আরডিএ’র বনলতার মূল্যবান ৩১ প্লট হরিলুট

0
164

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: একেই বলে বানের পিঠা ভাগ করা। ভুক্তভোগীদের ভাষায়, মুল্যবান ৩১ প্লটের হরিলুট করলেন আরডিএর কর্মকর্তা কর্মচারিরা। অভিযোগ উঠেছে, প্লট বরাদ্দের গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে ৩১ টি মুল্যবান  প্লটের অধিকাংশই নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা কর্মচারিরা। কিছু প্লট নিয়ে আবার বাণিজ্য করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা।

রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন বনলতা বাণিজ্যিক এলাকা সম্প্রসারণ ও আবাসিক এলাকা উন্নয়ন প্রকল্পের  প্লট বরাদ্দে নজীরবিহীন অনিয়ম দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে বলেও ভুক্তভোগীদের অভিযোগে জানা গেছে।  এ নিয়ে প্লট বঞ্চিতসহ রাজশাহীর সচেতন মানুষের  মাঝে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ।

  • সংশ্লিষ্টদের অভিযোগে জানা গেছে, গত ২৪ এপ্রিল বনলতায় মোট ৩২ টি প্লটের বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বজলুর রহমান। প্লট বরাদ্দের নোটিশে বলা হয়েছিল যেসব শ্রেণী কোটা অপূর্ণ রয়েছে সেগুলির প্রাপ্যতা অনুযায়ী প্লট বরাদ্দ দেওয়া হবে। জানা যায় আবেদনের নির্ধারিত দিন গত  ২৫ মে ৩১ প্লটের বিপরীতে ১৫৪ টি আবেদন জমা পড়ে।

আবেদনকারীদের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারি ছাড়াও স্বায়ত্বশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কর্মচারি এবং সাংবাদিক বুদ্ধিজীবীরাও আবেদন করেন। তবে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মুখ চিনে চিনে আর প্রভাবশালীদের তবদিরে। লটারির কথা বলা হলেও কোনো লটারি হয়নি।

  • ভুক্তভোগীরা জানান, আবেদনপত্র জমার শেষদিনের গত ২৫ মে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এক নোটিশে বলা হয়েছিল ৩১ মে সকাল সাড়ে ৯টায় লটারি করা হবে এবং ওইসময় আবেদনকারীদের আরডিএ ভবনে উপস্থিত থাকতেও অনুরোধ করা হয়। একাধিক ভুক্তভোগী জানান, লটারির দিন তারিখ ও  সময় দেওয়া হলেও ওইদিন আরডিএ ভবনে কোনো লটারি অনুষ্ঠিত হয়নি। লটারি হবে জেনে যারা উপস্থিত হয়েছিলেন, আরডিএর এষ্টেট শাখা থেকে তাদের বলা হয় লটারি পরে করা হবে। এখন বরাদ্দ কমিটি বৈঠক করছেন।

অভিযোগে আরো জানা যায়, ৩১ মে দিনভর আরডিএর চেয়ারম্যান বজলুর রহমানের কক্ষে বসে কর্মকর্তা কর্মচারিরা প্লটগুলি নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগিতে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু প্লটের আয়তন কম হওয়ায় আরডিএর ছোট কর্মচারিরা ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠলে তাদের নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করেন এষ্টেট অফিসার বদরুজ্জামান।

  • আরডিএর ছোট কর্মচারিরা শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিশাল আয়তনের প্লট বরাদ্দ নেওয়ার প্রতিবাদও করেন।  শেষে ১ জুনও তারা প্লটগুলির মধ্যে কে কত কাঠা তরে নেবেন তা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। এদিকে অধিকাংশ প্লট নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি শেষে ২ জুন আরডিএর চেয়ারম্যান বজলুর রহমান রাজশাহী ত্যাগ করে ঢাকায় চলে যান।

প্লট বরাদ্দের তালিকা অনুযায়ী আরডিএর চেয়ারম্যান বজলুর রহমান নিজেই নিয়েছেন ৬ কাঠার একটি কর্ণার প্লট।  চেয়ারম্যানের প্লট নম্বর-১৮৯ (সি)।  প্লট বরাদ্দ কমিটির আহবায়ক ও আরডিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কমলা রঞ্জন দাস নিজেই নিয়েছেন ৫ কাঠার প্লট। তার প্লট নম্বর- ১১৭ (এ)। আরডিএর এষ্টেট অফিসার ও প্লট বরাদ্দ কমিটির সদস্য সচিব বদরুজ্জামান নিয়েছেন ৬ কাঠার প্লট। (প্লট নং- ১৮৯ (এ)। আরডিএর প্রকৌশল শাখার কর্মচারি শামসুন্নাহার নুন্নী নিয়েছেন সাড়ে ৩ কাঠার একটি প্লট। জানা গেছে শুধু নিজেরাই নয়- নিজেদের ড্রাইভার-পিয়নসহ অধীন কর্মচারিদেরও দিয়েছেন প্লটের ভাগ কর্মকর্তারা।

  • বরাদ্দ তালিকা সূত্রে জানা গেছে, আরডিএর প্রধান  নির্বাহী কর্মকর্তা কমলারঞ্জন দাসের গাড়ির ড্রাইভার শরিফুল ইসলাম পেয়েছেন পৌণে ২ কাঠার প্লট। চেয়ারম্যানের পিয়ন ইউনুস আলী পেয়েছেন পৌণে ২ কাঠার একটি প্লট। আরডিএর অথরাইজড অফিসার আবুল কালাম আজাদের পিয়ন রেজাউল করিম পেয়েছেন সাড়ে ৩ কাঠার একটি প্লট। সরকারি কর্মকর্তা শেখ মুজিবুর রহমান পেয়েছেন ৪ কাঠার প্লট।  এভাবে প্লট নিয়েছেন আরো কয়েকজন আরডিএর কর্মকর্তা কর্মচারি।  

এদিকে শুধু আরডিএর কর্মকর্তা কর্মচারিরাই শুধু নন- পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের বাবা শামসুদ্দিন পেয়েছেন ৬ কাঠার একটি বিশাল প্লট। এই শামসুদ্দিনের নিজস্ব বাড়ি রয়েছে রাজশাহী মহানগরীর বালিয়াপুকুর এলাকায়। এছাড়া আরডিএর বিভিন্ন আবাসিক প্রকল্পে ক্রয়সুত্রে একাধিক প্লটের মালিকও তিনি। শর্তানুযায়ী তিনি আবেদনই করতে পারেন না।  সাড়ে ৩ কাঠার একটি প্লট পেয়েছেন রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল আলম বেন্টু ।

  • আজিজুল আলমের বাড়ি ও জমি রয়েছে নগরীতে।  সাড়ে তিন কাঠার প্লট পেয়েছেন সাবেক মেয়র দুরুল হোদা। তারও বিশাল বাড়িসহ নগরীতে রয়েছে একাধিক জমি ও বাড়ি। আরডিএর  চেয়ারম্যান বজলুর রহমানের নিজের পাঁচতলা  বিশাল বাড়ি রয়েছে তালাইমারী এলাকায়। এষ্টেট অফিসার বদরুজ্জামানেরও বাড়ি রয়েছে নগরীতে। এক্ষেত্রে তারা প্লটের জন্য কীভাবে আবেদন করলেন তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন বঞ্চিত লোকজন।

অভিযোগে আরো জানা গেছে, বনলতা বাণিজ্যিক এলাকার আলোচিত ৩১টি প্লট শ্রেণী ও ক্যাটাগরিভিত্তিক বরাদ্দের কথা নোটিশে বলা হলেও  এক্ষেত্রে প্লট প্রাপ্ত আরডিএর শীর্ষ কর্মকর্তারা কোনো ক্যাটাগরিতে প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন তা নিয়েও বিস্তর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এক্ষেত্রে প্রসপেক্টাসে উল্লেখ করা ২ নং শর্তের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে জানা গেছে।

  • এদিকে ভুক্তভোগী লোকজন জানান, আরডিএর কর্মকর্তা কর্মচারিরা একাধারে আরডিএর আবাসিক এলাকা পদ্মা, চন্দ্রিমা, মহানন্দা ও এর আগে বনলতার ১৯০ প্লটে কোটার অতিরিক্ত বরাদ্দ নিয়েছেন। নিয়ম লঙ্ঘন করে আরডিএর কর্মকর্তা কর্মচারিরা নিয়েছেন একাধিক প্লট। এসব প্লট তাদের অনেকেই চড়া দামে বেচেও দিয়েছেন। এসব নিয়ে দুদকের তদন্ত চলমান রয়েছে।

অন্যদিকে বনলতার আবাসিক এলাকা উন্নয়ন প্রকল্পের প্লটের অধিকাংশই নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আরডিএর এষ্টেট অফিসার বদরুজ্জামান জানান, নীতিমালা অনুযায়ী তারা প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করেন- এই বিজ্ঞপ্তিটি কি শুধু আরডিএর কর্মকর্তা কর্মচারিদের প্লট দেওয়ার জন্যই দেওয়া হয়েছিল। এসময় এস্টেট অফিসার বলেন, আমি এসব নিয়ে আর কথা বলতে চাই না। পরে ফোন কেটে দেন তিনি।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY