‘চাটুকারের দল যেন কখনই ইতিহাস বিকৃতির সুযোগ না পায়’: প্রধানমন্ত্রী

0
78

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘আমার একটাই অনুরোধ থাকবে, ওই পাকিস্তানি প্রেতাত্মার পদলেহনকারী চাটুকারের দল আর যেন কখনই বাংলার মাটিতে ইতিহাস বিকৃত করার সুযোগ না পায়। তার জন্য বাংলাদেশের মানুষকে সজাগ থাকতে হবে।

শনিবার বিকেলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নাগরিক কমিটি আয়োজিত ‘নাগরিক সমাবেশে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর ‘ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় এ সমাবেশের আয়োজন করে নাগরিক কমিটি।

বঙ্গবন্ধু কন্যা ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তার পিতা শেখ মুজিবের তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ মানুষের সামনে ভাষণের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। একইসঙ্গে ৭ মার্চের ভাষণকে ইউনেস্কোর স্বীকৃতিতে সংস্থাটির মহাপরিচালকের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাঙালি জাতি বিজয় অর্জন করেছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে। এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঠিক পূর্বপাশে যেখানে আজকে শিশু পার্ক। এই শিশুপার্কের যে ফেন্সিংটা  (বেড়া) দেখা যাচ্ছে সেখানে দাঁড়িয়েই তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন- এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।

নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ চলার পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই মিত্র বাহিনীর কাছে সারেন্ডার করেছে, সই কথাও স্মরণ করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। মাত্র সাড়ে তিন বছর হাতে সময় পেয়েছিলেন। ৩০ লাখ শহীদ, লাখো মা-বোন ইজ্জত হারা, সেই সঙ্গে তিন কোটির উপরে মানুষ গৃহহারা। এক পয়সা রিজার্ভ মানি নেই। কৃষকের গোলায় একটা খাদ্য নেই। যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। সেই ধ্বংসস্তুপের উপর যাত্রা শুরু করে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে গড়ে তুলেছিলেন। নয় মাসের মধ্যে তিনি একটি সংবিধান আমাদের উপহার দিয়েছিলেন। সই সংবিধান মোতাবেক তিনি একটি নির্বাচনও করেছিলেন। পৃথিবীর কোন দেশে কখনও কোন বিপ্লবের পর, যুদ্ধের পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কিন্তু তিনি নিয়েছিলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য যে, বাংলাদেশকে বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে টেনে তুলে যখন তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, বাংলাদেশ সর্বপ্রথম ৭ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল। দেশের মানুষের জীবনে শান্তি নেমে এসেছিল। ঠিক সেই সময় ৭৫’র ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হল। শুধু তাকে নয়, একই সঙ্গে সেদিন রাতে চারটি বাড়িতে আক্রমণ করে প্রত্যেকের বাড়িতে হত্যাকা- চালানো হয়েছে।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর স্বাধীনতার ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছে। আজকে ৭ মার্চের ভাষণ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। অথচ কি দুর্ভাগ্য, এই ৭ মার্চের ভাষণ একসময় বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ছিল। ৭ মার্চের ভাষণ বাজাতে গিয়ে আমাদের বহু নেতাকর্মীকে জীবন পর্যন্ত দিতে হয়েছে।

আত্মত্যাগী এই নেতাকর্মীদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেই সকল মুজিব সৈনিকরা শত বাধা উপেক্ষা করে দিনের পর দিন এই ভাষণ বাজিয়ে গেছেন। যতই বাধা দেওয়া হয়েছে ততবেশি মানুষ জাগ্রত হয়েছেন এবং এই ভাষণ তারা বাজিয়েছেন। পৃথিবীর কোন ভাষণ এতোদিন ও এতো ঘণ্টা বাজানো হয়, আর মানুষ শোনে- এটা কিন্তু কোনদিন হয়নি।

যতই তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নাম মুছতে চেয়েছে, যতই তারা এই ভাষণ বন্ধ করতে চেয়েছে, ততই মানুষের ভেতরে উদ্দীপনা ও স্বাধীনতার চেতনা জেগে উঠেছে। তবে আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমার দেশের মানুষ, এই বাংলাদেশেরই নাগরিক; তারাই জাতির পিতাকে হত্যা করল, তারাই এই ঐতিহাসিক ভাষণ মুছে ফেলার চেষ্টা করল। এই ভাষণ নিষিদ্ধ করল। তারা কারা? ৭৫’র পর অবৈধভাবে যারা ক্ষমতা দখলের পালা শুরু করেছিল, যারা এই মাটিতে জন্মগ্রহণ করেনি, এই দেশ ও মাটির প্রতি যাদের কোনরকম টানই ছিল না, তারাই জাতির পিতার নাম মুছতে চেষ্টা করেছে। এই ভাষণ মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা করলেও কখনো তা মুছে ফেলা যায় না। তারা মুছে ফেলতে পারে নাই। আজকে সেটাই প্রমাণিত হয়েছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, যারা একদিন এই ভাষণ বাজাতে বাধা দিয়েছে, যারা জাতির পিতার নাম মুছতে চেষ্টা করেছে, আজকে যখন ইউনেস্কা এই ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, তাদের কি এখন লজ্জা হয় না! তাদের কি এখন এতটুকু দ্বিধা হয় না! জানি না, এদের লজ্জা শরম আছে কি না।’

এর কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এরা তো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রেতাত্মা। বাংলাদেশে থাকলেও তারা এই পাকিস্তানিদের লেজুড়বৃত্তি, খোষামোদি, তোষামোদি করেছে, তারা চাটুকারের দল, তাই তারা ইতিহাস বিকৃতি করতে চেয়েছে। কি দুর্ভাগ্য এ দেশের? ২১ বছর স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস জানতে পারেনি। মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগের ইতিহাস জানতে পারেনি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এটা জানতে পারেনি। তাদের চেয়ে দুর্ভাগা আর কেউ হতে পারে না।’

 

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছি। আমরা বিজয়ী জাতি। বিজয়ী জাতি হিসেবে বিজয়ের ইতিহাস জানতে পারবে না, এর থেকে দুর্ভাগ্যের আর কি হতে পারে।

৭ মার্চের ভাষণের স্বীকৃতির গুরুত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই স্বীকৃতি শুধু স্বীকৃতিই নয়। আসলে ইতিহাসও প্রতিশোধ নেয়। ইতিহাসও সত্যকে তুলে ধরে। যতই তা মুছতে চেষ্টা করুক, ইতিহাস তার সত্য স্থানটা অবশ্যই করে নেবে। আজকে সেই স্বীকৃতি বাংলাদেশ পেয়েছে। শুধু ভাষণ নয়, সমগ্র বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি সকল মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তি, সকলেই আজকে সম্মানিত হয়েছে। বিশ্ব দরবারে এই ভাষণের স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে।’

তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তি ক্ষমতায় থাকলে, একটা দেশের যে উন্নতি হয়, মানুষের যে উন্নতি হয়, সেটা আমরা প্রমাণ করেছি। ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে এই দেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নতি হয়েছে, যে দেশের মানুষকে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরত হত, আজকে সেই ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে আমাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় না।

আজকে আমাদের বাজেটের ৯৮ ভাগই আমরা নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করতে পারি সেই সক্ষমতা বাংলাদেশ অর্জন করেছে। যারা সারাজীবন বাঙালিকে গোলাম করে রাখতে চেয়েছিল, সারাজীবন বাঙালিকে একেবারে তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতির অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চেয়েছিল, তারা পরাজিত শক্তি। আর আমরা হচ্ছি মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী শক্তি।’

তিনি আরো বলেন, ‘জাতির পিতা চেয়েছিলেন এদেশের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে, অর্থনৈতিক মুক্তি নিয়ে আসতে, সাংস্কৃতিক অধিকার অর্জন করতে। বাঙালি হিসেবে আমাদের ঐতিহ্য, আমাদেও সংস্কৃতি আমাদের যা কিছু আছে তা সারাবিশ্বের বুকে সমুন্নত করতে পেরেছি।

রাষ্ট্রভাষার জন্য জীবন দিয়েছে বাঙালি। আজকে ইউনেস্কো স্বীকৃতি দিয়েছে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। আর আজকে ৭ মার্চের ভাষণও স্বীকৃতি পেয়েছে। আমরা আজকে সারা বিশ্বে গর্বিত জাতি। এই গর্বিত উন্নত শির যেন কখনো আর অবনমিত না হয়, সমগ্র বাঙালিকে সেইভাবেই নিজেদেরকে গড়ে তুলতে হবে। এগিয়ে যেতে হবে সামনের দিকে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। জাতির পিতা চেয়েছিলেন ক্ষুধামুক্ত ও দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়তে। ইনশাআল্লাহ আমরা এই বাংলাদেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধামুক্ত দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলবো। এদেশ ২০২১ সালের মধ্যে হবে মধ্যম আয়ের দেশ, ২০৪১ সালের মধ্যে হবে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ। বাঙালি জাতি আজকে যে মর্যাদা পেয়েছে, সেই মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত থেকেই তারা এগিয়ে যাবে। আজকের এই নাগরিক সমাবেশে আমাদের প্রতিজ্ঞা। আমরা সেই প্রতিজ্ঞাই নেবো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে আমরা উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলে জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণ করবো।’

সভার শুরুতে এক মিনিট নীরবতা পালন করে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরপর বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে বাণী পাঠ করা হয়। ‘ধন্য মুজিব ধন্য’, ‘শোন একটি মুজিবের চেয়ে লক্ষ্য মুজিবুরের কণ্ঠ’, যত দিন রবে পদ্মা মেঘনা যমুনা বহমান ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’ গানগুলো সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীরা। আর বক্তব্যের ফাঁকে অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী মাজেদ আকবর, নজরুল সংগীত শিল্পী শাহিন সামাদ, শিল্পী মমতাজ বেগম। কবিতা আবৃতি করেন নির্মলেন্দু গুণ, আসাদুজ্জামান নূর।

নাগরিক কমিটির সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন এমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। বক্তব্য রাখেন এমিরেটাস অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, শহীদজায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী এবং বাংলাদেশে ইউনেস্কোর কান্ট্রি ডিরেক্টর বিট্রিস কালদুল।

সমাবেশে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

পরে ইউনেস্কোর প্রতিনিধির হাতে একটি ধন্যবাদ স্মারক তুলে দেওয়া হয়। সমাবেশ সঞ্চালনা করেন নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার ও শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আবদুল আলীম চৌধুরীর মেয়ে ডা. নুজহাত চৌধুরী।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে গত ৩০ অক্টোবর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড (বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য) হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো। এই স্বীকৃতি উদযাপনে নাগরিক কমিটির উদ্যোগে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সূত্র: রাইজিংবিডি

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY