কিছু অভিযোগ থাকলেও সন্তুষ্ট নারায়ণগঞ্জ বিএনপি

0
238

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগের রাত পর্যন্ত কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত শঙ্কা-ভয় থাকলেও বৃহস্পতিবার ভোটের প্রথম প্রহর থেকেই আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। এই নির্বাচনে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেনসহ স্থানীয় বিএনপি নেতারা। এছাড়া এই নির্বাচন নিয়ে বৃহস্পতিবার বিকালে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে  আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও জানান সন্তুষ্টির কথা। এই সন্তুষ্টির কথা দিনভর বিএনপি নেতাদের মুখে-মুখে ছিল।  তবে, কোনও কোনও কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি কম হওয়ার নেপথ্যে ‘টেম্পারিং’-এর অভিযোগ তুলেছেন বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ভোট শেষ হওয়ার আগে আমি কোনও মন্তব্য করব না। তবে মনে হয় ভোটারদের কেন্দ্রে না আসার জন্য টেম্পারিং করা হচ্ছে। তাই বেশি ভোটার আসছে না।’

এদিকে নারায়ণগঞ্জের রেলগেইট-এ স্থাপিত মিডিয়া সেল-এ বসে বিএনপির স্থানীয় নেতারা এ প্রতিবেদককে জানান,  নারায়ণগঞ্জের মানুষই দেশকে একটি সঠিক গণতান্ত্রিক নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাবে। বিএনপি নেতাদের প্রত্যাশা—পাস-ফেল যেই করুক, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সারাদেশেই প্রশান্তি বিরাজ করবে।

দিনের শুরুতে মাসদাইর এলাকার আদর্শ স্কুলে নিজের ভোট দিতে এসে ধানের শীষের প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান প্রশাসনকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সরকারের ওপর নির্ভর করছে। নির্বাচনে কী হয়, তা তো জানি না। আমরা আশা নিয়েই এসেছি। প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ থেকে কাজ করে, তাহলে আমি আশা করি, বিপুল ভোটে জয়ী হব।’

সাখাওয়াতের কয়েক মিনিট পরেই প্রশাসনের অবস্থান পরিষ্কার করেন জেলার পুলিশ সুপার মঈনুল হক। সাংবাদিকদের আত্মপ্রত্যয়ী ও লাস্যমুখেই তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন হবে। আমরা এখানের প্রায় পৌনে পাঁচ লাখ ভোটারের নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়া ও প্রার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করব।’ ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র সম্পর্কে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা আমাদের ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ওই কেন্দ্রগুলোতে ব্যবস্থা নেব।’

পুলিশ সুপারের অবস্থানের সত্যতা মিলে বিএনপি নেতাদের মুখেই। সকাল ১১টার দিকে মিডিয়া সেলে বসে সামনে বসা নেতাকর্মীদের, কখনও মোবাইলফোনে দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন নগর বিএনপির সেক্রেটারি এটিএম কামাল। এই প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে তার সুস্পষ্ট জবাব, প্রশাসনের কিন্তু অবদান খেয়াল করবেন। এই নারায়ণগঞ্জে ৫ জন বিএনপি নেতা একসঙ্গে হাঁটতে পারতেন না। আজ মিলন মেলা বসেছে। হৈ-হুল্লোড়। এটা অবিস্মরণীয়। সারা দেশকে নারায়ণগঞ্জবাসী দেখিয়ে দিয়েছে, এই নির্বাচনের হাত ধরেই দেশে গণতন্ত্র ফিরবে।

নেতাকর্মীরা প্রার্থীর ব্যাজ না পরায় চিৎকার করে বকা দিচ্ছিলেন জেলা আইনজীবী সমিতির  নেতা, নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি জাকির হোসেন। তার সঙ্গে বাদানুবাদ হয়ে যায় মিডিয়া সেলের দায়িত্বে থাকা আরেক নেতা অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুর। ব্যাজ নিয়ে উভয়ের মনোমালিন্য শেষ হয় জাকির হোসেনের কথা বলার পরই। তিনি বলেন, ‘যাই বলুন, নির্বাচন কিন্তু সুষ্ঠু হচ্ছে। নীরব ভোটগুলো পড়লে ধানের শীষের জয় নিশ্চিত।’ কথায় কথায় সশব্দে জাকির হোসেন ফের গলা চড়ান-নারায়ণগঞ্জের মানুষ সরকারকে বাধ্য করছে, তাই এমন হচ্ছে। আমরা এত সহজে ছেড়ে দেব না। তার কথায় বাধ সাধেন পাশেই বসে থাকা হেফাজতের সদস্য সচিব ও বিএনপি-জোটের শরিক মাওলানা ফেরদৌসুর রহমান। তিনি বলন, ‘কি যে বলেন! সরকার না চাইলে সু্ষ্ঠু হতো?’

এরই মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন বিএনপি নেতা এটিএম কামাল। বললেন, ‘চার্জার লাইট নিয়ে যাও।’ এরপর বিষয়টির ব্যাখ্যা করে  তিনি  বলেন, ‘ভোট গণনা করতে করতে যদি সন্ধ্যা হয়ে যায়,  তাহলে  গণনার কাজে যেন বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়,  সেজন্য আমরা নেতাকর্মী ও পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে চার্জার লাইট নিয়ে যেতে অনুরোধ করেছি।’

এটিএম কামাল বলেন, ‘উৎসবের আমেজ পাচ্ছি। সুষ্ঠু ভোট হচ্ছে। নিরাপদ পরিবেশ থাকলে ভোটারদের আরও চাপ বাড়বে। প্রতিটি কেন্দ্রেই নেতাকর্মীরা চারশ গজ দূরে আছেন। রেজাল্ট নিয়েই ঘরে ফিরব। ভোটারবিহীন নির্বাচনের কলঙ্ক থেকে মুক্তি পেতে চাই। নারায়ণগঞ্জবাসী দেশের গণতন্ত্র ফেরাবে। এই ভোটাধিকার ছিনতাই করতে দেব না।’

এরই মধ্যে মিডিয়া সেলের পাশে কথা হয় গণসংহতি আন্দোলনের নেতা তরিকুল সুজনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘স্মরণকালের মধ্যে এমন নির্বাচন হয়নি। খুব ভালো নির্বাচন।’

দুপুরের দিকে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সামনে কথা হয় ঢাকা থেকে যাওয়া কয়েকজন সংবাদকর্মীর সঙ্গে। ঢাকা ফেরার প্রস্তুতি এত দ্রুত কেন—জানতে চাইলে তারা বললেন, কোথাও কোনও সমস্যা নেই। ভোট হচ্ছে নির্বিঘ্নে। থেকে কী হবে?

তিন নেতাকে নিয়ে প্রশ্ন

নারায়ণগঞ্জ বিএনপি নেতারা মুখে সন্তুষ্টির কথা বললেও তিনজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে নিয়ে প্রশ্ন ছিল দিনভর। অভিযোগ, নির্বাচনে স্থানীয় বিএনপির তিনজন শীর্ষ নেতাকে দলের প্রার্থীর চেয়ে নিজেদের প্রার্থীর পক্ষেই বেশ তৎপরতা দেখা গেছে। ফলে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ওইসব প্রার্থীদের স্ব-স্ব ওয়ার্ডেই বেশি তৎপরতা দেখা গেছে। বিএনপির তিনজন নেতা বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার, তিনবারের সাবেক এমপি আবুল কালাম ও সাবেক এমপি গিয়াসউদ্দিনকে নির্বাচনের জন্য খোদ বিএনপির চেয়ারপারসন বলেছেন। কিন্তু তিনজনের কেউ নির্বাচনে থাকতে রাজি হননি। পরে চেয়ারপারসন এ তিন নেতাকে ডেকে সাখাওয়াতের পক্ষে কাজ করার কড়া নির্দেশনা দেন। তিনজনের মধ্যে তৈমুরকে নারায়ণগঞ্জ শহর, গিয়াসউদ্দিনকে সিদ্ধিরগঞ্জ ও আবুল কালামকে বন্দরের দায়িত্ব দেন।

এর মধ্যে তৈমূরের ছোট ভাই মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক ও দুই বারের কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ শহরের ১৩নং ওয়ার্ড, আবুল কালামের ছেলে মহানগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবুল কাউসার আশা ২৩নং ওয়ার্ড ও গিয়াসউদ্দিনের ছেলে গোলাম মোহাম্মদ সাদরিল ৫নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

কেন্দ্রীয় নেতাদের কারণে এতদিন এ তিন নেতাকে সাখাওয়াতের পক্ষে বেশ সক্রিয় দেখা গেলেও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তিনজনকেই স্ব-স্ব ওয়ার্ডে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়।

তৈমুর আলম খন্দকারকে সকাল সোয়া ৮টায় শহরের মাসদাইরে নারায়ণগঞ্জ আদর্শ স্কুলে বিএনপির প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খানের সঙ্গে দেখা যায়। পরে তিনি যান শহরের আমলাপাড়া গার্লস স্কুল কেন্দ্রে। এটাও ১৩ নং ওয়ার্ডে। দুপুরে তৈমুর শহরের শায়েস্তা খান সড়কে বিএনপির মিডিয়া সেলে যান। সেখান থেকে ১টার পর তৈমুরকে আবারও ১৩ নং ওয়ার্ডের বিভিন্ন কেন্দ্রে ঘুরতে দেখা গেছে।  তৈমুর আলম খন্দকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সকাল থেকে আমি আমার এলাকায় কাজ করছি। আমার সব নেতাকর্মী প্রতিটি কেন্দ্রে কাজ করছেন। আমি এক বিন্দুও অলসতা দেখাইনি। প্রতি মুহূর্তে ব্যস্ত থেকে সবাইকে তাগিদ দিচ্ছি।’

সাবেক এমপি গিয়াসউদ্দিন  বলেন, ‘সিদ্ধিরগঞ্জের সব কেন্দ্রেই বিএনপির নেতাকর্মীরা সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। সব কেন্দ্রে এজেন্ট, পোলিং এজেন্ট, সমর্থকেরা আছেন। আমার ছেলে নির্বাচন করলেও দলের প্রার্থীর পক্ষেই আমি সরব ছিলাম, এখনও আছি।’

সাবেক এমপি আবুল কালামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেনি। তবে আবুল কালামের ছেলে আবুল কাউসার আশা জানান, ‘শান্তিপূর্ণভাবে ভোট চলছে। আমাদের বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা বন্দর থেকে শুরু করে শহরের সব কেন্দ্রে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করছেন।’

পোলিং এজেন্টবঞ্চিত সাখাওয়াত

স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী  জানান, নির্বাচনের আগের রাতে ১২ টার পরও অনেক পোলিং এজেন্টকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ৬ নাম্বার ওয়ার্ডের সাফুরা খাতুন পাইলট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে ধানের শীষের কোনও এজেন্ট ছিল না বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার আব্দুস সালাম।

বিএনপির দলীয় প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খান এ বিষয়টি যাদের সমন্বয় করার দায়িত্ব দিয়েছেন, তারা কোনও উদ্যোগ নেননি বলে জানা গেছে। জানতে চাইলে নাসিক নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে গঠিত বিএনপির সমন্বয়ক স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘দুই একটি স্থানে এজেন্ট নেই, এটি শুনেছি। আমরা প্রত্যেকটি ওয়ার্ডেই দায়িত্বশীল দিয়েছিলাম। নগর বিএনপির সেক্রেটারি এটিএম কামালও স্বীকার করেন এই এজেন্ট না থাকার বিষয়টি। তবে মাঝে-মাঝে ছোট-ছোট অভিযোগ করেন বিএনপি নেতারা। বিএনপি প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খানও বললেন, ‘ছোটখাটো অভিযোগ পেয়েছি। তবে এখন তা বলব না। ঝামেলার মধ্যে বলতে পারব না, পরে বলব।’

ভোট শেষে  বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘বাহ্যিকভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু। তবে পর্দার আড়ালে যদি কোনও কিছু না ঘটে, তাহলে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন মেনে নেবে বিএনপি।’

সূত্র: বাংলাট্রিবিউন

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY