বিজ্ঞাপন এবং নারী

0
187

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: একটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা প্লাস্টিক পণ্যের বিজ্ঞাপন ছিল। নির্মাতা যে তুখোড় সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে। সমাজ মেয়েদেরকে ‘প্লাস্টিক’ হিসেবে দেখায়, তিনি তার তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। মেয়েরা প্লাস্টিক নয়, প্লাস্টিকের চেয়ে বেশি কিছু। ‘আই এম নট জাস্ট প্লাস্টিক। আই এম মোর…’ এই ছিল বিজ্ঞাপনটির বক্তব্য। এরপর কিছুদিন আমার নিউজফিড এই টিভিসির শেয়ার আর অতি আবেগীয় স্ট্যাটাসের বন্যায় ভেসে যায়। ‘মেয়েরা শুধুমাত্র প্লাস্টিক নয়, প্লাস্টিকের চেয়ে বেশি কিছু’- এই কথায় মেয়েরা পটে গেছে। মাথামোটা মেয়েদের এর চেয়ে বেশি কিছু এখান থেকে বোঝানোর চিন্তাও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের ছিল না। তারা যা বোঝাতে চেয়েছে, তাদের জায়গা থেকে সেটা বোঝাতে তারা সফল। একবারও মেয়েদের মাথায় আসলো না, তারা আর যাই হোক- প্লাস্টিক না হয়ে প্লাস্টিকের চেয়ে বেশি কিছু হওয়ার মধ্যে সার্থকতা কতটুকু? নির্মাতা তো ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে প্লাস্টিকই বানালো শেষ পর্যন্ত, নাকি? এই মুহূর্তে আরেকটা বিজ্ঞাপনের কথা মনে পড়ছে। বিজ্ঞাপনটির শুরুতে খুব আহ্লাদি কণ্ঠে মেয়েটি জানায় ‘১১ দিন ১৩ ঘণ্টা ১৭ মিনিট’ তার পুরুষ সঙ্গীর সঙ্গে তার দেখা হয় না। তাতে কী! সে নেই কিন্তু খাবার রেডি আছে। পুরুষ সঙ্গী এবার আরও খানিকটা আবেগ মাখিয়ে বলে, ‘কী দরকার ছিল ডাক্তারি পড়ার?’ অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি এই টিভিসি রিলিজ হওয়ার পরে আমার বন্ধু তালিকার বেশিরভাগ বন্ধুই তাদের সঙ্গীর ওয়ালে এটি শেয়ার করেছেন। এমন প্রেম-প্রেম সম্পর্ক তারাও চান, সেটিই ছিল শেয়ারের ক্যাপশনে। একটা বিকট এবং অদ্ভুত সমাজ ব্যবস্থাকে মানুষ এত প্রশ্রয় দিতে পারে চিন্তা করলেও অবাক হতে হয়। তার চেয়েও বেশি অবাক হতে হয় এ ধরনের বার্তা মেয়েদের মাথায় কেন জানি ঠিকঠাক ধাক্কা দিতে পারে না। যেখানে হাজার হাজার বিজ্ঞাপন একটা প্রতিষ্ঠিত বিশেষ তন্ত্রকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে সেখানে এমন এক/দুইটা কাজ নিয়ে কথা বলার কোনও মানেই হয় না। কারণ, এ দেশে কাপড় কাচে মেয়েরাই। এ দেশে রান্না করে মেয়েরাই। এ দেশে বাচ্চা লালন-পালন করে মেয়েরাই, থালা-বাসন পরিষ্কার করে মেয়েরাই। তাই নারীদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে নারীদের আবেগকে ভর্তা বানিয়ে অন্য নারীদের দেখানোর বিকল্প নেই। ডিশ ওয়াশের বিজ্ঞাপনে সবসময় নারীরাই থালা-বাসন পরিষ্কার করে পণ্যের গুণাগুণ সম্পর্কে বর্ণনা করেন কেন? কেন ছেলেরা এই পণ্যের মডেল হতে পারেন না? কেন ডিটারজেন্টের বিজ্ঞাপনে অফিসগামী নারীসঙ্গীর কাপড় পুরুষকে কাচতে দেখা যায় না? শুনতে খারাপ লাগছে নিশ্চয়ই? কিন্তু বিজ্ঞাপনে ফেনাভর্তি বালতিতে নারীকে তার পুরুষ-সঙ্গীর শার্টের কলার ঘষেঘষে ময়লা তুলতে দেখাটা আমাদের চোখ সওয়া। তাই নারীকে এসব কাজ করতে দেখলে কারও গায়ে লাগে না, পক্ষান্তরে পুরুষকে নারীর জামার হাতা ঘষেঘষে পরিষ্কার করতে দেখার চিন্তাই করতে পারে না কেউ। এমনকি বাচ্চার ডায়াপারের বিজ্ঞাপনেও একই অবস্থা! রাতের বেলা ঘুমঘুম-চোখ মায়ের ঝক্কি কমানোর জন্য ডায়াপার কোম্পানিগুলো উঠেপড়ে লেগেছে, যেন বাচ্চার জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি এড়াতে মায়ের কোনও বিকল্প নেই আর বাবাদের প্রয়োজন নেই। বাবাদের কাজই নিশ্চিন্তে থাকা। যত ঝক্কি সব মায়েদেরই নিতে হবে। বাচ্চাকে সুন্দর ঘুম উপহার দেওয়ার সকল চিন্তা তাই মায়ের মাথায়ই থাকতে হবে। এই গেলো নারী নিয়ে ডায়াপার ব্যবসা! এখন কিছুকিছু বিজ্ঞাপন, কিছু কিছু না বলে হাতে গোনা কয়েকটা রান্নার মসলার বিজ্ঞাপনে পুরুষদের দেখা যায় বললেই ভালো হবে। তবে সেটাও সাহায্যকারী হিসেবেই। মূলত পরিবারের সবাই টেবিলে বসে, রান্নাঘর থেকে তরকারির বাটি হাতে বৌমাকে আর বৌমার রান্নার গন্ধে সবার তৃপ্ত চেহারা ছাড়া যেন তেল-মসলার বিজ্ঞাপন জমেই না। কখনও দেখলাম না বেচারা বৌ, শ্বশুর-বাড়ির সবার সঙ্গে টেবিলে বসে আছে আর বর রান্না করে এনে টেবিলে রেখে সবাইকে পরিবেশন করালো। কেন দেখি না? দেখি না কারণ ধোলাইকৃত মগজের সাধ্য নেই মেরুদণ্ডের হাড় সোজা করে দাঁড়ানোর, এই বিশ্বাস সমাজ অর্জন করেছে, অন্যকেও বিশ্বাস করাতে পেরেছে। অথচ এসব বিজ্ঞাপন চাইলেই পুরুষতন্ত্রের কোমরের হাড় ভেঙে একটা বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। আহ্লাদি কণ্ঠে, ‘কী দরকার ছিল ডাক্তারি পড়ার’ চেয়ে বলতেই পারত, ‘এত কাজ করার পরেও রান্নাটা তোমারই করতে হবে কেন প্রতিদিন? আমিও বরং কয়েকদিন করি ভাগাভাগি করে! কয়েকদিন না হয় বাইরেও খেলাম!’ বোধহয় তাতে করে পণ্যের বিক্রি বাড়ত না, রোমান্টিক প্রেমের ‘লুতুপুতু’ ভাবটা ঠিকঠাক আনা যেত না হয়ত। কিংবা বিজ্ঞাপনে নারীকে স্যাক্রিফাইস করতে না দেখলে ক্রেতা-সাধারণকে সে পণ্য আকৃষ্ট করতে পারে না। কিন্তু গাড়ির বিজ্ঞাপনে আবার নারীদের ব্যবহার করলে চলে না। তারা গাড়ি চালাতেই পারে না, গাড়ি চালানো বোধ হয় নারীদের কর্ম নয় (কিছু কিছু ব্যতিক্রমী বিজ্ঞাপন ছাড়া)। এমনই উড়ে আসা, অ্যাডভেঞ্চারাস, চ্যালেঞ্জিং কাজগুলোয় নারীদের ভাত নেই। তাদের দিয়ে করাতে হবে হালকা হালকা কাজ, বলাতে হবে নরম নরম কথা; তাহলেই বিজ্ঞাপন সার্থক। নারী-পুরুষ সমান অধিকারের প্রসঙ্গ আসলে তাই সকল পর্যায়ের কাজকেই শুধুমাত্র মানুষবান্ধব বানাতে হবে। এখানে বিজ্ঞাপন এবং বিজ্ঞাপনের নির্মাতাদেরও একটা বিশাল ভূমিকা রয়েছে, চাইলেই তারা সেটা এড়িয়ে যেতে পারেন না। কাজকে কাজ হিসেবে দেখান, কোন কাজ নারীর জন্য আর কোন কাজ পুরুষের জন্য এই ভাগাভাগির মধ্যে নির্মাতাদের নাক না গলালেও চলবে তো। বিজ্ঞাপনের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য লৈঙ্গিক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে বিভেদ সৃষ্টি করাটা অন্তত তাদের কাজ না হোক। আর তাদের এখান থেকে বের করতে হলে মাথার অকেজো মগজটুকুকেও ব্যবহার করতে হবে নারীদের, ছুঁড়ে ফেলতে হবে এসব বিজ্ঞাপনকে। তাহলেও যদি কিছুটা পরিবর্তন আসে! কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে কোনও আন্দোলনই আর আন্দোলন থাকবে না, ছেলে ভোলানো মামুলি বিষয় হয়ে দাঁড়াবে সবটাই।

সূত্র: বাংলাট্রিবিউন

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY