‘খোদ রাশিয়াই ছিল হামলার লক্ষ্যবস্তু’

0
260

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: আঙ্কারায় নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কারলভের হত্যাকাণ্ডে রাশিয়াই ছিল হামলার লক্ষ্যবস্তু। এটা তুরস্কের অভিজাত শ্রেণির গুরুতর বিভক্তির একটা প্রতীক। কিন্তু এটা এখনও পর্যন্ত সিরিয়ার পুনর্মিলন প্রচেষ্টায় তুরস্ক ও ইরানের প্রতি মস্কোর নীতিকে প্রভাবিত করেনি। আন্দ্রেই কারলভের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আরটি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার প্রভাবশালী সিনেটর কনস্টানটিন কোসাচেভ।
রুশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কনস্টানটিন কোসাচেভ। আরটি-কে তিনি বলেন, তুর্কি রাজনীতির অভিজাতদের মধ্যে এমন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোকজন রয়েছেন যারা রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যকার সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার ভিত্তি দুর্বল করে দিতে চেয়েছিলেন। আন্দ্রেই কারলভের হত্যাকাণ্ড আমাদের এটাই দেখিয়েছে।

কনস্টানটিন কোসাচেভ বলেন, তুরস্ক সরকার প্রায়ই এটা অনুধাবন করে যে, স্থিতিশীলতার জন্য এলিট রাজনীতিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন পাওয়া কঠিন। তুরস্কের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি পুরোপুরি সুরক্ষিত পর্যায়ের নয়। এটা অপরিবর্তনীয়ও নয়। কারণ দুই দেশের মধ্যে নানা বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।

এদিকে ঝানু রুশ কূটনীতিক আন্দ্রেই কারলভের হত্যাকাণ্ড নিঃসন্দেহে রাশিয়া ও তুরস্ককে একটা বড় রকমের ঝাঁকুনির মধ্যে ফেলেছে। সংশয় দেখা দিয়েছে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রতি আগ্রহ রয়েছে, এমন মানুষদের আগ্রহের কেন্দ্রে এখন রুশ-তুর্কি সম্পর্ক। তাদের প্রশ্ন, দুই দেশের সম্পর্ক ঠিক কোন পথে ধাবিত হচ্ছে?

আশঙ্কা থাকলেও এখনও পর্যন্ত এ হত্যাকাণ্ড রাশিয়া ও তুরস্কের সম্পর্কে নতুন কোনও সংকট তৈরি করেনি। উল্টো এ খুনের ঘটনায় একই ভাষায় কথা বলেছেন দুই দেশের নেতারা। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান এবং ভ্লাদিমির পুতিন যেন পরস্পরের বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি করেছেন।গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছেন তুরস্কে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কারলভ। পাশে পিস্তল হাতে খুনি।

তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেই রাশিয়ার দূতাবাসের বাইরে জড়ো হয়েছিলেন চার রুশ নারী। তারা সেখানে গিয়েছিলেন ১৯ ডিসেম্বর সোমবার বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত রাশিয়ার কূটনীতিক আন্দ্রেই কারলভের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। তুরস্কে নিয়োজিত রাশিয়ার এই রাষ্ট্রদূতকে তারা ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন।

এই নারীদের একজন লারিসা লাটকোভা তার্ককান। তিনি তুরস্কে রাশিয়ান কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনে কর্মরত এই নারী বলেন, ‘এটা আমাদের সবার জন্য; রাশিয়ার সব মানুষের জন্য একটা বিশাল ট্রাজেডি। তিনি ছিলেন একইসঙ্গে একজন চমৎকার মানুষ এবং একজন মেধাবী কূটনীতিক।’

তুরস্কের বিবিসি’র প্রতিনিধি মার্ক লোয়েন তার কাছে জানতে চান, এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রুশ সরকারের ক্ষোভ বা ক্রোধ তিনি বুঝতে পারেন কি না? এমন প্রশ্নে কিছুক্ষণের জন্য থামেন লারিসা লাটকোভা তার্ককান। এরপর বললেন, ‘আমি মনে করি, আমি এটা বুঝতে পারি। কিন্তু এই মুহূর্তে কথা বলা আসলেই কঠিন।’

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান বলেছেন, দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিনষ্ট করার লক্ষ্যেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। এটা একটা উস্কানিমূলক কাজ, যার উদ্দেশ্য দুই দেশের সহযোগিতায় সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার যে প্রক্রিয়া চলছে সেটাকে বাধাগ্রস্ত করা। যারা তুরস্ক-রাশিয়ার সুসম্পর্ক বিনষ্ট করতে চাইছেন তাদের লক্ষ্য অর্জিত হবে না।

রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান যে ভাষায় বলেছেন বাস্তবতা যদি তাই হয়; তাহলে এ হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে রুশ-তুর্কি সম্পর্কে নতুন করে বৈরিতার যে আশঙ্কা করা হয়েছিল সেটা ভুল প্রমাণিত হবে। এটা অভিন্ন শত্রু হিসেবে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাশিয়া ও তুরস্ককে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসবে। আর এর মধ্য দিয়ে দুই দেশ বৃহত্তর পরিসরে পারস্পরিক সহযোগিতার প্রতি উৎসাহিত হবে; এতদিন যেটা কৌশলগত সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।রাশিয়া ও তুরস্কের পতাকা

রুশ-তুর্কি সম্পর্কে এপিঠ-ওপিঠ

রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের লড়াই নতুন নয়। এর ব্যাপ্তি চার শতকের। দুই দেশের সর্বশেষ সামরিক সংঘাতের ১০০ বছর পরও তাদের পারস্পরিক বিতর্ক, বাদানুবাদ অব্যাহত থাকে। বিশেষ করে তুরস্কের প্রতিবেশী দেশ সিরিয়ার প্রায় অর্ধযুগের গৃহযুদ্ধে পুরোপুরি বিপরীত অবস্থান নেয় রাশিয়া ও তুরস্ক। সিরিয়ায় সামরিক অভিযানেও জড়ায় মস্কো ও আঙ্কারা। রাশিয়া যেখানে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর; সেখানে তুরস্ক যে কোনও মূল্যে আসাদের পতন চায়। এমনকি গতবছরই রাশিয়াকে উদ্দেশ্যে করে এরদোয়ান বলেছিলেন, আইএস-এর বিরুদ্ধে হামলার অজুহাত তুলে সিরিয়াতে বাশার আল আসাদ বিরোধীদের উপর আক্রমণ চালানো ‘আগুন নিয়ে খেলার সামিল।’

আসাদবিরোধী আন্দোলনে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সমর্থন দিচ্ছে তুরস্ক। সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী ফ্রি সিরিয়ান আর্মি (এফএসএ) একটি তুরস্কপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী। অন্যদিকে সিরিয়ায় রাশিয়ার বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তুই হচ্ছে আসাদবিরোধী বিদ্রোহীরা। বিদ্রোহীদের রুখে দিয়ে আসাদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে চায় আঙ্কারা। এমন পরিস্থিতিতেই বছরখানেক আগে সিরিয়া সীমান্তে রাশিয়ার একটি জঙ্গিবিমান ভূপাতিত করে তুরস্ক। ওই ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। রুশ জঙ্গিবিমান ভূপাতিত করাকে সন্ত্রাসবাদের সহযোগী কর্তৃক রাশিয়ার পিঠে চুরি মারার সঙ্গে তুলনা করেন পুতিন। এমনকি মস্কোর তরফে এমন অভিযোগও আনা হয় যে, আইএসের তেলা পাচার থেকে লাভবান হচ্ছেন প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের পরিবারের সদস্যরা।

এমন বাস্তবতায় রুশ-তুর্কি সম্পর্ক মাঝে যে পর্যায়ে পৌঁছেছিল সেখানে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের বাস্তবভিত্তিক আশঙ্কা ছিল। চার মাসের হুংকার আর বাকযুদ্ধের পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে লেখা এক চিঠিতে ওই ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এরদোয়ান।

তুরস্কের প্রেসিডেন্টের ভাষায়, এটা ঘটুক তা আমরা চাইনি। কিন্তু এটা ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না বলে আমি আশা করি।

মূলত তুরস্কে রুশ পর্যটকদের যে স্রোত ছিল রাশিয়ার বিমান ভূপাতিতের ঘটনায় তা বড় ধরনের ধাক্কা খায়। তুরস্কের সৈকতগুলো রুশ পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। রাশিয়ার ফেডারেল ট্যুরিজম এজেন্সির হিসাবে, শুধু ২০১৩ সালেই তুরস্ক ভ্রমণ করেন ৩৬ লাখ রাশিয়ান পর্যটক। মূলত পুতিনের কাছে এরদোয়ানের দুঃখ প্রকাশের একটা বড় কারণ ছিল পর্যটনের ওই বিশাল বাজার ফিরিয়ে আনা। কেননা তুরস্কের জিডিপি’র একটা উল্লেখযোগ্য অংশ আসে দেশটির সমৃদ্ধ পর্যটন খাত থেকে।রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান এবং ভ্লাদিমির পুতিন

সিরিয়া ইস্যুতে তুরস্ক, রাশিয়া ও পশ্চিমাদের স্বতন্ত্র স্বার্থ ও ভূমিকা রয়েছে। তুরস্ক সিরিয়ায় আইএস ও কুর্দি মিলিশিয়াদের ঠেকাতে বদ্ধপরিকর। সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে নিজের প্রভাব বিস্তারেও আগ্রহী আঙ্কারা। রাশিয়া আলেপ্পোকে বিদ্রোহীদের হাত থেকে ছিনতাই করে আসাদের হাতে তুলে দিয়েছে। আসাদকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে মস্কো।

তুরস্কের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে রাশিয়ার কাছ থেকে কোনও সুবিধা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। কিন্তু ব্যাপক পরিসরে যেটা ধারণা করা হয় সেটা কর্মকর্তাদের এমন বক্তব্যের বিপরীত। কারণ অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাপক বিরোধীতা সত্ত্বেও আলেপ্পোতে রাশিয়ার উপর্যুপরি বোমা হামলায় আঙ্কারা নিশ্চুপ ছিল। এমনকি ১৯ ডিসেম্বর বন্দুকধারীর গুলিতে রাশিয়ার কূটনীতিক আন্দ্রেই কারলভ নিহতের পরও সিরিয়া ইস্যুতে দুই দেশের সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন পুতিন-এরদোয়ান।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান এ মুহূর্তে রাশিয়ার সঙ্গে পথ চলতে চাইছেন। ১৫ জুলাই ২০১৬ তারিখে তুরস্কে এরদোয়ান সরকারের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর একাংশের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত তুর্কি নেতা ফেতুল্লাহ গুলেনকে দায়ী করে এরদোয়ান সরকার। অভ্যুত্থানকালে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বন্ধুদের পাশে না পেয়ে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে তুরস্ক। পুরনো অস্বস্তি ঝেড়ে অভ্যুত্থানের ঘটনায় পুতিনও এরদোয়ানকে ফোন করেন। কিন্তু এরদোয়ানের বিপদ হচ্ছে, মস্কোর প্রতি তার উষ্ণ বন্ধুত্বের বার্তা হয়তো অনেক তুর্কিই মেনে নিতে পারবেন না। এই বন্ধুত্ব মেনে না নেওয়ার একটা বার্তাই হয়তো দেখা গেছে তুরস্কে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কারলভ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়।

ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, কিভাবে রুশ রাষ্ট্রদূতকে গুলি করে হত্যার পর চিৎকার করতে থাকে খুনি। ‘তুর্কিদের চোখে রাশিয়া’ শিরোনামের প্রদর্শনীতে বক্তব্য দেওয়ার সময় কারলভকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। কারলভকে গুলির পর গ্যালারিতে বন্দুকযুদ্ধ চলে কিছুক্ষণ। হামলাকারী ছিল স্যুট পরিহিত সুদর্শন এক যুবক। সে হাতে রিভলবার নিয়ে চিৎকার করতে থাকে। বলতে থাকে ‘সিরিয়াকে ভুলে যেও না। আলেপ্পোকে ভুলে যেও না। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিরাপদ নয়; ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরাও নিরাপত্তার স্বাদ নিতে পারবে না।’ সূত্র: আরটি, বিবিসি, আল জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান।

সূত্র: বাংলাট্রিবিউন

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY