বৃটিশ শাসনে নতুন অধ্যায়

সোশ্যাল আর্থকোয়েক! স্টারমার সুনামি! লেবার বিপ্লব! ইলেকটোরাল আরমাগেডন! সব বিশেষণই বৃটিশ লেবার দলের জন্য প্রযোজ্য। ইতিহাসে মাইলফলক জয়ে তারা ক্ষমতায় ফিরেছে। এ নিয়ে বৃটিশসহ বিশ্ব মিডিয়াগুলো এমনই বিশেষণে অভিহিত করছে লেবার দলকে এবং এ দল থেকে নতুন প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমারকে। রাজা চার্লস তাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করার পর বৃটেনকে নতুন করে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ধন্যবাদ জানিয়েছেন বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাককে। প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন দেশে পরিবর্তন আনার। সুনামি যেমন সামনে যা কিছু পায় তাই ভাসিয়ে নেয়, স্টারমারের নেতৃত্বে লেবার পার্টি যেন তেমনটাই করেছে। তারা ১৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা কনজারভেটিভদের ভাসিয়ে দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে লেবার পার্টি। তারা হাউস অব কমন্সের ৬৫০ আসনের মধ্যে ৪১২ আসনে জয় পেয়েছে।
অন্যদিকে কনজারভেটিভরা পেয়েছে মাত্র ১২১ আসন। আগের নির্বাচনের চেয়ে বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে লেবার পার্টি অতিরিক্ত ২১৪টি আসনে জিতেছে। আর কনজারভেটিভ দল আগের নির্বাচনের ২৫১টি আসন হারিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তারা ভয়াবহ এক পরাজয় স্বীকার করেছে। আগেই পূর্বাভাষ দেয়া হয়েছিল এবারের নির্বাচনে লেবার পার্টি জয় পাবে। কিন্তু তারা যে রেকর্ড সৃষ্টি করে এত বড় ব্যবধানে জয় পাবে, তা অনেকেই ভাবেননি।
বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাত ১০টায় ভোটগ্রহণ শেষেই শুরু হয় বুথফেরত জরিপ। তাতে যে পূর্বাভাস দেয়া হয়, তা নিয়ে কনজারভেটিভদের কপালে ভাঁজ পড়তে থাকে। এরপর আস্তে আস্তে ফল প্রকাশ হতে থাকে। তাতে দলটির ভয়াবহ পরাজয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমনকি পরাজিত হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসও। ধরাশায়ী হন ঋষি সুনাকের মন্ত্রিপরিষদের বাঘা বাঘা সদস্যরা। এ খবর পরিষ্কার হওয়ার পর স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত ৪টা ৪০ মিনিটে পরাজয় স্বীকার করে কিয়ের স্টারমারকে অভিনন্দন জানান ঋষি সুনাক। তিনি কনজারভেটিভ দলের পরাজয়ের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। শুরু হয়ে যায় বৃটেনজুড়ে বিজয়োল্লাস। লেবার সমর্থকরা আনন্দে ফেটে পড়েন। এরই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় সময় শুক্রবার দুপুর ১২টার কিছু আগে স্ত্রী অক্ষমতা মূর্তিকে সঙ্গে নিয়ে বাকিংহাম রাজপ্রাসাদে যান প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক। সেখানে রাজা চার্লসের কাছে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষে বেরিয়ে যান। তার বেশ কিছুক্ষণ পরে বৃষ্টিস্নাত দিনে স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় বাকিংহাম রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করেন স্যার কিয়ের স্টারমার। তিনি রাজা চার্লসের কাছে নতুন সরকার গঠনের অনুমতি চান। রাজা তাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করে অনুমতি দেন। রাজপ্রাসাদ থেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেরিয়ে আসেন কিয়ের স্টারমার। সেখান থেকে তিনি ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে চলে যান। তাকে প্রহরা দিয়ে সেখানে পৌঁছে দেন নিরাপত্তাকর্মীরা। বাসভবনের বেশ আগেই তিনি গাড়ি থেকে নেমে উপস্থিত জনতার সঙ্গে করমর্দন করেন। এদিন বার বার বৃষ্টি হচ্ছিল। তার মধ্যে ছাতা মাথায় অপেক্ষায় ছিলেন বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের সাংবাদিক, টিভি ক্যামেরা।
গাড়ি থেকে নেমে বেশ কিছু সময় উপস্থিতদের সঙ্গে কুশলবিনিময় ও করমর্দন করেন প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার। এরপর রীতি অনুযায়ী ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ভাষণ দেন। বলেন, অবিলম্বে পরিবর্তনের কাজ শুরু হবে। তবে স্বীকার করেন এই পরিবর্তন একটি সুইচে টেপার মতো সহজসাধ্য বিষয় নয়। স্কুল এবং সক্ষমতার মধ্যে বাড়িঘরের কথা উল্লেখ করে স্টারমার প্রতিশ্রুতি দেন দেশের অবকাঠামো পুনঃনির্মাণের। তিনি সরকারি সেবাখাতগুলোকে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। জাতীয়ভাবে সবকিছুকে নতুন করে সাজানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। একটি অনিশ্চিত বিশ্বের চ্যালেঞ্জগুলো জোর দিয়ে তুলে ধরেন তিনি। কিয়ের স্টারমার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় বিশ্বনেতারা তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এর আগে হলবর্ন এবং সেন্ট প্যানক্রাসে তার নির্বাচনী এলাকা থেকে ভূমিধস বিজয় উদ্‌যাপন করার সময় উচ্ছ্বসিত লেবার পার্টির নেতা স্যার কিয়ের স্টারমার প্রতিক্রিয়ায় বললেন, আমরা করে দেখিয়েছি। এবার সময় এসেছে দল-মত নির্বিশেষে সমস্ত ভোটারের কাছে আমাদের প্রতিশ্রুতি পালন করার। ক্যামডেনে একটি সমাবেশে ভাষণ দেয়ার সময়, স্টারমার নির্বাচনী এলাকায় তার আসনের ভোটারদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এই অঞ্চলটি তার জন্য বরাবরই ‘বিশেষ’ হয়ে থাকবে। স্টারমার বলেন, ‘এই নির্বাচনী এলাকার সেবা করা অনেক বড় সৌভাগ্যের বিষয়। আমার বাড়ি, যেখানে আমার সন্তানরা বড় হয়েছে এবং যেখানে আমার স্ত্রীর জন্ম হয়েছে। আমি তাদের সমর্থনের জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই।’ স্থানীয় পুলিশ এবং রিটার্নিং অফিসারদেরও ধন্যবাদ জানিয়েছেন স্টারমার। তার সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি আরও একবার মনে করিয়ে দিলেন, ‘পরিবর্তন শুরু’। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, আপনি আমাকে ভোট দিন বা না দিন, আমি এই নির্বাচনী এলাকার প্রতিটি মানুষের সেবা করবো। আমি আপনার পক্ষে কথা বলবো, আপনার পিছনে থাকবো, প্রতিদিন লড়াই করবো’। ছুরি নিয়ে দেশে আক্রমণ বৃদ্ধি এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলোকে উল্লেখ করে স্টারমার জনগণকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, তিনি এই সমস্যা সমাধানে যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।

এবার নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ইস্যু ছিল বৃটেনের অর্থনীতি। জরিপ বলছে, সেখানে জীবনধারণের খরচ বৃদ্ধি পাওয়া এবং মুদ্রাস্ফীতি রেকর্ড পর্যায়ে বেড়ে যাওয়ার কারণে এসব ইস্যু সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। ২০২২ সালে মুদ্রাস্ফীতি শতকরা ১১.১ ভাগে পৌঁছে যায়। একে বলা হয় পিক মুদ্রাস্ফীতি। তবে সম্প্রতি তা টার্গেটেড লেভেলে আসতে শুরু করেছে। বৃটেনের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) আরেকটি শীর্ষ অগ্রাধিকার। এনএইচএস হলো রাষ্ট্রীয় তহবিলে জনগণের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা। ২০০৯ সালের পর তখনকার প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের অধীনে আর্থিক কৃচ্ছ্রসাধনের ফলে বৃটেনের সরকারি সেবাখাতগুলোতে তহবিলের সংকট দেখা দেয়। দেখা দেয় স্টাফের ব্যাপক সংকট। করোনা মহামারি শুরু হওয়ার আগেই এনএইচএস’র অধীনে চিকিৎসাপ্রার্থীদের অপেক্ষমাণের তালিকা দীর্ঘ হতে থাকে। তারপর তো রোগীর সংখ্যা আকাশচুম্বী হতে থাকে। এটাই জনগণের অসন্তোষের বড় একটি উৎস। শীর্ষ ইস্যুগুলোর মধ্যে অনেক ভোটারের কাছে তৃতীয় ইস্যু হলো অভিবাসন।

ওদিকে ঋষি সুনাকের পদত্যাগ এবং কিয়ের স্টারমার প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ পাওয়ার পর কনজারভেটিভ দলে সৃষ্টি হয়েছে আরেক লড়াই। দলটির হাল কে ধরবেন, কে হবেন এর নেতা তা নিয়েই চলছে প্রতিযোগিতা। ঋষি সুনাক জানিয়ে দিয়েছেন তিনি পরবর্তী কনজারভেটিভ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সবকিছু দেখাশোনা করবেন। এরই মধ্যে দলটির বেশ কিছু নাম আলোচনায় এসেছে। তারা কিছু সময় ধরে প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। এর মধ্যে আছেন কেমি ব্যাডেনোচ এবং টম গুগেনধাত। সাবেক প্রতিযোগী সুয়েলা ব্রেভারম্যানও প্রতিযোগিতা করতে পারেন। আসতে পারেন সুনাকের সাবেক মিত্র রবার্ট জেনরিক। কিন্তু একটি বিষয় খুব লক্ষণীয় এমন কে আছেন যিনি এখন তছনছ হয়ে যাওয়া দলটিকে নতুন করে সাজাবেন। ওদিকে বিবিসি বিশ্লেষণ করেছে সরকার গঠনের পর এখন লেবার দলের সামনে পরবর্তী করণীয় কি তা নিয়ে। তারা পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। ফলে যেকোনো বিল তারা নিজেরাই খুব সহজে পাস করে নিতে পারবে। এক্ষেত্রে অন্যদের বাধা থাকলেও তারা উৎরে যেতে পারবে। নির্বাচনী প্রচারণাকালে লেবার দল একটি ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করে। যদি নির্বাচিত হয় তাহলে তাদের শীর্ষ অগ্রাধিকারগুলো কি তা এতে প্রকাশ করা হয়। বলা হয়, ট্যাক্ট এবং খরচের খাতে পরিষ্কার নিয়ম করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা হবে। এক্ষেত্রে বিদ্যমান আয়কর ট্যাক্সের হার, জাতীয় ইন্স্যুরেন্স অথবা ভ্যাট বাড়ানো হবে না। মেডিকেল স্টাফদের সপ্তাহান্তের ছুটির সময়ে এবং সন্ধ্যায় অধিক পরিমাণে অর্থ দিয়ে জাতীয় স্বাস্থ্য স্কিমে অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা সপ্তাহে ৪০ হাজার কমিয়ে আনা হবে। সন্ত্রাস বিরোধী স্টাইলে বর্ডার সিকিউরিটি কমান্ড সৃষ্টি করা হবে। এর মধ্য দিয়ে পাচারকারী গ্যাং এবং মানুষকে পাচার বন্ধ করা যাবে। গ্রেট বৃটেন এনার্জি- যা প্রকাশ্যে বন্ধুপ্রতীম জ্বালানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে মনে করা হয়, তা স্থাপন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। বিল কর্তন করা হবে। পরিবেশ-বান্ধব জ্বালানিতে বিনিয়োগ করা হবে। নিয়োগ করা হবে কমপক্ষে ৬৫০০ শিক্ষক। ইংল্যান্ডে প্রতিটি প্রাইমারি স্কুলে বিনামূল্যে সকালের নাস্তা দেয়া হবে।

কিয়ের স্টারমারকে অভিনন্দন জানিয়ে শেখ হাসিনার চিঠি
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় লেবার পার্টি নেতা কিয়ের স্টারমারকে অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুক্রবার নবনির্বাচিত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে ওই চিঠি পৌঁছে দেয়ার কথা জানিয়েছে লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশন।
তিনি যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে লিখেছেন, ‘এই দ্ব্যর্থহীন ম্যান্ডেট আপনার দেশকে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি জোরদার করার জন্য আপনার নেতৃত্বের প্রতি বৃটেনের জনগণের আস্থার সুস্পষ্ট প্রতিফলন।’
এ উপলক্ষে শেখ হাসিনা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় লেবার পার্টি ও দলের আইকনিক নেতা স্যার হ্যারল্ড উইলসন, টমাস উইলিয়ামস সিকে ও লর্ড পিটার শোরের সঙ্গে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দল আওয়ামী লীগের স্থায়ী বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এই বন্ধুত্ব প্রকৃতপক্ষে দুই দেশের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রগতিশীল আকাঙ্ক্ষার অভিন্ন মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য সম্পর্ককে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর গড়ে তুলেছে বলে ওই চিঠিতে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘আমার সরকার আমাদের দুই কমনওয়েলথ দেশের পারস্পরিক স্বার্থে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, জলবায়ু ও কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করতে আপনার সক্ষম স্টুয়ার্ডশিপের অধীনে লেবার পার্টি সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার জন্য উন্মুখ।’
তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, একসঙ্গে আমরা আমাদের দুইদেশের কল্যাণে ৭ লাখের বেশি প্রাণবন্ত ও উদ্যোগী বাংলাদেশি-ব্রিটিশ প্রবাসীদের অমূল্য অবদানকে কাজে লাগানোর প্রয়াস চালিয়ে যাবো।’
ওই চিঠিতে যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকালে তার সুস্বাস্থ্য, সুখ ও সাফল্য এবং যুক্তরাজ্যের বন্ধুত্বপূর্ণ জনগণের শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন শেখ হাসিনা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here