বিপথগামী পুলিশ সদস্যদের নামমাত্র শাস্তি

0
63

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব পুলিশ বাহিনীর। কিন্তু, সংস্থাটির কিছু সদস্যের চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি পুরো বাহিনীর সুনামের ওপর প্রভাব ফেলছে। হরহামেশাই সারাদেশে কিছু পুলিশ সদস্যকে রাস্তার ওপর গাড়ি থামিয়ে চাঁদাবাজি করতে তো দেখা যায়ই,মাঝেমাঝেই তারা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নিরীহ মানুষকে মারধরও করেন। কিন্তু, এরচেয়েও আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে- কিছু পুলিশ সদস্য অপহরণ, ছিনতাই, জমি দখল, ব্যবসায়ী বা রাজনীতিবিদদের জিম্মি করে সর্বস্ব কেড়ে নেওয়াসহ নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে খবরের শিরোনাম হচ্ছেন। ঘটনাগুলোর সামনে এলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।তবে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা খুবই কম।

পুলিশ সদর দফতর জানিয়েছে, বিভিন্ন অপরাধের জন্য গত ২০১১ সাল থেকে এ বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ৭৭ হাজার ৯২৬ জন পুলিশ সদস্যকে অর্থদণ্ড, তিরস্কার, বদলি,বরখাস্ত বাধ্যতামূলক অবসর ও চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।কেউ ছাড় পাচ্ছে না।

সর্বশেষ বুধবার (৮ নভেম্বর) সকালে আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকা থেকে শিল্প পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মকবুলকে আটক করেছে পুলিশ। মকবুলের নেতৃত্বে এক ব্যক্তিকে জিম্মি করে তার মায়ের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছিল। এসময় তাদের কাছ থেকে একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়। তার সহযোগী আরও তিন ভুয়া ডিবি পুলিশকে আটক করে আশুলিয়া থানা পুলিশ। এই ঘটনায় মকবুলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা শিল্প পুলিশ-১ এর পরিচালক সানা শামিনুর রহমান শামীম। এছাড়া, তার বিরুদ্ধে বিভাগীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া প্রক্রিয়া চলছে।

এই অভিযোগের চেয়েও গুরুতর অভিযোগ আসে গত ২৫ অক্টোবর। ওইদিন ভোর রাতে টেকনাফে ব্যবসায়ী আব্দুল গফুরকে জিম্মি করে ১৭ লাখ টাকা আদায় করার পর একটি মাইক্রোবাসে কক্সবাজারে যাওয়ার পথে চেকপোস্টে তল্লাশির সময় টাকাসহ সাত পুলিশকে আটক করেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এ সময় ডিবি পুলিশের এক এসআই পালিয়ে যান। উদ্ধার করা টাকা ওই ব্যবসায়ীকে ফেরত দেওয়া হয়েছে। এঘটনায় জেলা পুলিশ তাদের সাময়িক বরখাস্ত করে এবং ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ডিবি পুলিশের অভিযুক্ত  সদস্যরা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

পুলিশ সদর দফতর ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক সবসময় বলে আসছেন, ‘পুলিশ বাহিনী কারও ব্যক্তিগত দায় কখনও নেবে না। দায়ীদের বিরুদ্ধে সব সময় ব্যবস্থা গ্রহণ নেওয়া হয়।’

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনও পেশার মানুষই অপরাধে জড়াতে পারেন, যদি জবাবদিহিতা না থাকে, শাস্তির বিধান কার্যকর না থাকে। পুলিশ বাহিনী যেহেতু গণমানুষের সঙ্গে কাজ করে, তাদের আরও বেশি অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। হচ্ছেও তাই। এজন্য তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করতে হবে।

পুলিশ সদস্যদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার মধ্যে জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি নিজের বডিগার্ড দিয়ে এলাকায় জমি দখলের অভিযোগে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) দক্ষিণের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আব্দুল্লাহ আরেফকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শোকজ করে। তিনি নিজের দুই বডিগার্ডকে দিয়ে তার বাড়িতে বিতর্কিত জমিতে দেয়াল তুলেন । এবিষয়ে ভুক্তভোগী ব্যক্তি পুলিশ সদর দফতর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এরপর ওই পুলিশ কর্মকর্তার কাছে স্বারাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জবাব চাওয়া হয়।

পুলিশ সদর দফতরের সর্বশেষ তথ্য মতে, ২০১১ সাল থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত নানা অপরাধে জড়িত থাকার অপরাধে বিভিন্ন পদের ৭৭ হাজার ৯২৬ জন পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন ধরনের সাজা দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ৭৬ হাজার ৯৯ জনই কনস্টেবল থেকে উপপরিদর্শক (এসআই) পদের। এছাড়াও পরিদর্শক, সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ও ওপরের পদের কর্মকর্তারা শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন। এদের মধ্যে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ৬২৪ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। চাকরিচ্যুতদের মধ্যে ৬০৮ জনই কনস্টেবল থেকে এসআই পদের। বাকি ১৫ জনের মধ্যে দু’জন পরিদর্শক ও ১৩ জন এএসপি ও এর ওপরের পদের কর্মকর্তা।

অপরদিকে, পারিবারিক ও চাকরির মেয়াদ বিবেচনায় নিয়ে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে ৭২ জন পুলিশকে। এদের মধ্যেও কনস্টেবল, এসআই পরিদর্শক, এএসপি ও এর ওপরের পদের কর্মকর্তা রয়েছেন। এছাড়া অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় লঘুদণ্ড দেওয়া হয় ৭১ হাজার ৭৭০ জন পুলিশ সদস্যকে।

পুলিশ সদস্যরা এভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুলিশের বিরুদ্ধে অপরাধ করার অভিযোগ নতুন কিছু না। সমাজে যখন অপরাধীর জন্য জবাবদিহিতা থাকে না, যার যেখানে ক্ষমতা আছে, সে যদি কোনোভাবে নিশ্চিত করে ফেলতে পারে যে তাকে আর কেউ ধরবে না। ধরলেও তার শাস্তি পাবে না, তখন যেকোনও পেশার মানুষ অপরাধ করতে পারে। পুলিশের জন্য এই কাজ করা আরও সহজ। পুলিশ গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে টাকা নেয়। তারা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা নেয়। এসব বিষয় সবাই জানে। কিন্তু তাদের কোনও শাস্তি হয় না। তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বড়জোড় তাদের এক থানা থেকে আরেক থানায় বদলি করা হয়। আমরা এখনও শুনিনি, ছোট হোক বড় হোক পুলিশের অপরাধের জন্য কোনও শাস্তি হয়েছে। শুনি নাই। তাদের জেল, জরিমানা হতে দেখিনি।’

তিনি বলেন, ‘জবাবদিহিতা করতে হয় না বলেই তারা অপরাধ করেই যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এজন্য অনেক বেশি শক্ত হওয়া উচিৎ। যদি কয়েকটি শাস্তি হতো তাহলে কমে (অপরাধ) আসতো।’

তবে পুলিশের কেউ অপরাধ করলে তাদের শাস্তি হয় বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। তিনি বুধবার এক প্রশ্নের উত্তরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘যারাই অনিয়ম করছে, তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাদের বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে। সে যেই হোক, পুলিশ হোক বা নিরাপত্তা বাহিনীর; কেউই ছাড় পাচ্ছে না।’

সূত্র: বাংলাট্রিবিউন

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY