রিচার্ড ইটনের পদ্মা নদী : বড় তত্ত্বের ছোট খুঁত

0
188

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: বাংলায় মুসলমানদের বিস্তার কিভাবে ঘটলো, সে বিষয়ে বিশ্বখ্যাত বিশেষজ্ঞ রিচার্ড এম ইটনের তত্ত্বে পদ্মা নদীর একটি বিশেষ গুরুত্ব আছে। ইটন বিশেষ আগ্রহ নিয়ে আলোচনা করেছেন ‘ষোড়শ শতকে পদ্মা নদীর জন্ম’ নেয়ার প্রভাব। এটা বাংলার ভূ-মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বদল ঘটায়। বাংলার হৎপিণ্ড পর্যন্ত পৌঁছে যাবার মতো নাব্য জলস্রোত পাওয়ার ফলে পশ্চিম বাংলার সাথে এবং উত্তর ভারতের সাথেও পূর্ববাঙলা এই প্রথম যুক্ত হয়ে পড়ে। এরই ফল হলো অভিবাসী আবাদ-পত্তনকারীদের এখানে আগমন সহজ হওয়া। এর আগে অল্প কিছু নগর ও কৃষি জনগোষ্ঠীর অধিকারী পূর্ব-বাঙলার প্রায় সম্পূর্ণাংশ আদিবাসী জনগোষ্ঠীও এবার কৃষি সংস্কৃতির আওতায় এলো। শিকার, মাছ ধরা, ফলমূল সংগ্রহ করা এবং জুম চাষ করা এই সব প্রাক-কৃষি জনগোষ্ঠী এবার সুসংগঠিত কৃষি কাজের সাথে যুক্ত হলো, মসজিদ আর মন্দিরের মাধ্যমে যুক্ত হলো মোঘল সাম্রাজ্যেরও সাথে। এই কারণেই বাংলা এলাকায় জমি বন্দোবস্তের মোঘল দলিলগুলোতে উপাসনাস্থল বানাবার শর্ত যুক্ত থাকতো, জানিয়েছেন ইটন। এই মসজিদ আর মন্দিরগুলোই বাংলা এলাকায় আদিবাসী, কর-আনুগত্য-রাষ্ট্রের সাথে ইতিপূর্বে বিযুক্ত জনগোষ্ঠীকে ইসলাম ও হিন্দু ধর্মের মাঝে নিয়ে এলো, নিয়ে এলো রাষ্ট্র নামক কাঠামোর মাঝে। পত্তনকারীদের ধর্মীয় পরিচয় অনুযায়ী ধর্মীয় পরিচয়প্রাপ্ত হবার ফলে ১৯৪৭ পর্যন্ত পূর্ব বাংলায় হিন্দু ও মুসলমান জনগোষ্ঠীর এই বণ্টন মোটামুটি অক্ষুণ্ন ছিল, এটাও ইটনের একটি পর্যবেক্ষণ। এই প্রক্রিয়ায় মুসলমানদের সংখ্যা বেশি হবার কারণ প্রধানত মধ্য এশীয়াতে মোঙ্গলদের উৎপাত পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে কৃষি ও নগর সভ্যতার ব্যপক অবক্ষয় এবং বিপুল সংখ্যক তুর্কী-ইরানি-পাঠান জনগোষ্ঠীর মানুষের অভিবাসী হিসেবে ভারতে আগমন। ফলে অরণ্যে কৃষিপত্তনের কাজে তাদেরই অধিক সংখ্যায় পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু পদ্মা নদীর জন্ম সম্পর্কে ইটনের ধারণাতে খুব সম্ভবত একটা গুরুতর গলদ আছে। সেই গলদটাও আবার এমনই, যা ইটনের বাকি আর সব প্রস্তাবনা আর অনুমানকেই আরও দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। কিভাবে, সেটাই আমরা দেখার চেষ্টা করতে পারি। দুই. পদ্মা-ভাগিরথীর প্রাচীনত্বের বিতর্ক          গঙ্গার মাহাত্ম্যের তুলনীয় আর কিছুই নয়। শরশয্যায় পিতৃব্য ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বলছেন, “সেই দেশ জনপদ ও আশ্রমই শ্রেষ্ঠ যার মধ্য দিয়ে সরিদ্বরা গঙ্গা প্রবাহিত হন। তপস্যা, ব্রহ্মচর্য ও দানের যে ফল, গঙ্গার আরাধনাতেও সেই ফল। যারা প্রথম বয়েসে পাপকর্ম করে পরে গঙ্গার সেবার করে, তারাও উত্তম গতি পায়। হংসাদি বহুবিধ বিহঙ্গে সমাকীর্ণ গোষ্ঠ সমাকীর্ণ গঙ্গাকে দেখলে লোকে স্বর্গ বিস্মৃত হয়। গঙ্গাদর্শন গঙ্গাজলস্পর্শ ও গঙ্গা অবগাহন করলে উর্ধ্বতন ও অধস্তন সাত পুরুষের সদগতি হয়” (বঙ্গানুবাদ রাজশেখর বসু)।  এহেন গঙ্গা মাহাত্ম্যের উত্তরাধিকার কে হবে, তা নিয়ে দুই শরিকের বিবাদের বহু দৃশ্য বাংলা সাহিত্যে আঁকা হয়েছে। পদ্মা আর ভাগিরথী, কোনটি গঙ্গার আদি শাখা, সে বিষয়ে একটা বিতর্ক চালু আছে বহুকাল যাবত। পণ্ডিতদের বৃহদাংশ মনে করেন, ভাগিরথীই গঙ্গার প্রধান প্রবাহপথ। ইতিহাসবিদদের বড় অংশ তো বটেই, নদী বিশেষজ্ঞদের বড় অংশও এটাই মনে করেন। বিশেষজ্ঞদের মাঝে অল্প কজন মাত্র মনে করেন, পদ্মাই গঙ্গার আদি শাখা। ইটনও প্রথম দলেই। তিনি মনে করেন, ভাগিরথীই গঙ্গার আদি শাখা। তার মতানুযায়ী এই আদিত্বের কারণেই ভাগিরথীরই আরেক নাম আদি-গঙ্গা। কিন্তু এই ধরনের সাহিত্যিক সূত্র ধরে নদীর আদিত্ব নির্ধারণ একটা কারণে বিপদজনক। কেননা, এই সাহিত্যসূত্রটি কোনো একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর বা সভ্যতার সাথে নদীটির পরিচয়ের স্মারক হতে পারে বটে, কিন্তু সেটা এর আগে অস্তিত্বশীল ছিল  কি না, তার নির্ধারক হতে পারে না। বৈদিক বা ব্রাহ্মণ্য যে সভ্যতার সূত্রে জনপ্রিয় সাহিত্য ও ইতিহাস রচিত হয়েছে, সেই সভ্যতার সাথে গঙ্গার পরিচয়ের আগেই পদ্মা ও ভাগিরথী এই দুটি নদীরই জন্ম হয়ে থাকতে পারে। অর্থাৎ, সাহিত্যিক সূত্র ভৌগোলিক সূত্রের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। গঙ্গা-ভাগিরথী-পদ্মা বিষয়ে ইটনের আলোচনাকে কিছুটা সংক্ষিপ্তভাবে পাঠ করা যাক শুরুতেই তার রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড দি বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ারে তিনি যেমন বলেছেন যে,  প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে বদ্বীপে ব্রাহ্মণ বসতির প্রধান পর্বটার সময়েও গঙ্গা নিন্মমুখে প্রবাহিত হতো পশ্চিমতম অংশের প্রবাহপথ দিয়ে, যেটা বর্তমানে ভাগিরথী-হুগলি ধারা। এটা ষোড়শ শতকের আগে সরে পূর্ব দিকে পদ্মায় প্রবাহিত হয়নি, তুর্কী বিজয়ের বহু পরের ঘটনা এটা। এর ফল হলো নদীটির পবিত্রতা পশ্চিমবঙ্গেই প্রলম্বিত হতে থাকল- এখনো ভাগিরথী-হুগলি নদীই কখনো কখনো আদি-গঙ্গা হিসেবে অভিহিত হয়- একই সময়ে বদ্বীপের পূর্ব দিকের দুই তৃতীয়াংশ, যেটা ইন্দো-আর্য সভ্যতার সাথে বাংলার মুখোমুখি হবার গঠনকালীন সময়টাতেই গঙ্গা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল বলে প্রতীকিভাবেও উচ্চভারতের সাথে বিচ্ছিন্ন ছিল, যেটা ছিল ইন্দো-আর্য সভ্যতা আর পৌরাণিক গাথার প্রাণকেন্দ্র। (পৃষ্ঠা ২০, অক্সফোর্ড  সংস্করণ ২০০৬)
সাদৃশ্যপূর্ণ আলোচনা পাওয়া যাবে তার ‘হু আর বেঙ্গল মুসলিমস’ নামের প্রবন্ধে। এখানে তিনি বলেন যে, পূবে অর্থনৈতিক বিকাশের অন্য প্রতিবন্ধক ছিল গঙ্গার বিশাল  প্রবাহ থেকে তার বিচ্ছিন্নতা।  প্রাচীন আমলে, গঙ্গা বদ্বীপের পশ্চিম অংশ দিয়ে প্রবাহিত হতো বর্তমানের হুগলি- ভাগিরথী পথে, কলকাতার কাছেই সমুদ্রে পতিত হতো যেখানে নদীটি এখনো আদি-গঙ্গা নামে পরিচিত। এর ফলে পূববাংলা গঙ্গার সংযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। ক্রমাগত পলি সঞ্চয়ের ফলে খুব পুরনো সময়ে গঙ্গা এর পুরনো নদীগর্ভ থেকে সড়তে শুরু করে এবং পূব দিকে নতুন নতুন প্রবাহ পথ বের করে নেয়- ভৈরব, মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, আড়িয়াল খাঁ- যতক্ষণ না শেষ পর্যন্ত ষোড়শ শতকের শেষে এটা পদ্মার সাথে যুক্ত হয়, যা এর প্রধান ধারাকে পূর্ববাংলার প্রাণকেন্দ্রের মধ্য দিয়ে সরাসরি প্রবাহিত হতে সক্ষম করে তোলে। (পৃষ্ঠা ২৫৯ অক্সফোর্ড সংস্করণ, ২০০০ সাল) ভাগিরথী ও পদ্মা বিষয়ে ইটনের এই সিদ্ধান্তগুলোর মাঝে অভিনবত্ব তেমন কিছু নেই। ভারতীয় ও বাংলাদেশের অধিকাংশ পুরনো ইতিহাস গ্রন্থেও প্রায় একই কথাই বারবার বলা হয়েছে। ইটন যেমন বেশ খানিকটা নির্ভর করেছেন ইউরোপীয় মানচিত্র ও আইন-ই-আকবরীর সাক্ষ্যের ওপর। পুরনো ইতিহাসবিদরাও সিদ্ধান্ত দিয়েছেন পর্যটকদের স্মৃতিকথা, সাহিত্যগ্রন্থ ও শিলালিপির ভিত্তিতে। কিন্তু ষোড়শ শতকের আগে পদ্মার সাথে গঙ্গার সম্পর্কহীনতা বিষয়ক পুরনো অধিকাংশ ইতিহাসবিদ সমেত ইটন প্রভৃতির ধারণা প্রশ্নের মুখে পড়ে একটি গূরুত্বপূর্ণ প্রামাণিক দলিলের কল্যাণে। পঞ্চদশ শতকের কবি কৃত্তিবাস ওঝা, নদীয়ার বাসিন্দা ছিলেন তিনি, জন্মতারিখ নিয়ে বিবাদ আছে, বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী তার জীবনকাল ১৩৮১-১৪৬১। পঞ্চদশ শতকের প্রথম ভাগে গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ (রাজত্বকাল ১৩৯০-১৪১১) রাজা গণেশ (রাজত্ব ১৪১৫-১৮) অথবা জালালুদ্দীন মাহমুদ শাহ (রাজত্ব ১৪১৮-১৪৩১) কিংবা রুকনুদ্দীন বরবক শাহ (রাজত্ব ১৪৫৯-১৪৭৪) কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে বাংলায় রামায়ণ রচনা করেন। এই রামায়নের কৃত্তিবাস ওঝাকৃত বাংলা অনুবাদেই, ঊনিশ শতকেও যে গ্রন্থটি কৃত্তিবাসী রামায়ণ হিসেবে বিপুল জনপ্রিয় ছিল, সেখানে পদ্মার একটা জন্মকাহিনী আমরা পাই। এই উল্লেখটি ষোড়শ শতকের আগেই পদ্মা বিপুল আকৃতি নিয়েই অস্তিত্বশীল ছিল, তা প্রমাণ করে। কিন্তু মূল রামায়নে কি পদ্মার উল্লেখ আছে? রামায়ণের অন্তর্জালে প্রাপ্ত দুটো ইংরেজি অনুবাদে পদ্মার উল্লেখ পাইনি, রাজশেখর বসুর ‘বাল্মিকী রামায়ন’র অনুবাদেও তা নেই। তাহলে কিভাবে তা এলো  ‘কৃত্তিবাসী রামায়ণ’-এ স্বর্গ থেকে গঙ্গার অবতরণ এবং ভগীরথ তাকে পথ দেখিয়ে পূর্বপুরুষের ভস্মের দিকে চালিত করার কিংবদন্তীতে তিনি সম্ভবত আর একটি কাহিনী প্রবিষ্ট করিয়ে দিয়েছেন- হতে পারে তা তার সময়ের জনপ্রিয় কাহিনী, অথবা হতে পারে তা তার নিজের উদ্ভাবন। কিন্তু আমরা আমাদের জানা নথিগুলোর মাঝে এখানেই পদ্মা যে মা গঙ্গার সাথে সম্পর্কিত, সেটা প্রথমবারের মতো পাই। কিন্তু সেই জন্ম কাহিনী সুখকর না, নিন্দায় ভরপুর। শুনুন তবে-

“আগে যায় ভগীরথ শঙ্খ বাজাইয়া

কাণ্ডারের প্রতি গঙ্গা মুক্তিপদ দিয়া।

গৌড়ের নিকটে মিলিল আসিয়া।।

পদ্মা নামে এক মুনি পূর্ব্বমুখে যায়।

ভগীরথ বলি গঙ্গা পশ্চাতে গোড়ায়।।

যোড়হাত করিয়া বলিলেন ভগীরথ-

পূর্ব্বদিকে যাইতে আমার নাহি পথ।।

পদ্মমুনি লয়ে গেল নাম পদ্মাবতী।

ভগীরথ সঙ্গেতে চলিল ভাগীরথী।।

শাপবাণী সুরধুনী দিলেন পদ্মারে।

মুক্তিপদ যেন নাহি হয় তব নীরে।।”

ইতিহাসবিদরা পদ্মার এই জন্মকাহিনীকে কেনো পদ্মা-ভাগিরথীর আলোচনায় কেনো বিবেচনা করেননি, তা জানি না। যদিও কৃত্তিবাসের আত্মপরিচয় থেকে পদ্মার উল্লেখ নিয়ে ইতিহাসবিদরা আলোচনা করেছেন। যাহোক, এই জন্মকাহিনী অনুযায়ী, গঙ্গার আসল প্রবাহ হবার কথা ছিল ভাগীরথীরই, কিন্তু পথে পদ্মামুনি পূর্বদিকে ভুলিয়ে নিয়ে এলেন নদীটিকে। সুরধুনী (গঙ্গার একটি শাখা, আবার গঙ্গার একটি নামও বটে, এখানে দ্বিতীয় অর্থেই ব্যবহৃত) পদ্মাকে তাই অভিশাপ বাণী দিলেন, যেন তার নীরে মুক্তিপদ নাহি হয়। এই কারণেই পদ্মায় স্নান করলে পূণ্য হয় না, কিন্তু ভাগিরথীতে তা মেলে। কৃত্তিবাসী এই উল্লেখ কিন্তু দুটো প্রশ্ন ফয়সালা করে, প্রথমত ইটন প্রমুখদের কথিত সময়ের আগেই গঙ্গার সাথে পদ্মার একটা সম্পর্ক এখানে পাওয়া যাচ্ছে, বাতিল হচ্ছে বাকি ইতিহাসবিদদের যাবতীয় অনুমান। তাদের অনুমান অনুযায়ী এই মিলনটি আরও বহু পরে ঘটেছিল। শুধু যে পদ্মাকে গঙ্গার সাথে যুক্ত দেখেছেন কৃত্তিবাস, তাই নয় , পদ্মাই যে বৃহত্তর ধারা, তারও সাক্ষ্য দিচ্ছেন তিনি আত্মজীবনীতে: “এগার নিবরে যখন বারতে প্রবেশ/ হেন বেলা পড়িতে গেলাম উত্তরের দেশ।।/ বৃহস্পতিবারের বেলা ঊষা পোহালে শুক্রবার/ বারেন্দ্র উত্তরে গেলাম বড় গঙ্গাপার”, এখানে শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে তিনি বরেন্দ্র পৌঁছাতে বড় গঙ্গা পাড়ি দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন। ভৌগোলিক বিচারে এই বড় গঙ্গা পদ্মা, তার রচনায় পুণ্যতীর্থ ভাগীরথীরকেই ছোটগঙ্গা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকে পরিষ্কার যে, কৃত্তিবাসের কালেই পদ্মা গঙ্গার অধিকাংশ জল নিষ্কাষণ করছিল। শাখাদ্বয়ের প্রাচীনতা বিষয়ক কোনো চূড়ান্ত ভৌগোলিক সিদ্ধান্তে অবশ্য এ থেকে পৌঁছান যায় না। কৃত্তিবাসের উল্লেখও বিতর্কমুক্ত ছিল না। কেননা কৃত্তিবাসের আত্মপরিচয়ের পাঠটি ইতিহাসবিদ আবদুল করিম থেকে নেয়া। বৃহৎবঙ্গের রচয়িতা প্রণম্য দীনেশচন্দ্র সেন কিন্তু আরও আগেই আমাদের সতর্ক করেছেন কৃত্তিবাসী রামায়নের অনেকগুলো পাঠ রয়েছে। বড়গঙ্গা তার বিবেচনায় যশোহরে অবস্থিত, পাঠের যে সংস্করণটি তার কাছে প্রামাণ্য, সেখানে ওই উদ্ধৃতির শেষ বাক্যটাতে বরেন্দ্রর বদলে আছে “পাঠের নিমিত্তে গেলাম বড় গঙ্গাপার।” এমনি নানান পাঠের ধর্মীয়-রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও দীনেশচন্দ্র দিয়েছেন : “আমার মনে একটি গভীর সন্দেহ আছে। শাক্ত ও বৈষ্ণবের দ্বন্দ্ব বঙ্গসাহিত্যের পুষ্টিসাধনে নানারূপে সাহায্য করিয়াছে। বৈষ্ণবগণ রাক্ষসদিগের দ্বারা শ্রীরামের স্তবগান করাইয়াছেন; খেদ মিটাইতে শাক্তগণ শ্রীরামকে দিয়া চণ্ডীপূজা করাইয়াছেন; এই দুই দলের চেষ্টায় মূল-অনুবাদ বর্ত্তমান আকারে পরিণত হইয়াছে।” কিন্তু কৃত্তিবাসের আত্মপরিচয়ের দীনেশচন্দ্রের পাঠ ও সিদ্ধান্তটি যে হয়তো ভ্রান্তিপূর্ণ, তা আমরা কৃত্তিবাসী রামায়নে পদ্মার উল্লেখ থেকে অনুমান করতে পারি। অর্থাৎ, এটা অনুমান করা যায় যে, ষোড়শ শতকের আগেই পদ্মা ও ভাগিরথী এই দুই শাখাই বহুবার গঙ্গার প্রধান প্রবাহ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পলি সঞ্চয়ের কারণেই এই প্রবাহ বদল ঘটেছে। ভাগিরথীর ধর্মীয় তাৎপর্য পাবার কারণ সেক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ্য সভ্যতার সাথে তার আগেভাগে সাক্ষাত হওয়া। এই কারণেই সম্ভবত কৃত্তিবাস ওঝা রামায়ণ মহাভারতে পদ্মার মতো একটা প্রবাহের উল্লেখ না পেয়েও তার বঙ্গানুবাদে তার জন্মরহস্য, কেনো তা তীর্থ নয় তা উল্লেখে বাধ্য হয়েছেন। কেননা, পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া, এবং বরেন্দ্রভূমিতে পাঠগ্রহণ করা কৃত্তিবাসের পক্ষে পদ্মার অস্তিত্ব উপেক্ষা করা কিংবা কেনো গঙ্গারই স্রোতধারা হওয়া সত্ত্বেও তা পূণ্যপাদ নয়, এই প্রশ্নের জবাব এড়ানো কঠিন ছিল। কৃত্তিবাস বিষয়ক সামান্য আরেকটু জটিলতা পাঠকদের অবগত হয়ে থাকা জরুরি, পদ্মাবতীর জন্ম নিয়ে তার জল্পনার নিয়েই আরো বহু গবেষণা আর জল্পনার অবকাশ আছে। গূরুত্বপূর্ণ আরেক ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন-এর মতে আবার বড় গঙ্গা বলতে পদ্মাকেই বোঝান হয়েছে : “ছোটগঙ্গা বড় গঙ্গা বড় বলিন্দা [নিঃসন্দেহে বরেন্দ্র-বরেন্দ্রী পার। যথা তথা কর্যা বেড়ায় বিদ্যার উদ্ধার।]। ‘‘কেহ কেহ অনুমান করেন, পাঁচ ছয় শত বছর পূর্বে পদ্মা নদীর অস্তিত্বই ছিল না। কিন্তু ইহা সত্য নহে। সহস্রাধিক বৎসর পূর্বেও যে পদ্মা নদী ছিল, তাহার বিশিষ্ট প্রমাণ আছে। বৌদ্ধ চর্যাপদে ( ৪৯ নং) পদ্মা খাল বাহিয়া বাঙ্গাল দেশে যাওয়ার উল্লেখ আছে। ইহা হইতে অনুমিত হয় হাজার বছর আগে পদ্মা অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র নদী ছিল। অসম্ভব নহে যে, প্রথম খাল কাটিয়া ভাগীরথীর সহিত পূর্বাঞ্চলের নদীগুলি যোগ করা হয়; পরে এই খালই নদীতে পরিণত হয়। কারণ কলিকাতার নীচে গঙ্গা ও স্বরস্বতীর মধ্যে যে খাল কাটা হয়, তাহাই এখন প্রধান গঙ্গা নদীতে পরিণত হইয়া খিদিরপুরের নিকট দিয়া শিবপুর অভিমুখে গিয়াছে এবং কালিঘাটের নিকট আদিগঙ্গা প্রায় শুকাইয়া গিয়াছে। সে যাহাই হউক, ষোড়শ শতাব্দীর পূর্বেই পদ্মা বিশাল আকার ধারণ করে। বাংলা ভাষায় রামায়ণ রচয়িতা কৃত্তিবাসের আত্মজীবনীর বিবরণে তাঁহার জন্মভূমি ফুলিয়া গ্রামের সম্বন্ধে বলা হইয়াছে যে ইহার ‘‘দক্ষিণ-পশ্চিমে বহে গঙ্গা তরঙ্গিণী’’। এই গঙ্গা বর্তমান ভাগীরথী । কিন্তু বারো বৎসর বয়সে কৃত্তিবাস ‘পাঠের নিমিত্তে’ বড় গঙ্গা পার হইয়া যাওয়ার উল্লেখ করিয়াছেন। ইহা যে পদ্মা নদী , সে সম্বন্ধে কোন সন্দেহ নাই। …অষ্টাদশ শতাব্দিতে ফরিদপুর ও বাখরগঞ্জ জিলার মধ্য দিয়া চাঁদপুরের ২৫ মাইল দক্ষিণে দক্ষিণ সাবাজপুরের উপরে মেঘনার সহিত মিলিত হইত। …উনবিংশ শতাব্দির মধ্যভাগে পদ্মার জলস্রোত এই কালি-গঙ্গার খাত দিয়া বহিয়া যাইতে আরম্ভ করে, এবং তাহার ফলে রাজ বল্লভের রাজধানী রাজনগর এবং চাঁদ রায় ও কেদার রায়ের প্রতিষ্ঠিত অনেক নগরী ও মন্দির ধ্বংস হয় । এই কারণে ইহার নাম হয় কীর্তিনাশা । তারপর পদ্মার আরও পরিবর্তন হইয়াছে এবং এখনও হইতেছে।’’ বাংলাদেশের ইতিহাস, প্রাচীন যুগ। রমেশচন্দ্র মজুমদার। দশম সংস্করণ, ২০১০। রমেশচন্দ্র মজুমদার পদ্মার বয়স অন্য ইতিহাসবিদদের চেয়ে কিছুটা বাড়িয়ে ধরলেও তারও অনুমান ভাগিরথীই জ্যেষ্ঠ শাখা। একই মত প্রকাশ করেছেন পালপূর্ব যুগের জীবনচরিত গ্রন্থে দীনেশচন্দ্র সরকার। ইতিহাসবিদদের এই অনুমানে বিজ্ঞানের চেয়ে ধর্ম বেশি ভূমিকা রেখেছে, এমন মত নদী বিশেষজ্ঞ কপিল ভট্টাচার্যের। এমনকি, ভারতীয় অধিকাংশ নদীবিশেষজ্ঞও ধর্মীয় সাহিত্য দ্বারাই পরিচালিত হয়েছেন, এমনটাই তিনি মনে করেন।

সূত্র: বাংলাট্রিবিউন

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY