হামলার পরিকল্পনা রাজশাহীতে, কৌশল নির্ধারণ গাইবান্ধায়, চূড়ান্ত অপারেশন প্ল্যান ঢাকায়

0
308

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গিদের ভয়াবহ হামলার ঘটনাটি  নিছক কোনও আক্রমণ ছিল না, এটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ। এই হামলার পরিকল্পনা করা হয় রাজশাহীতে, সেই পরিকল্পনার প্রাথমিক কৌশল ঠিক করা হয় গাইবান্ধায় এরপর ঢাকায় বসে দিনের পর দিন রেকি করে হামলার লক্ষ্যবস্তু, সমর কৌশল ও অস্ত্র প্রবেশের উপায় নির্ধারণ করে জঙ্গিরা।

চার মাস ধরে এই পরিকল্পনা করা হলেও ওই হামলায় যে ৫ জঙ্গি অংশ নেয় তারা ‘আত্মঘাতী’ হওয়ার নির্দেশ পেয়েছিল ঘটনার মাত্র দুই মাস আগে। ইসলাম ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ‘শহীদ’ হওয়ার জন্য ‘বাইয়াত’ গ্রহণ করানো হয়েছিল ওই ৫ তরুণকে। আর সিরিয়াভিত্তিক ইসলামিক স্টেটস (আইএস) জঙ্গিদের পরিচয় ব্যবহার করে এই হামলা চালানো হলেও হামলাকারী ও তাদের মাস্টারমাইন্ডরা ছিল দেশি নব্য জেএমবি’র সদস্য।

হলি আর্টিজানে হামলার এক বছরেও এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা না পড়লেও হামলাটির পরিকল্পনা ও  এ ঘটনার নেপথ্যের রূপকারদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)।

এ ঘটনার নেপথ্যে থাকা চার জঙ্গির মধ্যে তিনজনের আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও সিটিটিসি কর্মকর্তাদের অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে হামলার পরিকল্পনার আদ্যোপান্ত। তাদের বক্তব্যে জানা গেছে, সারাবিশ্বের মনোযোগ পাওয়ার জন্যই বেছে নেওয়া হয় গুলশানের কূটনৈতিক পাড়াকে। বিদেশিদের আনাগোনা আছে এমন একটি জায়গায় হামলার পরিকল্পনা থেকে টানা চার মাস ধরে রেকি করেই বেছে নেওয়া হয়েছিল হলি আর্টিজানকে।

এ বিষয়ে সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার তদন্তে এর ‘ক্লিয়ার পিকচার’ পেয়েছি। এই ঘটনার নেপথ্যের মাস্টারমাইন্ড, পরিকল্পনকারী, পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী, অর্থ ও অস্ত্র দাতা এবং সহযোগীদের সবার নাম পরিচয় পেয়েছে। কে কি ভূমিকায় ছিল তাও জানতে পেরেছি।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবেও কর্মরত এই কর্মকর্তা বলেন, গ্রেফতারকৃত চার জনের মধ্যে তিন জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এছাড়া গোয়েন্দা অনুসন্ধানেও এই হামলার আদ্যোপান্ত উঠে এসেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজধানীর বিদেশি অধ্যুষিত একটি জায়গায় হামলার পরিকল্পনা থেকেই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিকে জঙ্গিরা প্রথম বেছে নেয় গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে।  রাজশাহীর একটি আস্তানায় বসে এ বিষয়ে প্রথম পরিকল্পনা করা হয়। এরপর গাইবান্ধার জেলার সাঘাটা থানাধীন বোনারপাড়া বাজারস্থ কলেজ মোড় সংলগ্ন এলাকায় সাখাওয়াত হোসেন শফিক ও বাইক হাসান নামে দুই জঙ্গির ভাড়া নেওয়া বাসায় এ বিষয়ে বৈঠক করে নব্য জেএমবি’রমাস্টার মাইন্ড তামিম চৌধুরী, মেজর জাহিদ, সারোয়ার জাহান মানিক ও তাদের সহযোগী তারেক, মারজান, শরিফুল ইসলাম খালিদ ও রাজীব গান্ধী। সেখানেই গুলশান হলি আর্টিজান বেকারিতে আত্মঘাতী হামলার বিষয়ে দায়িত্ব বণ্টন ও বিস্তারিত পরিকল্পনা করে মাস্টার মাইন্ডরা।

ওই বৈঠকেই হলি আর্টিজানে সন্ত্রাসী হামলায় দেশি-বিদেশি হত্যার মূল সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয় তামিম চৌধুরী ওরফে তালহাকে।কিন্তু, মাস্টার মাইন্ডদের কেউ এই আত্মঘাতী হামলায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে না চাওয়ায় তাদের হামলাকারী নির্বাচনের দরকার পড়ে।

পাঁচ হামলাকারীকে বাছাই

তদন্ত সূত্র জানায়, গত বছরের এপ্রিলে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে আত্মঘাতী হামলার জন্য কয়েকজন তরুণকে বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে জেএমবির মাস্টার মাইন্ডরা। এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা মেলে ঘটনার পর গ্রেফতার হওয়া জঙ্গি জাহাঙ্গীর ওরফে রাজীব গান্ধীর জবানবন্দিতে। আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সে জানিয়েছে, ‘‘২০১৬ সালের এপ্রিল মাসের শেষের দিকে খালিদ (জঙ্গি শরিফুল ইসলাম খালিদ) আমার কাছে দুই জন যুবক চায়, যারা আত্মঘাতী হামলায় অংশ নেবে। আমি শরিফুল ইসলাম ওরফে ডন এবং খাইরুল ইসলাম পায়েল ওরফে বাঁধন নামে দুই জন যুবককে খালিদের কাছে বুঝিয়ে দেই। এই দুই জন আমার কাছে ‘বাইয়াত’ নেওয়া (ধর্মের নামে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ)। খালিদ তখন আরও বলে যে তার হাতে আরও ৪ জন আত্মঘাতী যুবক আছে। তারা হলো রোহান ইমতিয়াজ ওরফে স্বপন, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ওরফে বিকাশ, নিবরাস ও মোবাশ্বের।’

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, এই ছয় জনের সঙ্গে সেসময় আবির নামে আরও এক তরুণকে হামলার জন্য নির্বাচন করা হয়। মোট সাত তরুণের মধ্যে শরিফুল ইসলাম ডন ও আবীর হোসেনকে পরবর্তীতে শোলাকিয়ায় হামলার জন্য প্রস্তুত করা হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, গুলশান হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গিদের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে। তাদের মূল প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদুল ইসলাম, সংগঠনে যাকে মেজর মুরাদ নামে সবাই জানতো। সহযোগী প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছে আবু রায়হান তারেক নামে এক জঙ্গি। মেজর মুরাদ মিরপুরের রূপনগরে আর তারেক কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় সিটিটিসির অভিযানে মারা গিয়েছে।

এর সত্যতা মেলে জাহাঙ্গীর ওরফে রাজীব গান্ধীর জবানবন্দিতে। এ বিষয়ে সে জানিয়েছে, ‘ছয় জন আত্মঘাতী নিয়ে তামিম চৌধুরীর পরিকল্পনায় ২০১৬ সালে প্রথম সপ্তাহে গাইবান্ধার সাঘাটা থানাধীন ফুলছড়ি চরে শুরু হয় সামরিক প্রশিক্ষণ। এই সামরিক প্রশিক্ষণে তারেক বোমা প্রশিক্ষণ দিত, মেজর জাহিদ অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দিত, তামিম চৌধুরী, সারোয়ার জাহান মানিক, মারজান, রিগ্যান, খালিদ, রিপন এই প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে মাঝে মাঝে আসতো এবং নব্য জেএমবির বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিত। আমিও মাঝে মাঝে ওই প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে গিয়েছি।’

হামলাকারীদের বসুন্ধরার বাসায় অবস্থান

গুলশান হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গিরা হামলার মাস খানেক আগে বসুন্ধরার বাসায় ওঠে। ওই বাসাতেই হামলার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করা হয়। সেখানে তামিম চৌধুরী, মারজানসহ অন্যরা নিয়মিত যাতায়াত করতো। রাজীব গান্ধী তার জবানবন্দিতে বলেছে, ২০১৬ সালের মে মাসের শেষের দিকে প্রশিক্ষণ শেষে তারেক ও মারজান প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৬ জনকে নিয়ে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি ৬ তলা বিল্ডিংয়ে নিয়ে আসে।

ওই বিল্ডিংয়ের ছয় তলায় আগে থেকেই তানভীর কাদেরী তার পরিবারসহ অবস্থান করছিল। তামিম চৌধুরী সেখানে সবাইকে নিয়ে দফায় দফায় মিটিং করে।’ রাজীব গান্ধী বলে, ‘গত বছরের ৩০ জুন সকাল ৯টার সময় বসুন্ধরার বাসায় মানিক ভাই এলে তামিম ভাই নিবরাসদের নিয়ে মিটিং করে। সেখানে মানিক ভাই নিবরাসদেরকে জানায়, আগামীকাল তোমরা সবাই গুলশানে হলি আর্টিজানে অপারেশন করবে। সেখানে বিদেশিদের আনাগোনা বেশি।’

অস্ত্র ও গ্রেনেড সংগ্রহ

গুলশানে হলি আর্টিজানে হামলায় জঙ্গিরা একে-২২ রাইফেল, পিস্তল, গ্রেনেড, চাপাতি ব্যবহার করে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাশের দেশ ভারতের বিহার রাজ্য থেকে একে-২২ রাইফেল এবং ছোট অস্ত্রগুলো সংগ্রহ করা হয়। গ্রেনেড তৈরির উপকরণ বিশেষ করে পাওয়ার জেল, ডেটোনেটরও সংগ্রহ করা হয় ভারত থেকে। এ বিষয়ে রাজীব গান্ধী তার জবানবন্দিতে বলেছে, ‘হলি আর্টিজানে হামলা করার জন্য ৩/৪টি একে-২২ রাইফেল এক মাস আগেই রিপনের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়।

মারজান, ছোট মিজান এর মাধ্যমে ভারত হতে ৩/৪টি ছোট অস্ত্রগুলিসহ এবং বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকদ্রব্য সংগ্রহ করে। মারজান তার ভগ্নিপতি সাগরের মাধ্যমে গুলশান হামলার ব্যবহৃত অস্ত্র ও বিস্ফোরক আমের ঝুড়িতে করে ঢাকার বসুন্ধরার বাসায় নিয়ে আসে। মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় চকলেট নামে এক জঙ্গির বাসায় সোহেল মাহফুজ হলি আর্টিজান হামলার গ্রেনেড তৈরি করে। ঐ গ্রেনেডগুলি মারজান ও চকলেট বসুন্ধরার বাসায় নিয়ে আসে।’

এ হামলার জন্য বিপুল অর্থ সংগ্রহ করে জঙ্গিরা। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নব্য জেএমবির যে ‘কমন ফান্ড’ সেখান থেকেই হলি আর্টিজানে হামলার জন্য অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। রাজীব গান্ধী তার জবানিতে বলেছে, ‘গত বছরের ২৮ জুন তামিম চৌধুরী বিদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে ১৮ লাখ টাকা আনান। সে টাকা তার হাতে তুলে দেয় চকলেট। এই টাকা গুলশান হামলার ব্যবহৃত অস্ত্র, গ্রেনেড ও বোমা কেনার কাজে খরচ হয়।’

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘গুলশান হামলার জন্য জঙ্গিদের ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। অস্ত্র ও গ্রেনেড সংগ্রহ, বাসা ভাড়া, প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য কাজে এসব খরচ করা হয়েছে। তবে এসব টাকা কমন ফান্ড থেকেই খরচ করা হয়েছে।’

হামলার আগের দিন সারোয়ার জাহানের বয়ান

হামলার আগের দিন বসুন্ধরার বাসায় চূড়ান্ত মিটিং করে নিও জেএমবির শীর্ষ নেতারা। ওই মিটিংয়ে তামিম চৌধুরী ছাড়াও নব্য জেএমবির আরেক শীর্ষ নেতা সারোয়ার জাহান মানিক উপস্থিত ছিলেন। এ প্রসঙ্গে রাজীব গান্ধী তার ভাষ্যে বলেছে, ‘‘হামলার আগের দিন জোহরের নামাজের পর মানিক ভাই গুলশান হামলার বিষয়ে খুতবা দেয়। খুতবায় তিনি বলেন, ‘তোমরা হতাশ হবে না। একজনের গুলি শেষ হলে অপরজন ব্যাকআপ দেবে। মনে রাখবে, আমাদের হারানোর কিছু নেই। অপারেশনের সময় তাড়াহুড়ার দরকার নেই। খুব গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবে।

আর মুশরেকদের দয়া দেখাবে না। এমনকি সে যদি সাংবাদিকও হয়। সর্বদা জিকিরের মধ্যে থাকবে। যদি কেউ বন্দি হয়ে যাও তাহলে নিজে নিজেকে শেষ করে দিবে। আর একটা জিনিস মনে রাখবে যে, হলি আর্টিজানের গেইট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলেই আমরা সফল। কারণ, বিশ্ব জেনে যাবে যে বাংলাদেশেও হামলা হয়েছে। তাই শুধু হামলা হলেই আমরা সফল।’ খুতবা শেষ করার আগে আবারও বলেন, ‘আমাদের হারানোর কিছু নেই, আমরা বিজয়ী।’ এরপর যোহরের সুন্নত নামাজ পড়ে মানিক ভাই তামিম ভাই এর সঙ্গে কথা বলে চলে যায়।’’

হামলার আগে হলি আর্টিজান রেকি

গুলশান হামলার আগে একাধিকবার হলি আর্টিজান রেকি করা হয়। এই হামলার অন্যতম মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরী নিজেও হলি আর্টিজান রেকি করেছিল। এছাড়া পাঁচ হামলাকারীও পরপর দু’দিন হলি আর্টিজানে গিয়ে রেকি করে আসে। রাজীব গান্ধী তার জবানবন্দিতে বলেছে, ‘তামিম চৌধুরী গুলশানে হামলা করার জন্য মারজান, চকলেট ও আমাকে নির্দেশ দিয়ে বলে যে রোহান, নিবরাস, খায়রুল ইসলাম পায়েল ওরফে বাঁধন, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ওরফে বিকাশ, মোবাশ্বের যেন সন্ধ্যার পর আলাদা আলাদা করে হোটেলটি রেকি করে আসে। তামিমের কথা মতো মারজান, রোহান ও নিবরাসকে নিয়ে ২৭ জুন সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হয়ে গুলশান হলি আর্টিজান বেকারিতে রেকি করে আসি। পরেরদিন সন্ধ্যায় আবার চকলেট, বিকাশ ও বাধনকে নিয়ে গুলশান হলি আর্টিজান বেকারিতে যাই। রাত আনুমানিক সাড়ে দশটায় বসুন্ধরার বাসায় ফিরে এসে সবার সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করি।’

হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার জন্য পাঁচ হামলাকারীদের মধ্যে রোহান ইমতিয়াজকে কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। রাজীব গান্ধী তার জবানবন্দিতে বলেছে, ‘২৯ জুন সন্ধ্যার পর তামিম, রোহান ও মোবাশ্বের বের হয় এবং ওই দিনও হলি আর্টিজানে রেকি করে রাত ১১টায় ফিরে আসে। তামিম ভাই (তামিম চৌধুরী) তখন হামলাকারী দলের সবাইকে নিয়ে বসে। রোহান ইমতিয়াজকে হামলার মূল দায়িত্ব দেয়া হয়। তামিম চৌধুরী চকলেট ভাইকে নির্দেশ দেয় নিবরাসসহ ওদের ৫ জনের জন্য ৫টি টি-শার্ট ও জিন্সের প্যান্ট কিনে আনতে। সে অনুযায়ী আমরা গুলশান-১ নম্বর থেকে প্যান্ট ও টি-শার্ট কিনে নিয়ে আসি।’

 হামলার দিন দুই দলে বের হয় পাঁচ জঙ্গি

গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার জন্য বিকেলের দিকে দুই দলে বের হয় পাঁচ জঙ্গি। প্রথম দলে রোহান, মোবাশ্বের ও নিবরাস একসঙ্গে বের হয়। এর এক ঘণ্টা পর বের হয় পায়েল ও উজ্জ্বল। রাজীব গান্ধী তার জবানবন্দিতে জানিয়েছে, ‘১ জুলাই সকাল ১০টার সময় চকলেট বসুন্ধরার বাসায় এসে হলি আর্টিজানে হামলাকারী প্রত্যেকের ব্যাগে একটি করে বড় অস্ত্র (একে-২২), একটি পিস্তল ও একটি ছিটকানি, বড় চাকুসহ পর্যাপ্ত পরিমাণে গুলি ও গ্রেনেড ঢুকিয়ে দেয়। এরপর বসুন্ধরার কাছে আমরা জুমার নামাজ পড়ি।

বেলা ৩টার দিকে তামিম ভাই (তামিম চৌধুরী) সিদ্ধান্ত নিয়ে জানায় যে, ‘প্রথমে আমি আমার স্ত্রীসহ মিরপুরের নতুন বাসায় চলে যাবো। তারপর আছর নামাজের পর রোহান, নিবরাস, মোবাশ্বের তাদের অস্ত্র গুলির ব্যাগসহ বের হয়ে যাবে।এর এক ঘণ্টা পর উজ্জল ও পায়েল তাদের অস্ত্র ও গুলির ব্যাগসহ বের হয়ে যাবে।

পরে বিকাল ৫টার দিকে তামিম ভাই ও চকলেট বের হয়ে যাবে। তার কিছুক্ষণ পর তানভীর কাদেরী তার পরিবার নিয়ে বের হয়ে যাবে।’ ওই সময় তামিম চৌধুরী তানভীর কাদেরীকে বলে আমরা বের হওয়ার পর আপনি আর কোনোভাবেই দেরি করবেন না। আপনি অবশ্যই মাগরিবের আগে বের হয়ে যাবেন। প্রয়োজনে ইফতার সঙ্গে নিয়ে যাবেন। চকলেট ভাই একটি সিএনজি ভাড়া করে দিলে আমি বেলা অনুমান ৩টার সময় পরিবারসহ মিরপুর মধ্য পীরেরবাগ ভাড়া বাসায় চলে যাই।’

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ‘জঙ্গিরা রিকশা ও পায়ে হেঁটে বসুন্ধরার বাসা থেকে হলি আর্টিজানে পৌঁছায়। হলি আর্টিজান বেকারিতে যাওয়ার জন্য তারা নর্দ্দা হয়ে বারিধারা ডিওএইচএস গেট দিয়ে লেকের পাড় ঘেঁষে হলি আর্টিজানের দিকে এগিয়ে যায়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই সড়কের কোথাও পুলিশি চেকপোস্ট ছিল না। চেকপোস্ট এড়ানোর জন্যই তারা ইউনাইটেড হাসপাতালের পাশের সড়ক দিয়ে ৭৯ নম্বর সড়কের চৌরাস্তায় গিয়ে পৌঁছায়।

হামলার রাতে মাস্টারমাইন্ড তামিম ও তার সহযোগীদের অবস্থান

হলি আর্টিজানে হামলার ওই রাতে মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরী ও নূরুল ইসলাম মারজান শেওড়াপাড়ার একটি বাসায় অবস্থান করে। ভেতরে থাকা জঙ্গিদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ও বার্তা আদান-প্রদানের প্রমাণও পেয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এসময় মিরপুরের পীরেরবাগ এলাকার একটি বাসায় অবস্থান করছিল জাহাঙ্গীর ওরফে রাজীব গান্ধী।

রাজীব তার জবানিতে বলেছে, ‘‘রাত ৯টার দিকে মারজান ভাই আমাকে থ্রিমা আইডির মাধ্যমে হলি আর্টিজানে হামলার আপডেট দেখতে বলে। তখন আমি নামাজ, দোয়া ও জিকির করতে থাকি। যেন আল্লাহ আমাদের অপারেশন সফল করে এবং আমার ভাইদের শহীদ করে। সারারাত নেটের মাধ্যমে আমাদের অপারেশনের সফলতা দেখে আমি খুব খুশি ছিলাম। সকাল ৭টার দিকে মারজান ভাই আমাকে থ্রিমা আইডির মাধ্যমে জানায় যে, সেনাবাহিনী প্রস্তুত কিছুক্ষণের মধ্যে ভাইয়েরা শহীদ হবে। আপনারা দোয়া করবেন। আমি ও আমার পরিবার ভাইদের জন্য দোয়া করি এবং সেনাবাহিনীর অভিযানে ভাইয়েরা শহীদ হলে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলি।’’

হলি আর্টিজানের ভেতর থেকে জঙ্গিদের বাইরে যোগাযোগ

হলি আর্টিজানে হামলার পর জিম্মি হওয়াদের দু’জনের মোবাইল থেকে জঙ্গিরা বাইরে থাকা তামিম ও মারজানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, হলি আর্টিজান বেকারি থেকে উদ্ধার করা ৩০টি মোবাইল ফোন এফবিআইয়ের ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়। ফরেনসিক পরীক্ষায় হলি আর্টিজান বেকারিতে নিহত ইতালীয় ক্লদিও এবং বেঁচে ফিরে আসা শ্রীলঙ্কান নারী ফেফতা সায়মার মোবাইল ব্যবহারের প্রমাণ পায়।

জঙ্গিরা এই দুটি মোবাইল থেকে হলি আর্টিজানের ভেতর থেকে ১৪টি ছবি বাইরে পাঠায়। এছাড়া প্রটেক্টেডটেক্স নামে একটি অ্যাপসের মাধ্যমে ভেতরে থাকা জঙ্গিদের বাইরে থাকা নেতাদের সঙ্গে কথপোকথন হয়। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে আটটি বার্তা আদান-প্রদানের প্রমাণ পাওয়া গেলেও কেবল একটি বার্তা উদ্ধার করা গেছে। সেখানে পরস্পরকে ‘আঁখি’ বলে সম্বোধন করা হয়। একটি বার্তায় বলা হয় ‘বনানীর ওসি কিলড’। আবু তালহা নামে একজন ভেতরে থাকা জঙ্গিদের বলেন, ‘আঁখি, আপনারা কোনও পিকচার বা ভিডিও আপলোড করতে পারবেন নেটে? তারপর আমাদের লিংক দিলেই হবে।’

অপারেশন গাজওয়াত-২০১৬

হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার একটি নাম দিয়েছিল জঙ্গিরা। তা হলো ‘অপারেশন গাজওয়াত-২০১৬’। এই নাম দিয়েই প্রটেক্টেডটেক্সট-এ ইউজার আইডি খুলেছিল জঙ্গিরা। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, অপারেশন গাজওয়াত-২০১৬ এর হামলা দলের প্রধান বা কমান্ডার নির্বাচন করা হয় রোহান ইমতিয়াজকে। রোহানই হলি আর্টিজানে প্রবেশের পর সারারাত অপর চার হামলাকারীকে নির্দেশনা দেয়। এমনকি ভেতর থেকে বাইরে থাকা তামিম ও মারজানের সঙ্গে যোগাযোগও করে সে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, হলি আর্টিজান বেকারিতে যে হামলা হয়েছে, জঙ্গিবাদের ভাষায় এটাকে ‘ইঙ্গিমাসি’ হামলা বলে। এই হামলার একটি ধরন রয়েছে। বিশেষ করে একই ধরনের পোশাক পরিহিত অবস্থায় তারা হামলায় অংশ নেয়। টার্গেট ব্যক্তিদের হত্যার পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত একাধিক ব্যক্তিকে জিম্মি করে রাখে। যাতে বিষয়টি সারা দুনিয়াজুড়ে আলোচনা হয়। হলি আর্টিজানে হামলাতেও জঙ্গিরা একই ট্রেন্ড অনুসরণ করেছিল।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY