নীতি কেন লুটেরাবান্ধব

0
158

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: ‘নীতি’ সাধারণত খারাপ থেকে ভালোয় উত্তরণ ঘটায়। ভালো থেকে খারাপের দিকে যাত্রার ব্যতিক্রম নীতিও আছে। আবার মুখে বলছি ভালো কথা, ভালো নীতির কথা, বাস্তবে যা ঘটছে বা যা করছি তার সঙ্গে নীতি বা নৈতিকতার সম্পর্ক নেই। যা খারাপ তো বটেই, নিয়ম-নীতি-নৈতিকতাহীন। পাকিস্তানিদের অন্যায়-অনৈতিকতার বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই বাংলাদেশের নীতি-নৈতিকতার অবস্থাটা কেমন দাঁড়ালো গত ৪৫ বছরে? এদেশে কিছু ভালো ‘নীতি’ নিশ্চয়ই আছে।
যেমন, স্বৈরাচার এরশাদের ‘ওষুধ নীতি’র সুফল আজকের সমৃদ্ধ ওষুধ শিল্প। সেই ওষুধনীতি পরিমার্জিত রূপ পেল শেখ হাসিনা সরকারের হাতে। অনেক খারাপের মাঝে ভালো উদ্যোগ। এমন ভালো নীতি বা উদ্যোগ নিশ্চয়ই আরও আছে। আজকের লেখার বিষয় সেটা নয়। এই লেখায় দেখার চেষ্টা করছি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সামগ্রিকভাবে যে নীতি, তা জনবান্ধব নয়, এক ধরনের চোর বা লুটেরাবান্ধব। এই কথায় ক্ষিপ্ত হয়ে বিষোদগার, করতে পারেন। তা না করে অস্বীকার করুন বা করার চেষ্টা করুন, তথ্য এবং যুক্তি দিয়ে। কেন বলছি চোর বা লুটেরাবান্ধব, সংক্ষেপে তা বলার চেষ্টা করছি।
১. ‘নীতি’ তো মানুষের জন্যে। এক সময় চিনিকলের জন্যে জমির প্রয়োজন ছিল, সাঁওতালদের থেকে (বাঙালিদের থেকেও) জমি নেওয়াও হয়েছিল। আখ চাষের যে শর্তে জমি নেওয়া হয়েছিল, শর্ত ভঙ্গ হওয়ায়, তা আবার সাঁওতালদের ফিরিয়ে দেওয়ার কথা। তা দেওয়া হয়নি। কিছু জমিতে সাঁওতালরা বসতি স্থাপন করেছিল। পুলিশ দিয়ে সাঁওতালদের বাড়িতে  আগুন লাগিয়ে তাদের বিতাড়িত করা হয়েছে। পত্রিকার শিরোনাম ‘এই শীতে সাঁওতালরা গাছতলায়’। পুলিশ দিয়ে মানুষের বাড়িতে আগুন, ঘোষিত নয় সরকারের অঘোষিত নীতি। ওই জমি চিনিকলের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এবং এলাকার রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের প্রয়োজন। তাদের জন্যে কাজ করছে সরকার। সরকারের প্রশাসন।
সরকারের ‘নীতি’ সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে, লুটেরা প্রভাবশালীদের পক্ষে- একথা লিখলে কি ভুল বা অন্যায় হবে?

২. গ্রাম থেকে শহরে ফিরে আসি। বিআরটিসি বলে একটি প্রতিষ্ঠান আছে। সরকারের পরিবহন সংস্থা। সারা পৃথিবীর মুক্তবাজার অর্থনীতির যারা প্রতীক সেই আমেরিকা থেকে জার্মানি, সব দেশেই শহরের পরিবহন ব্যবস্থা সরকারের নিয়ন্ত্রণে। নিউইয়র্ক বা ফ্রাঙ্কফুর্ট সব শহরেই দেখবেন সরকারি বাস নিয়ম করে চলছে, অধিকাংশ সময় বিশাল বাস দু’একজন যাত্রী নিয়ে চলছে। অর্থাৎ সরকার জনগণের জন্যে এ খাতে ভর্তুকি দেয়।

আর বাংলাদেশ। দুর্নীতি, অনিয়ম আর নীতিহীনতার অপর নাম বিআরটিসি। জনগণের টাকায় বাস কেনে, নিজেরা চালায় না। লিজ দেয়, ছয় মাসে এক দেড় কোটি টাকার বাস অকেজো হয়ে পড়ে। পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক দোতলা বাস ডিপোয় রেখে ধ্বংস করা হয়।

পুরনোগুলোর সংস্কার নেই, রক্ষণাবেক্ষণ নেই। আছে নতুন নতুন বাস কেনার পরিকল্পনা। বিআরটিসি থেকে জনগণ কোনও সেবা পায় না। অথচ মাথাভারী প্রতিষ্ঠান নিয়ে চলছে বিআরটিসি।
এই নীতি কি জনবিরোধী এবং লুটেরাবান্ধব নয়?

৩. যিনি শ্রমিক নেতা, তিনি বা তার পরিবার মালিক সমিতির নেতা। শ্রমিক নেতা মন্ত্রী। শ্রমিকদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যায় পুলিশ। মন্ত্রী শ্রমিক নেতা আন্দোলনের নামে অবরুদ্ধ করে রাখে যাত্রীদের। দুর্ঘটনায় মানুষ হত্যা করা হবে, বিচার করা যাবে না। গরু-ছাগল চিনলেই ড্রাইভিং লাইসেন্স দিতে হবে। শ্রমিক নেতা মন্ত্রী শুধু তা দাবি করেন না, রাষ্ট্রকে দিয়ে তা কার্যকর করিয়েছেন।

আরেক মালিক সমিতির নেতাও মন্ত্রী। ‘শ্রমিক-মালিক’ এক্ষেত্রে দারুণ সখ্যতা। ভাড়া বৃদ্ধি থেকে শুরু করে, সবকিছুতেই তাদের দারুণ সখ্যতা। সরকারের ‘নীতি’ মালিকের পক্ষে, শ্রমিক নেতার পক্ষে- শ্রমিক বা সাধারণ জনমানুষের পক্ষে না।
এমন উদ্ভট ‘নীতি’ই তো চলছে বাংলাদেশে।

৪. বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) যে ‘নীতি’ কী, বোঝা বড় মুশকিল। আন্তর্জাতিক বাজারে যে তেলের দাম ৪০ ডলার, বিপসি তা কেনে ৬০ বা ৬৫ ডলারে। প্রতিষ্ঠানের ভেতরের দুর্নীতি নিয়ে তো অভিযোগের অন্ত নেই ।এখন জানা যাচ্ছে, বিপিসির এলসিতে ১৪০০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তারা এলসি খুলেছে, টাকা বিদেশে চলে গেছে। টাকার বিপরীতে পণ্য আসেনি। এই তথ্য জানাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘নীতি’র অবস্থা বোঝেন! টাকাটা গেল কোথায়?

সঠিক ‘নীতি-নৈতিকতা’ থাকলে, প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করা হত। জানা যেত, জনগণকে জানানো হত।

৫. বাংলাদেশ ব্যাংক বিপিসির চিত্র জানালো। বাংলাদেশ ব্যাংকের চিত্র জানাবে কে? জনগণের অর্থ ‘রিজার্ভ’ থেকে চুরি হয়ে গেল। অনেক গড়ি-মসি করে তদন্ত একটি হলো। জানা গেল না সেই তদন্তে কী পাওয়া গেল। জানা যাবে, তারও আশা ক্ষীণ। আর জানা যদি যায়ও, কী হবে? কিছু চোরের নাম জানা যাবে, এই তো! চোরদের নাম তো শেয়ারবাজার তদন্ত থেকেও জানা গিয়েছিল। সেই সব চোরদের পদ-পদবী পেতে তো সমস্যা হয়নি।

‘নীতি’ যদি হয় লুটেরা রক্ষার! কার কী করার আছে? জনগণের তো কিছু করার নেই। পাঁচ বছর পর পর ভোট দিতে পারত। এখন তাও দিতে পারে না। সেই ‘নীতি’ও কার্যকর নেই।

জনগণের অর্থ বেসিক, সোনালীসহ অন্যান্য ব্যাংক থেকে লুটেরারা নিয়ে গেল। ‘নীতি’ লুটেরাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিল, অপরাধীদের পুষে রাখল।

দেশের মালিক জনগণ তা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন।

৬. ‘নীতি’র অবস্থা এতটাই করুণ যে, প্রধানমন্ত্রীর বহনকারী উড়োজাহাজেরও নাট ঢিলা করে রাখা হয়। একটি নতুন উড়োজাহাজ প্রায় কোনও জটিলতা ছাড়া ১০ থেকে ১৫ বছর চলতে পারে। আমাদের নতুন উড়োজাহাজগুলোর বয়স এক থেকে ৪ বছর। নাট ঢিলা, মায়ানমারের আকাশ থেকে ফিরে আসতে হয়। ‘ভুল করে’ অজুহাতে চোরাচালানের জন্যে সিলেটের ফ্লাইট চলে যায় কলকাতায়। বিমান, বিমানবন্দর চোরাচালান, দুর্নীতির স্বর্গ। অনেক আলোচনা আছে, কিন্তু এই ‘নীতি’ থেকে সরে আসার কোনও উদ্যোগ নেই।

৭. প্রাকৃতিক সম্পদ গ্যাস-কয়লা। এমন ‘নীতি’তে চলছে, যাতে মালিক হয়ে গেছে বিদেশি কোম্পানি। অথচ প্রাকৃতিক সম্পদের মালিক জনগণ। অক্সিডেন্টালের কারণে ১৫ হাজার কোটি টাকার গ্যাস সম্পদ ধ্বংস হয়। এমন ‘নীতি’ অনুসরণ করা হয়, ক্ষতিপূরণ দিতে হয় না অক্সিডেন্টালকে। তারা সিঙ্গাপুরে বসে বাংলাদেশের জনগণের সম্পদ আরেক বিদেশি কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিয়ে চলে যায়। বাংলাদেশের জনগণ জানেও না, তার সম্পদ একজন আরেকজনের কাছে বিক্রি করছে।

ফুলবাড়ীর কয়লা খনি দেখিয়ে এশিয়া এনার্জি লন্ডন শেয়ারবাজারে ব্যবসা করছে। আমাদের সরকারের নির্বিকার ‘নীতি’।

৮. এমপিরা একটি গাড়িতে এক দের কোটি টাকা ট্যাক্স মওকুপের সুযোগ পায়। অথচ একটি পাওয়ার টিলার কেনার জন্যে কৃষককে ট্যাক্স দিতে হয়। এই একটি ‘নীতি’ থেকেও বোঝা যায়, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতি গুলো জনবান্ধব নয়, লুটেরাবান্ধব।

এমন নীতির পরও দেশের অর্থনীতি গতিশীল। কারণ সাধারণ জনমানুষের অপরিসীম কর্মক্ষমতা। সেই সাধারণ মানুষের একটি অংশ, প্রায় এক কোটি মানুষ কঠোর পরিশ্রম করে বিদেশ থেকে অর্থ পাঠাচ্ছে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা ছাড়া। ট্র্যাজেডি এই যে, সেই অর্থের একটা অংশ চুরি হয়ে, পাচার হয়ে মালয়েশিয়া- কানাডা- আমেরিকায় চলে যায়। রাষ্ট্রের ‘নীতি’ লুটেরা পাচারকারীদের ধরে না, কোনও কোনও ক্ষেত্রে সহায়তা করে।

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY