পারসোনাল ইজ পলিটিক্যাল

0
234

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্কব্যক্তিগত বলে কিছু নেই, সবই পলিটিক্যাল, সবই রাজনৈতিক। অন্তত আমার ক্ষেত্রে তো বটেই। আমার ব্যক্তি জীবনের যা কিছু ঘটনা আমি বলেছি, নিজের যে মত বা পথের উল্লেখ আমি এ যাবৎ করেছি, সবই ব্যক্তির উর্ধে। সবই রাষ্ট্রিক, সামাজিক সমস্যা। আজ বলবো আমার বাসস্থানের সমস্যার কথা। এই পৃথিবীতে আমার কোনও ঘর নেই থাকার। বিশ্বাস করতে হয়ত কষ্ট হয়, কিন্তু এ তথ্য সত্য। যে লেখক বেশ কয়েকটি বেস্টসেলিং বই লিখেছে, যে লেখক ইউরোপ আমেরিকার প্রচুর পুরস্কার অর্জন করেছে, তার নিজের কোনও ঘর নেই, বাড়ি নেই। শুধু তাই নয়, তাকে বাড়ি ভাড়া দেওয়ার মতো কোনও বাড়িওয়ালা নেই। ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট কিনেছিলাম নব্বই দশকের শুরুতে। তিরিশ বছর বয়সে, হাসপাতালে ডাক্তারি চাকরি করার বেতন দিয়ে ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব ছিল না, কিনেছিলাম প্রকাশকদের দিয়ে যাওয়া অগ্রীম রয়েলিটির টাকা দিয়ে। সেই ফ্ল্যাটে ছ’মাসও থাকতে পারিনি। দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম। বাধ্য করেছিল সে সময়ের বিএনপি সরকার। আজ ২৪ বছর আমি দেশের বাইরে, নির্বাসনে। ২৪ বছরে কোথাও কোনও দেশে আমার কোনও ঘর হয়নি, মাথা গোঁজার কোনও ঠাঁই হয়নি। বেশ কিছু সম্পদশালী দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন, বলেছিলেন, ‘তোমার সংগ্রামে আমাদের পূর্ণ সমর্থন আছে, তোমাকে এই নির্বাসনে আমরা সাহায্য করতে চাই। কী চাই বলো, কী দেবো তোমাকে?’ আমি বলেছিলাম, ‘ কিছুই না। তোমাদের ভালোবাসা আর সমর্থন ছাড়া আমার কোনও কিছুর প্রয়োজন নেই। তোমরা বরং আমার দেশের গরিবদের সাহায্য করো। ওতেই আমি খুশি হবো।’ সকলে খুব বিস্মিত হয়েছিলেন। ভেবেছিলেন আমি চরম বোকা। আমি বোকাই। বোকাই রয়ে গেছি আজও।
কোনওদিন কারও সাহায্য নিইনি। না কোনও রাষ্ট্রের, না কোনও ব্যক্তির। রাজনৈতিক শরণার্থীর যেটুকু রাজনৈতিক- অর্থনৈতিক-সামাজিক সহযোগিতা প্রাপ্য, সেটুকুও নিইনি। বই থেকে- পুরস্কার থেকে – যেটুকু উপার্জন ছিল, তা-ই খরচ করেছি দীর্ঘ নির্বাসন জীবনে। আক্ষরিক অর্থেই একা দাঁড়িয়ে আছি আজও। সেই যে তরুণী বয়সে দাঁড়ানোর জন্য সংগ্রাম করে করে একাই দাঁড়িয়েছিলাম, সেই থেকে আজও একাই। কোনও পরিবার, কোনও স্বামী, কোনও ভাই বন্ধু—কারও কাঁধে ভর দিইনি। সেই আমাকে ভেঙে ফেলার জন্য সমাজের বদ এবং কুচক্রি পুরুষ ষড়যন্ত্র কম করেনি। কিন্তু ভাঙতে আমাকে কেউ আজ অবধি পারেনি। ঝড় তুফান সব একাই সয়েছি। এখনও সইছি। এক শহর তাড়িয়ে দিলে আরেক শহরে গিয়েছি, সেই শহর থেকে তাড়ানো হলে  অন্য কোথাও। এক দেশ তাড়িয়ে দিলে আরেক দেশে আশ্রয় নিয়েছি। নির্বাসন জীবন আমার এভাবেই কেটেছে, এভাবেই কাটছে। একবার কেউ ঘাড়ধাক্কা যদি খায়, সে বারবার ঘাড়ধাক্কা খায়। কারণ যারা ঘাড়ধাক্কা দেয়, তারা মনে করে এই মানুষটিকে ঘাড়ধাক্কা দেওয়া সহজ এবং নিরাপদ। একে ঘাড়ধাক্কা দিলে গায়ে টোকা পড়ারও আশংকা নেই।

গোটা ব্যাপারটার দিকে তাকালে কী দেখি? যে বাংলা এবং বাঙালির টানে আমি ইউরোপ-আমেরিকা ছেড়ে ভারতবর্ষে এলাম, সেই ভারতবর্ষ আমাকে কী করেছে? কলকাতায় বাস করছিলাম। সেই কলকাতা থেকে, শুধু শহর কলকাতা থেকে নয়, গোটা পশ্চিমবঙ্গ থেকেই বের করে দেওয়া হলো। কেন, আমাকে বের করে দিলে নাকি কমিউনিস্ট পার্টি মুসলিমদের ভোট পাবে। ফল কী হলো, পার্টি গো-হারা হারলো। হারলো, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে আমার ফেরার দরজাটা চিরকালের জন্য বন্ধই রইলো। নতুন সরকার এসে দরজায় ডবল তালা লাগিয়ে দিলেন। আমি ভিন ভাষা আর সংস্কৃতির মধ্যে হাবুডুবু খেতে খেতে ভাবি আমার বাংলাদেশ নেই, পশ্চিমবঙ্গ নেই, বাঙালি পরিবেশে বাস করতে চাইলে দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কেই তো বাস করতে পারি। গত কয়েক বছর ওই বাঙালি পাড়ায় বাস করার জন্য ফ্ল্যাট খুঁজছি। বাড়িওয়ালারা ফ্ল্যাট দেখান, ফ্ল্যাট, ফ্ল্যাটের ভাড়া সব পছন্দ করার পর যখন এগ্রিমেন্টে সই করার দিন আসে, বাঙালি বাড়িওয়ালা বলে দেন, সই করবেন না। কেন, আমার লেখা পছন্দ করেন, আমাকে শ্রদ্ধা করেন, মানুষ হিসেবে- লেখক হিসেবে-আমার তুলনা হয় না বলেন, কিন্তু তাঁরা অপারগ। ফতোয়া, মাথার দাম, নিরাপত্তা পুলিশ, যা আমার নামের সঙ্গে, দেহের সঙ্গে, সেঁটে আছে – সেগুলোকে বড় ভয় পান তাঁরা। সেদিনও এক বাঙালি বাড়িওয়ালা আমাকে দেখে এমনই উচ্ছসিত যে বারবার নিজের গায়ে চিমটি কেটে দেখেছেন সত্যিই আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কিনা। তিনিও আমার কাছে তাঁর ফ্ল্যাটটি ভাড়া দিতে চাইলেন না। আমি তাঁকে মাসে মাসে ভাড়ার টাকা দেব না, এই ভয় কিন্তু পাননি। তিনি নিশ্চিত ভাড়ার টাকা তিনি মাসে মাসেই ঠিক ঠিক পেয়ে যাবেন, কিন্তু ‘বিতর্কিত’ লেখককে বাড়ি ভাড়া দিলে আবার কী না কী বিতর্কে তাঁকে জড়িয়ে পড়তে হয়, ভয় ওখানেই।

শুধু বাঙালি নয়, পাঞ্জাবি, গুজরাটি সব এলাকাতেই একই সমস্যা। আমাকে কেউ বাড়িভাড়া দেবে না। কারণ আমি তসলিমা নাসরিন। আমাকে ভালোবাসবে, আমাকে শ্রদ্ধা করবে, আমাকে স্যালুট করবে কিন্তু একই বিল্ডিংএ থাকতে দেবে না। তারা ঝামেলা চায় না। কোনও সন্ত্রাসি আমাকে খুন করবে, আমাকে লক্ষ্য করে বোমা ছুঁড়বে, তাতে আবার তাদের বাড়ির কোনও ক্ষতি হয় কিনা, ভয়। ভয় খুব সংক্রামক।

আমি এখন যে বাড়িটিতে আছি, সেটি এক বন্ধুর বাড়ি। বন্ধুটি মারা গেছেন। বন্ধুর পুত্র এ বাড়িটি বিক্রি করবেন। বাড়িটি আমাকে ছাড়তে হবে। কিন্তু ছেড়ে যে অন্য কোথাও থাকবো, তার কোনও উপায় নেই। এই অবস্থায় সরকারের কারও সঙ্গে দেখা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে বছর খানিক আগে একবার দেখা করে সমস্যার কথা বলেছিলাম, বলেছিলাম- ‘সরকারি যেসব বাসা আছে লেখক সাংবাদিক ভাড়া নিতে পারে, সেগুলোর একটি দিন আমি ভাড়া নেব, এতে আমার মাথার দাম বা আমার নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে কারও অসুবিধে হবে না।’ না, উনি কোনও রকম সাহায্য করলেন না। এরপর আবার একদিন দেখা করতে চাইলাম, না, উনি দেখা করার কোনও সুযোগও দিলেন না। যে দল ক্ষমতায়, সে দলের কয়েকজনের সঙ্গে আমার পরিচয়  ছিল, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলাম। ফোন করলাম, ধরলেন না। ম্যাসেজ পাঠালাম, উত্তর দিলেন না। ওঁরা অন্য রাজনৈতিক দলের নিন্দে করেন, কারণ ওই দলগুলো আমার বিপদের সময় নীরব ভুমিকা পালন করেছিলেন। এখন ক্ষমতায় আসার পর আমার বিপদে নিজেরাই নীরব থাকছেন। সব দলই আসলে আমার বেলায় এক, যে যতই অন্যের দোষ দিক না কেন। বাংলাদেশে যেমন বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী কেউই আমাকে সমর্থন করবে না। ভারতেও তেমন। কোনও রাজনৈতিক দলই চায় না আমি ভারতে থাকি। সাধারণ কিছু মানুষ চায়, যারা আমার মত, আদর্শ আর লেখা পছন্দ করে, যারা বাক স্বাধীনতায় সত্যিকার বিশ্বাস করে, তবে তারা যদি বাড়িওয়ালা না হয়, তবেই।

প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনি প্রচারণায় আমার কথা বলেছেন। বলেছেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে কেন তসলিমাকে তাড়ানো হয়েছিল? গুজরাটের মূখ্যমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তিনি আমার নাম নিয়েছলেন, এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘তসলিমাকে যদি পশ্চিমবঙ্গ নিরাপত্তা দিতে না পারে, ওকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও, আমি নিরাপত্তা দেব।’ আমি আবার বোকার মতো মানুষের বলা সব কথা সব শব্দ বিশ্বাস করে বসে থাকি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার এই দুঃসময়ে দেখা করার চেষ্টা করেছি, ব্যর্থ হয়েছি। না, আমার সঙ্গে তিনি দেখা করবেন না। নির্বাচনি প্রচারণায় আমাকে মনে করা যায়, ভোটে জিতে গেলে আমাকে ভুলে গেলেও চলে।

সরকারের সঙ্গে দেখা করার মূল উদ্দেশ্য, আমি আবেদন জানাবো, ‘তোমরা যদি আমাকে বাড়ি পেতে সাহায্য না করো, যে বাড়ির সামনে নিরাপত্তারক্ষী থাকলে বাড়িওয়ালার অসুবিধে হবে না, তা হলে আমার নিরাপত্তারক্ষী তুলে নাও। আমি কোথাও নিরাপত্তারক্ষী ছাড়া বাড়ি ভাড়া নিই’।

আমার একটি নিজের ঘর দরকার। আমি শুধু নই, ভার্জিনিয়া উলফও সেই কত আগে বলে গেছেন মেয়েদের নিজেদের জন্য আলাদা ঘর দরকার, যে ঘরে বসে তারা নিজের মতো করে নিশ্চিন্তে লিখতে পারবে, পড়তে পারবে, ভাবতে পারবে। সে রকম আমার প্রাপ্য, কিন্তু সে ঘর আমি পাচ্ছি না।

সত্য কথা বললে, ভিন্ন মত প্রকাশ করলে, কোনও দলের সঙ্গে আপস না করে থাকতে চাইলে, নিজের মতো চলতে চাইলে, তার জায়গা হবে না এই উপমহাদেশে। তারপরও দেশে গণতন্ত্র আছে বলে দাবি করবে দেশগুলো। আমি আর ক’দিন?  হুট করে কোনও একদিন মরে যাবো। কিন্তু মানুষ যেন ভুলে না যায় কী অসহায়, দুঃসহ দুর্বিষহ দুর্ভাবনার জীবন আমি কাটিয়েছি এখানে। কী অপমান সয়েছি দিনের পর দিন। কোনও অপরাধ না করেও শাস্তি ভোগ করেছি। একটি সুস্থ সুন্দর সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলাম, এ ছাড়া কী অপরাধ ছিল আমার!

লেখক: কলামিস্ট

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY