম্যানিটি’র মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু বর্তমান অর্ডিন্যান্সে সাজা রাখা হয়েছে মাত্র ১০ বছর। এটি গুমের শিকার ব্যক্তিদের প্রতি এক ধরনের অবিচার। 

জুলাই সনদ নিয়ে সংসদে সংশয়