যে উন্নয়নে অর্থের প্রয়োজন হয় না

0
279

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: উন্নয়ন মানে কেবল অবকাঠোমোগত উন্নয়ন নয়, উন্নয়ন হলো জীবন-যাপনকে সহজ করা, নাগরিকদের বেশি বেশি তুষ্টি বিধান করা। তাই উন্নয়ন মানে কেবল অবকাঠামোগত বা অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়। প্রতিটি নাগরিকের জীবন-যাপনকে সহজ করা হচ্ছে রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যেমন, আমি কোথাও যেতে চাই, তাহলে সহজে এবং স্বচ্ছন্দে কিভাবে যেতে পারি তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। আমি কোনও একটি লাইসেন্স পেতে চাই, পাসপোর্ট পেতে চাই, চাকরি পেতে চাই, তাহলে তা কিভাবে সহজে পেতে পারি। আমি পড়ালেখা শিখতে চাই বা কোনও বিশেষ বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে চাই, তা কিভাবে সহজে করা সম্ভব। আমি একটি বিষয়ে কম নম্বর পেয়ে ফেল করেছি বা একটি বিষয়ে পরীক্ষা দিতে পারিনি তা আবার কিভাবে দিতে পারি এবং আমার প্রয়োজনীয় ডিগ্রিটা পেতে পারি। আমি ট্যাক্স, ভ্যাট বা খাজনা দিতে চাই, তা কিভাবে সহজে দিতে পারি। আমি ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস বা ব্লুবুক পেতে চাই, তা কিভাবে সহজে পেতে পারি। আমি রং পার্কিং-এর জন্য জরিমানা দিতে চাই, তা কিভাবে সহজে দিতে পারি।
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত কোনও অর্থমন্ত্রী এ নিয়ে ভেবেছেন বা এর ওপর জোর দিয়েছেন তা বলা যাবে না। এটি বাজেট আলোচনায় থাকে না। অথচ বাজেটের শুরুতে এ বিষয়ে আলোচনা থাকা দরকার এবং বিগত বছরের বাজেট বাস্তবায়নের ফলে এসব বিষয়ে কী কী অগ্রগতি হলো এবং আর কোথায় কোথায় কী কী সমস্যা রয়ে গেছে তা আলোচনায় আনা দরকার। প্রতিটি মন্ত্রণালয় ভিত্তিক কী কী সমস্যা আছে এবং তার সমাধানে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে আর কী কী বাকি আছে বা আর নতুন কী কী সমস্যা তৈরি হয়েছে তা বাজেট আলোচনায় থাকা দরকার। এ বিষয়ে বিচ্ছিন্নভাবে সামান্য কিছু কিছু কাজ করা হয়েছে, তবে তা জনগণের চাপে। বাংলাদেশ ব্যাংক যেমন বিভিন্ন ব্যাংককে নির্দেশ দিয়ে কৃষকদের জন্য ১০ টাকায় হিসাব খোলা বা পথশিশুদের জন্য ব্যাংকে হিসাব খোলার কাজটি করিয়েছেন অর্থাৎ তা করা সম্ভব ছিল কিন্তু এতকাল তা করার চেষ্টা করা হয়নি। একজন কৃষক যদি ১০ টাকায় একটি ব্যাংক হিসাব খুলতে পারে, তাহলে তার জন্য ব্যাংকে সঞ্চয় করা, ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া বা ফেরত দেওয়া অনেক সহজ। এখন যেমন আমরা তথ্য প্রযুক্তির কারণে অতি সহজে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় টাকা পাঠাতে পারছি। এটি সরকার নয় বরং বিভিন্ন ব্যাংক নিজস্ব উদ্যোগে বাস্তবায়ন করেছে।

চাকরির জন্য দরখাস্তের সাথে ব্যাংক ড্রাফট/পে-অর্ডার জমা দেওয়া বা গেজেটেড অফিসারকে দিয়ে সত্যায়িত করার শর্ত জুড়ে দেওয়া একজন বেকারের জন্য আরেকটি বোঝা হিসাবে পরিগণিত হয় যা ভুক্তভোগীরা ভালোভাবে জানে। সরকার যদি নিজেদের আইটি বিশেষজ্ঞকে দিয়ে একটি কর্মসংস্থান ওয়েবসাইট করে যেখানে দেশি এবং বিদেশি নিয়োগকারীরা কর্মখালির বিজ্ঞাপন দিতে পারবে বা যেখানে বেকাররা দক্ষতা অনুযায়ী তাদের জীবনবৃত্তান্ত আপলোড করতে পারবে তাহলে লাখ লাখ লোক কোনও কষ্ট না করে তার কাঙ্খিত কর্মের সুযোগ পেতে পারে। এটিও বেকার সমস্যা সমাধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। উপরন্তু সে ওয়েবসাইট থেকে সরকার কোটি কোটি টাকা আয়ও করতে পারে।

সরকার যদি এভাবে একটি তালিকা তৈরি করে প্রতিটি কাজকে সহজ করে দেয় অর্থাৎ কোনও টাকা খরচ না করে কেবল নিয়মটা পাল্টে দেয়। এতে নাগরিকদের জীবন-যাপন অনেক সহজ হয়ে যাবে। যেমন, ঢাকা শহরে নারীদের চলাচলের জন্য করণীয় নির্ধারণে বিশ্ব ব্যাংকের জন্য একটি গবেষণা করতে গিয়ে আমরা পরামর্শ দিয়েছিলাম যে, বাসে ২০% সিট যেন মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ করা হয়। সরকার পরবর্তীতে ঢাকা শহররের বড় বাসে ৯টি এবং ছোট বাসে ৬টি সিট সংরক্ষণ করেছে। প্রতিদিন ঢাকা শহরে প্রায় ২-২.৫ লক্ষ মহিলা এখন সেই সংরক্ষিত আসনের সুবিধা পাচ্ছে। এতে সরকারের কোনও টাকা খরচ বা ব্যয় করতে হয়নি। শুধু একটি সার্কুলার দিতে হয়েছে। এভাবে যদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়মগুলো পরিবর্তন করা হয়, তাহলে সরকার কোনও অর্থ ব্যয় না করেও নাগরিকদের জীবন-যাপন সহজ করতে পারে। ঢাকা শহরে যে রিকসা বা বাসগুলো চলে সেগুলোর বডি এমনই যে, এতে মহিলা, শিশু এবং বৃদ্ধরা অনেক সময় উঠতেই পারে না কারণ তার উচ্চতা এতটাই বেশি বা দরজা এতটাই প্রতিকুল যে, তা এমনকি তরুণদের জন্যও সহজসাধ্য নয়। সরকার কেবল এর জন্য নির্দিষ্ট ডিজাইন দিলে এবং নতুন গাড়ির লাইসেন্স দেওয়ার সময় তা অনুসরণে বাধ্য করলেই চলে। বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে রিকসার একটি নতুন ডিজাইন এলজিইডি থেকে করা হয়েছিল যাতে লিভার সিস্টেম থাকার কারণে অতি সামান্য পরিশ্রমে একজন রিকসা চালক রিকসাটি চালাতে পারেন এবং তার পা-দানি সিএনজির মতো নিচু ছিল এবং রিকসাটি উল্টানোর কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। এটি নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ লোকদের ব্যবহার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু তা চালু করা হয়নি এবং এখন পর্যন্ত সিটি করপোরেশনগুলো ঢাকাতে তা চালুর উদ্যোগ নেয়নি। এলজিইডিও এ বিষয়ে আর কোনও উদ্দ্যোগ নেয়নি।

একইভাবে বলা যায় যে, কোনও ব্যবসায়ী যদি ভেজাল পণ্য বিক্রি করে বা ওজনে কম দেয় এবং তা যদি ধরা পড়ে তাহলে তার ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করা এবং তাকে সারা জীবনের জন্য ব্যবসা করার অযোগ্য ঘোষণা করা যায়। এ নিয়মটি পৃথিবীর কিছু দেশে আছে। তার জন্য সরকারের শুধু কিছু আইনি পরিবর্তন আনা দরকার। বর্তমানে কঠিন আইন করার ফলে এর কিছুটা উন্নতি হয়েছে কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। যে কোনও পণ্য বিক্রির সময় মাপে কম দেওয়া এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

অন্য আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যায়। যেমন, মেলা করে কর আদায়ের সময় শুধু হেল্প ডেক্স ব্যবহার না করে স্থায়ীভাবে প্রতিদিন, এমন কী বন্ধের দিন সরকার এই ট্যাক্স আদায়ের ব্যবস্থা রাখলে ক্ষতি কি? মানুষ বন্ধের দিনও ট্যাক্স দিতে পারে। অন-লাইনে ট্যাক্স/ভ্যাট-এর রেজিট্রেশন করা যায় কিন্তু তা করতে গেলে দেখা যায় যে, সার্ভারের নানান সমস্যা। প্রকৃত ট্রেক্স বা ভ্যাট প্রদানকারীদের কী ধরনের সমস্যা হয় বা তারা কী চাচ্ছেন তার কোনও তথ্য বাজেট বক্তৃতায় থাকে না।

এভাবে বাজেট ঘোষণার প্রথম অংশে মাননীয় অর্থমন্ত্রী যদি নাগরিকদের জীবন-যাপনকে সহজ করার জন্য সরকার যে সব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার তার একটি তালিকা তৈরি করে পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করতেন তাহলে তা কোটি কোটি মানুষের ভোগান্তি লাগব করতো এবং সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে যে সুবিধা দিচ্ছে তার চেয়ে বেশি সুবিধা জনগণ পেতো। মাননীয় অর্থমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ঠরা এটি একটু ভেবে দেখবেন কি?

লেখক: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY