কেন নবজাতক চুরি করলেন শুভ্রা?

0
157

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: শুক্রবার রাজশাহীর একটি বেসরকারি ক্লিনিক থেকে নবজাতক চুরির দায়ে গ্রেফতার করা হয় শাহিন আক্তার শুভ্রা নামের এক নারীকে। চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে জানিয়েছেন, যে শিশুটি তার কাছে পাওয়া গেছে তা তার শুভ্রার গর্ভের নয়। পরিবারের দাবি, মাত্র দুই মাস আগেই তিনি গর্ভপাত করিয়েছেন। তবে যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শুভ্রা কাজ করতেন, সেখান থেকে মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়েছিলেন তিনি। শুভ্রার ছয় বছরের একটি মেয়েও আছে। কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার কারণে পারিবারিক নিপীড়নের স্বীকার হয়ে এবং আবারও যাতে মেয়ে জন্ম দিতে না হয় সেই ‘আতঙ্কে’ শুভ্রা এতকিছু করেছেন কিনা সে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজশাহীর শাহমখদুম থানার পোস্টাল একাডেমির সামনে নওদাপাড়ার নগর মাতৃসদন আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার থেকে শুক্রবার (২৭ জানুয়ারি) নবজাতক চুরির দায়ে গ্রেফতার হন শাহিন আক্তার শুভ্রা। তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। তিনি নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। শুভ্রার স্বামী রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের চিকিৎসক আক্তারুজ্জামান। স্বামীর দাবি, পারিবারিক কলহের জেরে তার সঙ্গে থাকতেন না শুভ্রা। গ্রেফতারের পর শুভ্রাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) নিয়ে গর্ভধারণের পরীক্ষা করা হয়। এই তথ্য জানিয়ে রাজশাহী মহানগরীর শাহমখদুম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিল্লুর রহমান ”মিরর বাংলা নিউজ”কে বলেন, ‘শনিবার সকালে রামেক হাসপাতালের ওসিসির ইনচার্জ ডা. আনোয়ারা বেগম এ পরীক্ষা করেন। ওই নারীর গর্ভে এ সন্তান জন্ম নেয়নি বলে পরে চিকিৎসক প্রতিবেদন দেন।’ শুভ্রাই ওই নবজাতককে চুরি করেছে বলে পুলিশ প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে জানিয়ে রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও সিনিয়র সহকারী কমিশনার (সদর) ইফতেখায়ের আলম ”মিরর বাংলা নিউজ”কে বলেন, ‘কেন তিনি বাচ্চাটি চুরি করলেন তা নিয়ে তদন্ত করছি। তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। তার স্বামীও একজন চিকিৎসক। তারা দু’জনই উচ্চশিক্ষিত। তবে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। তাদের একটি মেয়ে সন্তান রয়েছে। সবার মতো আমাদেরও প্রশ্ন, তাহলে কি ছেলে সন্তানের জন্য তাদের দু’জনের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল?’ ইফতেখায়ের আলম আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে খবর আছে, তিনি এই বাচ্চা চুরির পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরে করেছেন। তিনি ইউনিভার্সিটি থেকে মাতৃত্বকালীন ছুটিও নিয়েছিলেন।’ এদিকে, শুভ্রার স্বামী রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের চিকিৎসক আক্তারুজ্জামান ”মিরর বাংলা নিউজ”কে বলেন, ‘১৯ জানুয়ারি রাতে শুভ্রা আমাকে ফোন করে জানায় যে ছেলে সন্তান হয়েছে। তবে ঢাকায় প্রশিক্ষণে থাকার কারণে রাজশাহী যেতে পারিনি। শুক্রবার জানতে পারি, নবজাতকসহ শুভ্রাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গত আট মাস ধরে পারিবারিক কলহের কারণে শুভ্রার সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই।’ পারিবারিক কলহের জের ধরে স্ত্রীর সঙ্গে গত আট মাস ধরে যোগাযোগ না থাকায় শুভ্রা সন্তান সম্ভবা ছিলেন না বলেও মনে করেন তিনি। শুভ্রার পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দুই মাস আগে তিনি গর্ভপাত ঘটান। শুভ্রার ছোট বোন সুরভি বলেন, ‘আপার (শুভ্রা) একটি ছয় বছর বয়সের মেয়ে রয়েছে। অন্তঃসত্তা হওয়ার পর সে জানতে পরে দ্বিতীয় সন্তানও মেয়ে। এরপর সে গর্ভপাত ঘটায়। তবে গর্ভপাত ঘটানোর পর থেকে সে সন্তানের জন্য উদ্বিগ্ন ছিল।’ তবে শুভ্রা যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন সেই বাড়ির মালিক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘শুভ্রা প্রায় দেড় বছর ধরে আমার বাসায় ভাড়া থাকেন। তিনি গর্ভবতী ছিলেন বলে জানিয়েছিলেন। গত ১৯ বা ২০ জানুয়ারি রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে তার একটি ছেলে সন্তান হয় বলেও আমাদের জানান। নবজাতকের জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন হয়, তার সবই তিনি করেছিলেন। নবজাতকের জন্য কাঁথা, জামা-কাপড়ও তৈরি করেছিলেন বলে আমার স্ত্রী আমাকে জানিয়েছিলেন।’ রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) উপ কমিশনার (পূর্ব) আমির জাফর সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, নবজাতক চুরির ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজে তারা যে নারীকে দেখেছিলেন তিনি শুভ্রা বলেই নিশ্চিত হওয়া গেছে। নবজাতক চুরির এ মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা রাজশাহী মহানগরীর শাহমখদুম থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মতিয়ার রহমান ”মিরর বাংলা নিউজ”কে বলেন, ‘শুভ্রার পাঁচ-ছয় বছর বয়সের একটি মেয়ে আছে। তার নাম অহনা। তবে ছেলে সন্তান না থাকায় তিনি ছয় মাস আগে থেকেই বাচ্চা চুরির পরিকল্পনা করেছিলেন বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। নবজাতকের খোঁজে বিভিন্ন সময়ে ক্লিনিকে যেতেন তিনি।’ এ ঘটনায় এর আগে আটক তোহুরা খাতুনের কোনও সংশ্লিষ্টতা না পাওয়া গেছে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
শনিবার (২৮ জানুয়ারি) ওই নবজাতককে তার মায়ের জিম্মায় পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে শুভ্রাকেও জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। ইফতেখায়ের আলম জানান, শুভ্রার পাঁচ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। আজ রবিবার (২৯ জানুয়ারি) এই রিমান্ড শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে, শুভ্রার কর্মস্থল নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জনসংযোগ দফতর পরিচালক এম এ কাইউম এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, হাসপাতাল থেকে নবজাতক চুরির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শুভ্রাকে সাময়িকভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, গত ১৯ জানুয়ারি বিকেল তিনটার দিকে নগরীর নওদাপাড়া এলাকায় অবস্থিত নগর মাতৃ সদন আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সেন্টারে একটি ছেলে সন্তান জন্ম দেন মতিহার থানার চরশ্যামপুর এলাকার দিনমজুর নাসির উদ্দিনের স্ত্রী মুক্তি খাতুন। ওইদিন রাত সাড়ে নয়টার দিকে এক নারী খালা পরিচয়ে মুক্তির নবজাতকটিকে কৌশলে চুরি করে নিয়ে যান। পুলিশ এ ঘটনায় এর আগে তোহুরা খাতুন নামের এক নারীকে গ্রেফতার করে।

সূত্র: বাংলাট্রিবিউন

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY