সিল্ক কারখানার স্থলে গড়ে উঠছে প্লাস্টিকের দোকান আটার মিল

0
43

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্করিফাত সিল্ক ফ্যাক্টরি, নিশা সিল্ক ফ্যাক্টরি,এমএম সিল্ক ফ্যাক্টরি রাজশাহীর বিসিক শিল্প এলাকায় এই নামগুলো এখন অতিত। সিল্ক (রশম) কারখানা বন্ধ হয়ে এইসব কারখানা জায়গায় এখন গড়ে উঠেছে কারিগরি কলেজ, প্লাস্টিকে কারখানা, অ্যালমুনিয়ামের কারখানাসহ নানা কারখানা। শুধু এই তিনটিই এভাবে একে একে বন্ধ হয়ে গেছে অন্তত ৭০টি সিল্ক কারখানা। অথচ এই কারখানাগুলোতে ৮০’র দশকে ঠাস ঠাস শব্দে মেতে থাকত রাত-দিন। কিন্তু এখন সেই স্থানগুলো যেন অনেকটা সুনসান অবস্থা বিরাজ করছে। আর যেসব কারখানা এখনো চালু আছে, সেগুলোও চলছে কোনো মতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

এর বাইরে সরকারি নিয়ন্ত্রণাধিন রেশম কারখানাটিও বন্ধ হয়ে আছে বছরের পর বছর ধরে। আর এসব কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের অধিকাংশই এখন প্রায় বেকার। কেউ বা বেছে নিয়েছেন জীবীকার টানে ভিন্ন পেশা। এমনই দৈনদশা বিরাজ করছে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী রেশম শিল্পে।

অথচ সরকারের পক্ষ থেকে একটু নজর দিলেই ঘুরে দাঁড়াতে পারে প্রচুর সম্ভাবনাময় শিল্পখাত রাজশাহী রেশম। কিন্তু সরকারের উদাসিনতার কারণে দিন দিন এই শিল্পটি পেছনের দিকেই ধাবিত হচ্ছে। এ নিয়ে চরম ক্ষোভও ছড়িয়ে পড়েছে রাজশাহী রেশম শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের। বাংলাদেশ রেশম মালিক সমিতির সদস্যরা রেশম র্শিপকে বাঁচাতে সরকারের কাছে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আসলেও সেগুলোর বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে।

রাজশাহীর রেশম শিল্পের ঐতিহ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে যতটুকু জানা গেছে, খ্রীষ্টপূর্ব আনুমানিক সাড়ে ৩ হাজার বছর পূর্বে চীনারা রেশমগুটি থেকে রেশম বস্ত্র তৈরি করতো। চীনারাই সেইকালে রেশম বস্ত্র তৈরির জন্মরহস্য জানত। তারা বহুযুগ এই রহস্য গোপনে রাখতে পেরেছিল। মসৃন এই বস্ত্রটির কদর ছিল তখন বিশ্বজুড়ে। চীনারা রেশম বস্ত্র বিক্রি করে বিপুল লাভবান হতো। তারা রেশম বস্ত্র দেশে দেশে বিক্রি করলেও কীভাবে এত সুক্ষ বস্ত্র তৈরি হয় তার রহস্য কঠোরভাবে সংরক্ষণ করত।

কথিত আছে চীনের এক রাজকুমারীর সঙ্গে বিয়ে হয় প্রাচীন ভারতের এক রাজকুমারের। রাজকুমারী ভারতবর্ষে আগমনের সময় আংটির ভেতরে লুকিয়ে রেশম বস্ত্র নিয়ে আসেন। কয়েকটি রেশম গুটিও লুকিয়ে নিয়ে আসেন ভারতে। সেই থেকে ভারত বর্ষে রেশম বস্ত্রের প্রচলন শুরু হয়।

জানা যায়, ভারতবর্ষে রেশম বস্ত্রের প্রচলন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীন বাংলায়ও এর প্রসার ঘটে। পর্তুগীজ ও ইংরেজরা ১৬ শতকে ভারতবর্ষে আমগন করেন বাণিজ্য উপলক্ষে। তারা রেশম বস্ত্র সংগ্রহ করে ইউরোপে চালান শুরু করেন। মোগল বাদশারাও রেশমের খুব সমাদর করতেন। ১৭ শতকে ইংরেজরা নিজেরাই রেশম বস্ত্র তৈরির জন্য তৎকালীন অবিভক্ত বাংলা মালদহ জেলার কয়েকটি স্থানে তুঁতচাষের প্রচলন করেন। বর্তমান বাংলাদেশের ভোলাহাট ও শিবগঞ্জ উপজেলা তৎকালে মালদহ জেলার অধীন ছিল। দেশভাগের পর এই দুটি এলাকা রাজশাহী জেলার অধীনে আসে। এই দুটি এলাকায় রেশম চাষ কেন্দ্রীভুত থাকে কয়েক দশক ধরে। এই অঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠী রেশম চাষ ও রেশম বস্ত্র উৎপাদনে নিয়োজিত হন। ১৮৭০ সালে শুধুমাত্র রাজশাহী জেলায় আড়াই লাখ মানুষ রেশম চাষ ও বস্ত্র উৎপাদন করে জীবিকা নির্বাহ করত।

কর্মসংস্থানের ভালো ব্যবস্থা ছিল রেশম চাষ ও রেশম বস্ত্র উৎপাদন। তবে রেশমের পুরো বাজার ছিল বিদেশে। এক সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে তৎকালীন বাংলায় উৎপাদিত রেশম বস্ত্র বিদেশে বাজার হারায়। এভাবেই রেশমের ঐতিহ্য হারাতে থাকে বাংলাদেশ। এছাড়া জাপান ও কোরিয়ার রেশম বিদেশের বাজার দখল করে। এমনকি বাংলাদেশেও আসতে শুরু করে এই দুটি দেশের রেশম পণ্য।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর রেশম চাষের ৯০ ভাগ এলাকাই ভারতের মধ্যে পড়ে এবং মাত্র ১০ ভাগ এলাকা পড়ে পাকিস্তানের মধ্যে। ফলে রেশম চাষ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে রাজশাহী অঞ্চলে। তৈরি রেশম পণ্যের বাজারও দিনে দিনে ছোট হয়ে আসে।

জানা যায়, ১৯৬২ সালে রেশম শিল্পের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে পাকিস্তান আমলে রাজশাহীতে স্থাপন করা হয় দেশের প্রথম রেশম কারখানা। সরকারি উদ্যোগে কারখানা স্থাপন ও রেশম চাষ সম্প্রসারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটে সরকারি ফার্ম তৈরি হয়। ব্যক্তি উদ্যোগেও রেশম চাষ হতে থাকে। সরকার চাষিদের উৎপাদিত রেশম গুটি সরকারি কারখানায় কিনে নেওয়ার চুক্তি হয়। কিন্তু অব্যাহত দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে রাজশাহী রেশম কারখানাটি লোকসানী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

অন্যদিকে স্বাধীনতার পর সরকার রেশম শিল্পের উন্নয়নে অধিকতর সুনীতি গ্রহণ করেন। বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখতে বিদেশী সাহায্য ও কারিগরী সহায়তা দেওয়া হয়। ১৯৭৭ সালে রেশমখাতকে সহায়তায় রেশম বোর্ড গঠন করা করে এর প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতে স্থাপন করা হয়। কিন্তু রেশম চাষ প্রকল্প সরকারের গৌণখাতে পরিণত হয়। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি রাজশাহীতে গড়ে উঠতে শুরু করে বেসরকারি উদ্যোগে রেশম শিল্প। বাড়তে থাকে রেশম বা তুঁতচাষ প্রকল্প। এই তুঁত থেকেই রেশম সুতা তৈরি হয়। বর্তমানে রাজশাহীর সিল্ক বা রেশম বলতে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত রেশম পণ্যকেই বুঝায়।

৮০র দশকে রাজশাহীতে অন্তত শতাধিক কারখানা গড়ে উঠে। সেসব কারখানায় বিপুল পরিমাণ রেশম বস্ত্র উৎপাদিত হতে থাকে। এসব রেশম বস্ত্র দেশের গন্ডি পেরিয়ে চলে যেতে থাকে ইউরোপ আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলোতে। স্থানীয় বাজার ছাড়াও বড় বড় কয়েকটি কারখানার পণ্য ব্র্যান্ড হয়ে বিক্রি হতে থাকে দেশের বড় শহরগুলোতে। তখন বছরে কেবল রেশম সুতার চাহিদা দেখা দিত অন্তত ৪০০ মেট্রিক টন। তবে ৯০’র দশকে এই রেশম শিল্পে নেমে আসে ধ্বস। ৯২ সালে বাংলাদেশ রেশম মালিক সমিতির পক্ষ থেকে রেশম শিল্প নিয়ে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়।

ওই সেমিনারের জানানো হয়, চীনে উৎপাদিত রেশম সুতার মাণ অনেক উন্নত। কাজেই চীন থেকে ভর্তুকী দিয়ে সুতা আমদানি করা হলে সেই সুতা দিয়ে তৈরী রেশম কাপড় বিদেশ রপ্তানী করা যাবে সহজেই। এর থেকে বাংলাদেশ প্রচুর পরিমাণে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন।

রেশম মালিক সমিতির এই পরামর্শে রাজি হয় সরকার। এরপর থেকে বিপুল পরিমাণে সুতা আমদানি হতে থাকে চীন থেকে। চাহিদা তুলনায় অতিরিক্ত সুতা আমদানি করে সেই সুতা আবার বিভিন্ন দেশে পাচারও করা হয়। প্রক্ষান্তরে মার খেতে থাকে দেশে গড়ে উঠা রেশম সুতা উৎপাদনকারী কারখানাগুলো। এভাবে দিনের পর দিন মার খেতে খেতে একে একে বন্ধ হয়ে যেতে থাকে রেশম সুতা উৎপাদনকারী কারখানাগুলো। এমনকি অব্যাহত লোকসানের মুখে ২০০২ সালে রাজশাহীতে গড়ে ওঠা সরকারি রেশম কারখানাটিও বন্ধ ঘোষণা করে সরকার।

ফলে বেকার হয়ে পড়েন কারখানার আড়াই হাজার শ্রমিক। কারখানাটি চালুর দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম হলেও সরকার এপথে আর এগোয়নি। কারখানাটি এখন প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অপরদিকে চীন থেকে আমদানিকৃত সুতার দামও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। এক সময় যে সুতার দাম ছিল প্রতি টন এক হাজার ডলার, এখন সেখানে দাঁড়িয়েছে ৬০০০ ডলারে। কিন্তু সেই তুলনায় বাড়েনি কাপড়ের দাম। ফলে একে একে বন্ধ হতে থাকে রাজশাহীতে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠা কারখানাগুলোও।

বাংলাদেশ রেশম মালিক সমিতির দেওয়া তথ্য মতে, রাজশাহীর বিসিক শিল্প এলাকায় এখন সর্বোচ্চ ১০-১২টি রেশম কারখানা চালু আছে। আগে রেশমের পাশাপাশি রেশমের বাদপড়া সুতার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছিল প্রায় তিন হাজার তাঁত শিল্প কারখানা। এখন সেগুলোর একটিও নাই। আবার বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার স্থানে গড়ে উঠেছে প্লাস্টিকের কারখানা, ব্যাটারির পানির কারখানা, অটো গ্যারেজ, কারিগরি কলেজ, গার্মেন্ট কারখানা, আটার মিলসহ নানা প্রতিষ্ঠান। আর রেশম কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাজ হারিয়ে এখন বেকার হয়ে আছেন অধিকাংশ শ্রমিক। কেউ বা জীবীকার তাড়নায় প্লাস্টিক কারখানা, অটো গ্যারেজের শ্রমিক বা অটোচালকের পেশা বেছে নিয়েছেন।

রাজশাহীর রেশম শিল্পের দুর্দশার কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ রেশম মালিক সমিতির অন্যতম সদস্য সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘এখন আর রেশমের ব্যবসা নাই। তাই জীবন বাঁচাতেই ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ব্যবসার দিকে ঝুঁকছেন। কেউ কেউ বিকল্প শিল্প করাখানাও গড়ে তুলছেন। এগুলো করা ছাড়া ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারবে না। অনেকইে এমনিতেই পথে বসে গেছেন। তারা পুঁজি হারিয়ে আর নতুন ব্যবসাও করতে পারছেন না। ফলে রেশম হারিয়েছে তার সুদিন। এর স্থলে গড়ে উঠছে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।’

বাংলাদেশ রেশম মালিক সমিতির সভাপতি লিয়াকত আলী বলেন, রেশম শিল্পকে ধ্বংস করতে এখনো নানাভাবে টালবাহান করা হচ্ছে। আগে যেখানে এ শিল্পের জন্য বিসিক থেকে বরাদ্দকৃত প্লটের প্রতি একরে সার্ভিস চার্জ আদায় করা হতে বছরে ১২ হাজার টাকা। এখন সেখানে আদায় করা হচ্ছে এক লাখ ৪৪ হাজার টাকা। আবার শতক প্রতি সরকারি ৩৫ টাকার খাজনার স্থলে বিসিক আদায় করছে ১৫০ টাকা করে। কিন্তু তারা সরকারের কষাগারে জমা দিচ্ছে মাত্র ৩৫ টাকা। ব্যাংক সুদের হারও এ শিল্পের জন্য কমানো হয়নি। বরং অন্যান্য ব্যবসার মতো এ শিল্প প্রতিষ্ঠানের ঋণের জন্যেও আদায় করা হচ্ছে ১৪-১৫ ভাগ সুদ। ফলে ব্যবসায়ীরা দিন দিন রেশম শিল্পের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। আর তাতে করেই অন্যান্য শিল্প কারাখানাসহ নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে।

তিনি আরও বলেন, সরকার একটু নজর দিলেই বিশাল সম্ভাবনাময় ঐতিহ্যবাহী রেশম আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। এর জন্য প্রথমেই রাজশাহী থেকে মংলাবন্দর পর্যন্ত সরাসরি রেলযোগাযোগ চালু করতে হবে। এছাড়াও রাজশাহী থেকে পণ্যবাহী কার্গো বিমান চালু করতে হবে। মংলাবন্দর পর্যন্ত রেল যোগাযোগ চালু করা না গেলে পদ্মা নদী ড্রেজিং করে পানিপথে নৌ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। তাহলে রাজশাহীর রেশম সুতার বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী কাপড় তৈরী সেগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিদেশে রপ্তানী করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক অর্থ উপার্জন করা যাবে। আর তাতেই ঘুরে দাঁড়াবে ঐথিহ্যবাহী রেশম শিল্প। ’

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY