‘জোহার খুনিদের চেলারাই রাবির চার শিক্ষককে হত্যা করেছে’

0
219

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: ১৯৬৯ সালে শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তৎকালীন প্রক্টর অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহা। পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এই মতাদর্শের খুনিরাই রাশজাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) চার শিক্ষককে হত্যা করেছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক সনৎকুমার সাহা। পাশাপাশি রাবির শিক্ষকরা আবারও ড. জোহার হত্যার এই দিনটিকে (১৮ ফেব্রুয়ারি) ‘জাতীয় শিক্ষক দিবস’ ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। শনিবার ড. জোার ৪৮ তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয় রাবিতে। সূর্যদয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন ভবন, আবাসিক হল ও অন্যান্য ভবনে কালো পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের কর্মসূচি। পরে ৭টায় ড. জোহার মাজার ও স্মৃতিফলকে ফুল দিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। সকাল ১০টায় সিনেট ভবনে রসায়ন বিভাগের আয়োজনে জোহা স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠিত হয়। স্মারক বক্তৃতায় রসায়ন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে স্মারক বক্তা ছিলেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক সনৎকুমার সাহা ও পৃষ্টপোষক ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সায়েন উদ্দিন আহমেদ। বক্তৃতাকালে অধ্যাপক সনৎকুমার সাহা বলেন, ‘ড. জোহার তার মৃত্যুতে গোটা বিশ্বে যে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, তা প্রমাণ করে- ড. জোহার জীবন বৃথা যায়নি। ড. জোহা হত্যার পর এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও চারজন শিক্ষক খুন হয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে একটা যোগ আছে। যারা জোহাকে হত্যা করেছিল তাদের অনুসারী চেলারাই পরবর্তীতে এই চার শিক্ষককে হত্যা করেছে।’ অনুষ্ঠানে উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, ‘ড. জোহা তাঁর জীবন উৎসর্গের মাধ্যমে শিক্ষক ও ছাত্রের মধ্যে একটি ঐক্যের বন্ধন রচনা করে গেছেন। আমরা দীর্ঘকাল ধরে তাঁকে স্মরণ করে আসছি। তবে দুঃখ করে বলতে হয়, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে আর কোথাও তাঁকে স্মরণ করা হয় না। তিনি যে শুধু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য লড়েছেন তা নয়। তাঁর এই ত্যাগের দৃষ্টান্ত সারা বাংলাদেশের মানুষের জন্য।’ তিনি ১৮ ফেব্রুয়ারিকে শিক্ষক দিবস ঘোষণার দাবি জানান। এছাড়া দিবসটি উপলক্ষে বিকেল ৪টায় শহীদ শামসুজ্জোহা হলে আলোচনা সভা ও সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্বালনের আয়োজন করা হয়েছে। এদিন শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। যা ঘটেছিল ওইদিন– আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবি এবং সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যার প্রতিবাদে ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে পাকিস্তানি সেনারা মিছিলে গুলি করতে উদ্যত হয়।  খবর পেয়ে তৎকালীন প্রক্টর শামসুজ্জোহা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ছাত্রদের সামনে দাঁড়ান। এ সময় তিনি পাকিস্তানি সেনাদের গুলি করতে নিষেধ করে বলেন, ‘কোনও ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে তা আমার গায়ে লাগবে।’ এক পর্যায়ে তিনি ছাত্রদের ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু তোয়াক্কা না করে বেলা ১১টার দিকে ক্যাপ্টন হাদী পিস্তল বের করে ড. জোহাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। গুলিবিদ্ধ ড. জোহাকে পরে রাজশাহী মিউনিসিপল অফিসে নিয়ে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ড. জোহার মৃত্যুতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে। পতন ঘটে সামারিকশাসক আইয়ুব খানের। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিতও রচিত হয়েছিল ড. জোহার আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে। ড. জোহা ১৯৩৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের বাকুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালে বাকুড়া জিলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পাস করেন। পরে ক্রিশ্চিয়ান কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৫৩ সালে স্নাতক ও ১৯৫৪ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরে অর্ডিন্যান্স কারখানায় শিক্ষানবিশ সহকারী কারখানা পরিচালক হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন। এর পর লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজ ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশেষ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে যোগ দেন। শহীদ হওয়ার সময় তিনি স্ত্রী নিলুফা জোহা ও এক মেয়ে রেখে যান।

সূত্র: বাংলাট্রিবিউন

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY