যেভাবে কাটবে জীবনের স্থবিরতা

মানুষের জীবন নদীর মতো বহমান। এই জীবন নদীর জোয়ার ভাটায় ঋদ্ধ হয় মানুষ। জীবনের নানা উত্থান-পতন আর যোগ-বিয়োগের মিথস্ক্রিয়ায় এগিয়ে যায় ব্যক্তি।

তবে এমনও ব্যক্তি আছেন, যাদের জীবন থেমে থাকে বদ্ধ জলাশয়ের মতোই। যেখানে নেই কোন স্রোত। নেই এগিয়ে যাওয়া। আছে কেবল কোনরকম জীবন পার করে দেওয়া। এক জায়গায় স্থির থাকা।

আর জীবন যাদের এক জায়গায় স্থির, তারা প্রতিদিন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করে যান। যে কারণে তাদের জীবন হয়ে পড়ে স্থবির।

এমন ব্যক্তিদের দৈনন্দিন জীবনে নিত্য ঘটে ১০টি ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এই ১০ অভ্যাস দিয়েই চেনা যায় স্থবির মানুষদের। যেগুলো এড়াতে পারলে কেটে যাবে জীবনের স্থবিরতা।

জেনে নেওয়া যাক সেগুলো-

প্রতি সকালে অ্যালার্ম বার বার বন্ধ করা

জীবন যাদের স্থবির তাদের সাধারণ অভ্যাসগুলোর মধ্যে একটি হলো প্রতিদিন সকালে অ্যালার্ম বারবার স্নুজ অর্থাৎ বন্ধ করে দেওয়া। আর স্নুজ করে দিয়েই আবারও ঘুম। কিছুক্ষণ পর অ্যালার্ম বাজলে আবারও সেই স্নুজ। সকালের বড় একটা সময় চলে যায় এভাবেই।

ফোনের অ্যালার্ম বার বার স্নুজ করে দেওয়ার এই বদ অভ্যাসের কারণে অনেকেরই দিন শুরু হয় বেশ দেরি করে। ফলে দিনের একটি বড় সময় তাদের জীবন থেকে বাদ পড়ে যায়।

প্রতিটি সকাল জীবনকে এগিয়ে নেওয়ার একেকটি সুযোগ। তাই স্নুজ বাটনে বার বার চাপ দেওয়ার লোভকে সংবরণ করে প্রতিদিন প্রতিটি নতুন সকাল আরম্ভ করাই শ্রেয়।

সকালের নাস্তা এড়িয়ে যাওয়া

এমন মানুষ নেহায়েত কম নয়, যারা সময় বাঁচাতে সকালের নাশতা করেন না। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সকাল সকাল পেট ভরে নাস্তা করেন, তাদের থেকে কাজের উৎপাদনশীলতায় নাস্তা না করা মানুষেরা পিছিয়ে থাকেন।

যাদের জীবন আটকে গেছে একই ঘুর্ণিপাকে তাদের সকালের নাস্তা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। আপাতত দৃষ্টিতে এটিকে খুব ছোট বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু শরীরে পর্যাপ্ত পুষ্টির জোগানের সঙ্গেও এটি সম্পর্কিত।

সকালের নাশতা বাদ দিলে মস্তিষ্কে এই বার্তা যায় যে, যথাযথ পুষ্টি শরীরের দরকার নেই। এতে শরীরে কম শক্তি উৎপন্ন তো হয়-ই, পাশাপাশি মন মেজাজও খিটখিটে হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে। কমে যায় মনোযোগ।

ফলে জীবনের স্থবিরতা কাটাতে সকালের খাবার গ্রহণ অতি জরুরী।

কায়িক শ্রম এড়িয়ে যাওয়া

অনেকেই আবার সকালে ঘুম থেকে ওঠেন ঠিকই কিন্তু সকাল কাটিয়ে দেন ফেইসবুকিং করে অথবা বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে। এমন অভ্যাস জীবন স্থবির হয়ে থাকারই লক্ষণ।

কায়িক শ্রম শরীরে অ্যান্ডরফিনের নিঃসরণ ঘটায়, যা কিনা খোশমেজাজ ধরে রাখে। মানসিক চাপ কমিয়ে দেয়। বৃদ্ধি করে পরিশ্রমের ক্ষমতা।

ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কাজে যাওয়ার দিনেই যারা অল্প সময় ধরে হলেও ব্যয়াম অথবা মর্নিংওয়াক করেন তারা সারাদিন অনেক বেশি কাজ করার শক্তি পান। অন্যদিকে যারা এ-কাজ করেন না, তারা এই সুবিধাটুকু থেকে বঞ্চিত হন।

কাজেই, ভোরবেলা না ঘুমিয়ে বরং একটু হাত-পা ছোড়াছুড়িতেই আছে জীবনে গতি আনার দাওয়াই।

দিনের পরিকল্পনা এড়িয়ে যাওয়া

যারা নিজেদের জীবনে আটকে থাকেন, তারা প্রায়ই দিনের জন্য কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই তাদের সকাল শুরু করেন। তারা প্রবাহের সঙ্গে যান। তারা বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব নেওয়ার পরিবর্তে ঘটনা এবং পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া জানান।

জীবনে থমকে যাওয়া ব্যক্তিদের দিন শুরু হয় কোন পরিকল্পনা ছাড়া। তারা কেবল ‘চলতি হাওয়ার পন্থি’। বিষয়টি কাব্যিক শোনালেও আদতে এটি খুব ভালো কিছু নয়।

পরিকল্পনাহীন দিন মানেই, অকাজে সময় ব্যয় করার প্রবণতা বেড়ে যাওয়া।

সুতরাং, দিনের শুরুতেই একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ জীবনে আনতে পারে খানিক গতি।

দিনের শুরুতেই নেতিবাচক চিন্তা

থমকে থাকা জীবনের মানুষেরা নেতিবাচক ভাবনা দিয়েই শুরু করেন তাদের দিন। এই নেতিবাচকতার উৎস হতে পারে দৈনিক পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অথবা টিভি।

দিনের শুরুতেই যদি কোনভাবে নেতিবাচক চিন্তা মাথায় ঢুকে যায়, তবে সারাদিন এক নেতিবাচক এনার্জি তাড়া করতে থাকে।

ফলে সকালটা শুরু হতে পারে যোগ ব্যায়াম কিংবা প্রার্থনা দিয়ে। কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া যেতে পারে আনন্দের অনুভূতি দেয় এমন গান শুনে।

ভালোবাসার মানুষকে অবহেলা

কথায় আছে নিজেকে অবহেলা করা মানুষ অবহেলা করে নিজের কাছের মানুষকেও। জীবনকে থামিয়ে রাখা ব্যক্তিরা প্রায়শই নিজের ভালোবাসার মানুষকে যথেষ্ট মনোযোগ দেননা।

ফলে তারা এই মানুষদের সমর্থন, আবেগ এবং সহানুভূতি থেকেও বঞ্চিত হন। এভাবে জীবন হয়ে পড়ে আরও স্থবির।

তাই, দিনের শুরুটা হোক ভালোবাসার মানুষের প্রতি ভালোবাসা জানিয়ে।

আত্ম-পর্যালোচনা এড়িয়ে যাওয়া

জীবনকে এগোতে না দেওয়া ব্যক্তিরা নিজের ব্যাপারে পর্যালোচনা ছাড়াই জীবন কাটিয়ে দিতে পছন্দ করেন। একটি কাজ কেন করছি, এর প্রয়োজন কী, আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা- ইত্যাদি প্রশ্নের ধার না ধরেই তারা কেবল জীবনকে হাওয়াই ভাসিয়ে দিতে ভালোবাসেন।

দেখা যায়, এমন অভ্যাসের কারণেই তারা অনেক কিছু শেখা থেকে হন বঞ্চিত। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এদের জীবনের অর্জন ক্রমশ শূন্যে ঠেকে।

তাই, এই অভ্যাস বাদ দিয়ে নিজের জীবন, চিন্তা ও কাজের পর্যালোচনাতেই আছে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ফর্মুলা।

খুঁতখুঁতে হওয়া

জীবন আটকে যাওয়া ব্যক্তিদের সময় থাকে স্থির। কারণ এরা ছোট-বড় যে কোন কাজেই নিখুঁত হবার চেষ্টা করেন। আর নিখুঁত হতে গিয়ে আটকে থাকেন ওই একটি কাজেই। বাস্তবে, ‘নিখুঁত’ হওয়ার কোনও শেষ নেই। জরুরী হলো কাজের সঠিকতা।

সেকারণে, জীবনকে সহজ ও গতিশীল করতে নিখুঁত হওয়ার প্রবণতা হ্রাস করতে হবে।

অতীতে পড়ে থাকা

জীবন থমকে থাকার একটা বড় কারণই হলো অতীতে পড়ে থাকা। অতীতের নানা দুঃখ, নেতিবাচকতা নিয়ে নাড়াচাড়া করা। যা জীবনকে এগোতে দেয়না। এই অতীতচারী মানসিকতা পরিহার করলে জীবনে গতি আসতে বাধ্য।

নিজের ওপর বিশ্বাস না থাকা

নিজের ওপর যথেষ্ট বিশ্বাসের অভাব জীবনকে একটি খোপে আটকে ফেলে। ফলে ব্যক্তি সামনে এগোতে পারেনা। ভরসা পায়না নতুন কিছু করতে।

সুতরাং, জীবনে নতুন কিছু করার আনন্দ ফিরে পেতেই নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা জরুরী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here