ঢাকা-নয়াদিল্লির কৌশলগত চ্যালেঞ্জ

0
21

ইউরেশিয়া রিভিউয়ের বিশ্লেষণ:
প্রহসনের রীতি। গত চারটি মেয়াদে বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল কি হবে তা কয়েক মাস আগে থেকেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। এ বছর ৭ই জানুয়ারি যে নির্বাচন হলো, তাও এর থেকে ভিন্ন কিছু ছিল না। একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করেছিল বিরোধী দল। সেই দাবি প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করে। তাদের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের কয়েক মাস আগে থেকেই তাদেরকে জেলে ভরে রাখা হয়।
নির্বাচনে শতকরা ৪০ ভাগের সামান্য বেশি ভোটার ভোট দিয়েছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তাদের সাজানো (প্রক্সি) স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্য থেকে প্রার্থী বাছাই করে নিতে হয়েছে ভোটারদের। শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টের মোট আসনের মধ্যে শতকরা ৮৫ ভাগে জয় পেয়েছে। বাকিরা বাকি আসনগুলো পেয়েছে।
তবে এসব প্রার্থী কোনো না কোনোভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত। আওয়ামী লীগের একজন সিনিয়র নেতা ব্যাঙ্গ করে বলেছেন, জাতীয় সংসদে বিরোধী দল মনোনীত করবেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুমোদন ও প্রত্যাখ্যান
নির্বাচনের পরের দিন ৮ই জানুয়ারি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে অভিনন্দন বার্তা পান শেখ হাসিনা। যদিও মোদির পরের টুউটগুলোতে ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি ছিল না, তবু তাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তার বিজয়ে এবং একটি সফল নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি অভিনন্দন জানিয়েছেন তিনি। জানান, দুই দেশের মধ্যে জনগণকেন্দ্রীক অংশীদারিত্ব শক্তিশালী করতে চান। ৮ই জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতকে বাংলাদেশের মহান বন্ধু হিসেবে অভিহিত করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি চমৎকার সম্পর্ক আছে বলে তিনি প্রশংসা করেন।
১১ই জানুয়ারি অগণতান্ত্রিক ‘প্যারাগন’ চীনের পক্ষ থেকে আরেকটি অভিনন্দন বার্তা পান শেখ হাসিনা। এতে অভিনন্দন জানান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। প্রেসিডেন্ট শি তার বার্তায় দুই দেশের মধ্যে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতা’ এবং চায়না-বাংলাদেশ কৌশলগত সহযোগিতাভিত্তিক অংশীদারিত্ব নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই নির্বাচনকে অবাধও মনে করে না। আবার সুষ্ঠুও হয়নি বলে উল্লেখ করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধানও নির্বাচনের দিনে অনিয়ম এবং সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
গণতন্ত্রের অপপ্রচার
ভারত নিজেকে একটি সমৃদ্ধ গণতন্ত্রের দেশ বলে গর্ব করে। কিন্তু তাদের আছে অদ্ভুত একটি ‘প্রায়োগিক’ পররাষ্ট্রনীতি, যা বিশ্বের যেকোনো স্থানে গণতন্ত্র প্রচার থেকে বিরত থাকে। যারা দৃঢ়ভাবে ক্ষমতায় আছেন সেইসব নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাকে পছন্দ করে এই নীতি। এ ধরনের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মাধ্যমে নয়া দিল্লি বিশ্বাস করে যে, ভারতের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের জোর সম্ভাবনা আছে (যদিও তা অস্পষ্ট)। এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ হলো মিয়ামনারে সামরিক জান্তাদের প্রতি ভারতের সমর্থন। এই সামরিক জান্তা ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে। গণতন্ত্রপন্থি ক্ষমতাচ্যুত ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের (ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বেসামরিক শক্তির গঠিত ছায়া সরকার) অব্যাহত সমর্থনের জন্য আবেদন বার বার উপেক্ষা করেছে ভারতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার।
মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের খুব একটা মিল নেই। এখানে বিরোধী দলে আছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি এবং এর ইসলামপন্থি মিত্ররা। তাদেরকে ভারতবিরোধী হিসেবে দেখা হয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য বিদ্রোহ করা গ্রুপগুলোকে সমর্থন দেয়ার ইতিহাস আছে বিএনপির। বিএনপির ক্ষমতার সময়ে পাকিস্তানি ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) বড় রকম উপস্থিতি ছিল ঢাকায়। ভারতবিরোধী গ্রুপগুলো এবং বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন বড় শহরে বিস্ফোরণ ঘটানো ছিল তাদের লক্ষ্য। বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরই শুধু ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহীদের দমনে বাংলাদেশের নতুন শাসকগোষ্ঠী ভারতকে সহযোগিতা করতে থাকে। তাই বিএনপি ও তার মিত্রদের প্রতি ভারতের অবিশ্বাসের বিষয়টি ভিত্তিহীন নয়।
এইভাবে ভারত কৌশলগতভাবে এমন একটি প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে, যা ঢাকায় ভারতপন্থি শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতায় অব্যাহত থাকাকে নিশ্চিত করে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ নীতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খুব কমই ফল এনেছে। পক্ষান্তরে নয়া দিল্লি নিজেকে এমন একটি জায়গা নিয়ে গিয়েছে, যেখানে সে তার প্রতিবেশী দ্বারা বেষ্টিত। এসব প্রতিবেশী প্রকৃতপক্ষে ভারতপন্থি নয়। এক্ষেত্রে সম্ভবত ঢাকাই একমাত্র ব্যতিক্রম।
এটা বিস্মিত হওয়ার মতো কিছু নয় যে, নয়া দিল্লি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন থেকে পলিসির দিক দিয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন অবস্থান বজায় রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে একটি অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছিল প্রকাশ্যে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে যারা বাধাগ্রস্ত করবেন বা জড়িত থাকবেন তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেয়ার ঘোষণা দেয় ২০২৩ সালের মে মাসে। এটা নিয়ে ঢাকা যখন নয়া দিল্লির দ্বারস্থ হয়, তখন নয়া দিল্লি বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের কাছে উত্থাপন করেন। তাতে অবাধ, মুক্ত নির্বাচন প্রচেষ্টা এবং সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিকে বাংলাদেশের গুরুত্বের বিষয় তুলে ধরা হয়। মধ্যস্থতাকারীরা জোর দিয়ে তুলে ধরেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ বাংলাদেশকে চীনের ঘনিষ্ঠ করে ফেলতে পারে।

চায়না ফ্যাক্টর
বাংলাদেশ সহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রতিযোগিতা চলছে ভারত ও চীনের মধ্যে। ২০১৬ সাল থেকে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অংশ ঢাকা। ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে চীনের বার্ষিক অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিসট্যান্স (ওডিএ) এবং আদার অফিসিয়াল ফ্লো (ওওএফ)-এর প্রতিশ্রুতি ৯৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩৪০ কোটি ডলার। ২০২৩ সালের অক্টোবরে শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন ৮২ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মাসেতু রেল সংযোগ। এটা বিআরআইয়ের অধীনে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় অবকাঠামো বিষয়ক প্রকল্প।
চীনসহ ১৫টি দেশের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুক্ত বাণিজ্য বিষয়ক চুক্তি রিজিয়নাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপের (আরসিইপি) একটি সদস্য হতে আগ্রহী ঢাকা। আরসিইপি থেকে ২০১৯ সালে সরে যায় ভারত। খুব শিগগিরই আরসিইপিতে যোগ দেয়ার আহ্বান পাওয়ার আশা করছে ঢাকায় নতুন সরকার। ভারতের জন্য বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো আরসিইপিতে যোগ দেয়ার ফলে চীন ও অন্য আরসিইপির সদস্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাবে। এতে ভারতের বাণিজ্যিক গতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঢাকার তিক্ত সম্পর্কের মধ্যে ঢাকাকে সমর্থন দিতে ভারতের মতো এগিয়ে আসে চীন। ২০২৩ সালের ২৩শে আগস্ট জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সামিটের পাশাপাশি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে বাংলাদেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, ভূখণ্ডের অখণ্ডতা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতায়’ সমর্থন দিতে ঢাকাকে সমর্থন প্রসারিত করে চীন।

চীন ও ভারতের মধ্যে সতর্কতার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় ঢাকা। তারা চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়’ হিসেবে উল্লেখ করে। তবে বিষয়টি নয়া দিল্লির জন্য তীব্র উদ্বেগের। যদি ভারত বাংলাদেশে চীনের বিকল্প বা তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আশা না করতে পারে, ঢাকায় চীনের উপস্থিতি অবশ্যই নয়া দিল্লিকে বাধ্য করবে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে, যাতে বাংলাদেশ পুরোপুরি বেইজিংয়ের কাছে চলে না যায়। শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীকে সমর্থন এবং তার পুনঃনির্বাচিত হওয়াকে সমর্থন হতে পারে একই সঙ্গে জটিল ফ্যাক্টর।

ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ?
আওয়ামী লীগকে সমর্থন করায় ভারতে যেমন খুব কমই বিরোধিতা আছে, একই সঙ্গে সামনের মাসগুলোতে বাংলাদেশ যেসব রাজনৈতিক পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করতে পারে, সেদিকেও নিজের স্বার্থে চোখ খোলা রাখা উচিত নয়া দিল্লির। শেখ হাসিনা আবার নির্বাচিত হওয়ায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট কাটবে না এবং দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সৃষ্টির পথ তৈরি করবে না। উচ্চ মাত্রায় মেরুকরণ করা রাজনীতি সম্ভবত উচ্চ মাত্রায় রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিশৃংখলা প্রত্যক্ষ করবে। কয়েক দশকের টেকসই জিডিপির প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক সূচকে অগ্রগতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন ভঙ্গুর। এর পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা।

এসব ঘটনা ভারতের নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এটা হবে ভারতের স্বার্থে- যদি তারা ঢাকাকে চাপ দেয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে একটি সংলাপ প্রক্রিয়া শুরু করতে। কোনো শাসকগোষ্ঠী যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা ধরে রাখতে চাওয়ার পরিবর্তে ঢাকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা হতে পারে ভারতের স্বার্থের জন্য উন্নত পথ।

(লেখক ড. বিভু প্রসাদ রাউট্রে ভারত সরকারের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল সেক্রেটারিয়েটের একজন উপপরিচালক ছিলেন। তিনি আসামের গুয়াহাটিতে ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্টের ডাটাবেজ অ্যান্ড ডকুমেন্টেশন সেন্টারের পরিচালক ছিলেন। ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি এস রাজারত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ, নানিয়াং টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি, সিঙ্গাপুরে সাউথ এশিয়া বিষয়ক ভিজিটিং রিসার্স ফেলো ছিলেন। তার এ লেখাটি অনলাইন ইউরেশিয়ার অনুবাদ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here