যেমন ছিল তেমনই আছে প্রেসক্রিপশন!

0
206

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: চিকিৎসকদের লেখা প্রেসক্রিপশনে তেমন পরিবর্তন আসেনি। হাইকোর্টের বা বিএমডিসি’র নির্দেশনার তেমন কার্যকারিতাও দেখা যাচ্ছে না। ওষুধ বিক্রেতা এবং রোগীদের অভিমত, চিকিৎসকরা আগের মতো করেই প্রেসক্রিপশন লিখে যাচ্ছেন। কোনও কোনও চিকিৎসকও স্বীকার করছেন, অস্পষ্ট অক্ষরে প্রেসক্রিপশন লেখার অভ্যাস বদলাতে পারেননি তারা। প্রসঙ্গত, গত ৯ জানুয়ারি স্পষ্ট অক্ষরে এবং বড় বা ছাপার হরফে পড়ার উপযোগী করে চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন দেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সার্কুলার জারি করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার, বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্টদের চার সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএমডিসি (বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল) এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করে। কিন্তু এ সংক্রান্ত নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় সহ রমনা, শাহবাগে অবস্থিত বেশ কিছু ফার্মেসি ঘুরেও হাইকোর্টের নির্দেশনা, বিএমডিসি এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রজ্ঞাপন মেনে চলা কোনও প্রেসক্রিপশন চোখে পড়েনি এ প্রতিবেদকের। রাজধানীর রমনা এলাকায় অবস্থিত রমনা ফার্মেসির পরিচালক মো. গোলাম সারওয়ার ”মিরর বাংলা নিউজ”কে বলেন, সেই আগের মতো প্যাঁচানো হাতের লেখার প্রেসক্রিপশন নিয়ে আসছেন রোগীরা। চিকিৎসকরা হাইকোর্টের নির্দেশনা মেনে চললে রোগীদের পাশাপাশি আমরাও ভোগান্তির হাত থেকে বেঁচে যাই। এমনও হয়েছে, পরিচিত চিকিৎসকদের লেখা বুঝতে না পেরে তাদের ফোন দিয়ে নাম জেনে ওষুধ বিক্রি করেছি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছেলেকে নিয়ে আসা রাহেলা খাতুনের কাছে প্রেসক্রিপশনের ওষুধ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন লেখা তো আমরার লাইগ্যা না, বিটিরা (সেবিকা) খাওয়ায়ে দিয়ে যায়। এ সময় ওই বৃদ্ধার পাশেই থাকা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সুরাইয়া বলেন, প্রেসক্রিপশনের লেখা আমরাই বুঝতে পারি না, তো উনারা কিভাবে বুঝবেন। প্রেসক্রিপশন দেখে ওষুধ খেতে সমস্যা হয় বলে একটি কাগজে বড় বড় অক্ষরে ওষুধের নাম লিখে মায়ের খাটের সামনের ওয়্যারড্রোবে স্কচটেপ দিয়ে লাগিয়ে রেখেছি, মা সেটা দেখে ওষুধ খান। হাইকোর্টের নির্দেশনা নিয়ে ওয়াকিবহাল সুরাইয়া আরও বলেন, আদালতের নির্দেশনাটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনও তার কোনও বাস্তবায়ন দেখতে পাচ্ছি না। চিকিৎসকরা একটু মনোযোগী হলে মানুষের ভোগান্তি অনেক কমে যায়। তবে প্রেসক্রিপশন লেখার ধরন ধীরে ধীরে হলেও বদলাবে বলে তিনি আশাবাদী। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রেসক্রিপশনের লেখার কারণে ভুল ওষুধ সেবন করছেন দেশের অনেক মানুষ। ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ১ হাজার ১০২টি অভিযোগ জমা পড়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরে। যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট অব মেডিসিন (আইওএম) এর ২০০৬ সালের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রেসক্রিপশনে চিকিৎসকদের হাতের লেখা বুঝতে না পারার কারণে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৭ হাজার রোগীর মৃত্যু হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, চিকিৎসকরা সেলেক্সা (বিষণ্নতার ওষুধ) লিখলেও লেখা বুঝতে না পারার কারণে ফার্মেসিতে কর্মরতরা রোগীকে দিয়েছেন আর্থারাইটিসের ওষুধ সেলেব্রেক্সা! বাংলাদেশে এ ধরনের বিভ্রান্তি দূর করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ স্বাস্থ্য অধিদফতর। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ ”মিরর বাংলা নিউজ”কে বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী চিকিৎসকদের স্পষ্ট এবং বড় হরফে ব্যবস্থাপত্র লেখার জন্য নির্দেশ দিয়ে সার্কুলার জারি করেছি। তবে এ নিয়ে আরও নজরদারি দরকার। ভবিষ্যতে আমরা এ বিষয়ে আরও নজরদারি বাড়াবো। রোগীদের ভোগান্তি রোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা মানতে আমরা বাধ্য।’ প্রেসক্রিপশন লেখার ক্ষেত্রে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন অবশ্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে ইদানীং। নিজ কর্মক্ষেত্র মৌলভীবাজারে শতকরা ৩০ শতাংশ প্রেসক্রিপশন বড় হরফে পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন মৌলভীবাজার বিএমএ-র সভাপতি ডা. শাব্বির খান। তিনি ”মিরর বাংলা নিউজ”কে বলেন, ‘হাইকোর্টের নির্দেশনা ছাড়াও বিএমডিসি এবং অধিদফতরের নির্দেশ রয়েছে। আমরা সিনিয়ররা সবাইকে এ বিষয়ে মোটিভেট করার চেষ্টা করছি। আশা করছি, পরিবর্তন হবে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক এবিএম ফারুক ”মিরর বাংলা নিউজ”কে বলেন, এক ধরনের অসুখের জন্য বেরিয়াম সালফেট রোগীকে দেওয়া হয়। কিন্তু লেখার দুর্বোধ্যতার কারণে যদি বেরিয়াম সালফ্রাইট দেওয়া হয়, তাহলে সেই রোগী মারা পড়বে। তাই প্রেসক্রিপশনে ওষুধের নাম লিখতে হবে স্পষ্টভাবে এবং বড় হরফে। কারণ বাংলাদেশে অন্তত দেড়শ’ ওষুধের নামের মধ্যে মিল রয়েছে।

সূত্র: বাংলাট্রিবিউন

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY