চেক না করে কিছুই বলতে পারবেন না পরিকল্পনা সচিব!

0
170

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: বিজয় দিবসের ফেস্টুনে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের ছবিতে বীরশ্রেষ্ঠ শেখ নূর মোহাম্মাদের নাম সংক্রান্ত ভুলের বিষয়টি ‘চেক’ করার আগে কোনও মন্তব্য করতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব তারিক উল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আগে চেক করি দেখি। চেক না করে কিছুই বলতে পারব না। এটা (ফেস্টুন) আমরাই লাগিয়েছি। বিষয়টি আমাদের চেক করতে হবে। যদি ভুল হয়ে থাকে, তাহলে আমরা ঠিক করব অথবা সরিয়ে ফেলব। রিফ্রেশ করে দেব।’ শনিবার মোবাইলফোনে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

বীরশ্রেষ্ঠদের নাম ও ছবিতে এ ধরনের ভুল হওয়া উচিত কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এই সচিব বলেন, ‘বিষয়টি আমরা দেখি। না দেখে আমি কোনও মন্তব্য করতে পারব না।’ এরপরই তিনি ফোন কেটে দেন।

প্রসঙ্গত, এবারের বিজয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সড়কদ্বীপগুলোয় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সাত বীরশ্রেষ্ঠর নাম-ছবি সংবলিত ফেস্টুন লাগানো হয়। বিজয় দিবসে বীরশ্রেষ্ঠদের শ্রদ্ধা জানাতেই এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানায় মন্ত্রণালয়। তবে শ্রদ্ধা জানানোর বদলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের ছবিতে ব্যবহার করেছে আরেক বীরশ্রেষ্ঠ শেখ নূর মোহাম্মাদের নাম।

শুক্রবার (১৬ডিসেম্বর) এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদের প্রকৃত ছবি ও পরিকল্পনা মন্ত্রণায়ের উদ্যোগে ছাপানো ভুল ছবি দিয়ে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনকে চেনে না পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়! শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই সংবাদ প্রকাশের পর মন্ত্রণালয়ের এমন ভুল ক্ষমার অযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানরা।

শুক্রবার এ বিষয়ে কথা বলতে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব তারিক উল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হয়। এছাড়া এসএমএসও পাঠানো হয়। এরপরও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

উল্লেখ্য, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে শহরজুড়ে দেওয়া এসব ফেস্টুনে লেখা রয়েছে, ‘১৬ ডিসেম্বর: মৃত্যুঞ্জয়ী বাংলাদেশ’,  ‘অনন্তের পথে আমাদের চেতনার বাতিঘর।’ এরপর একজন করে বীরশ্রেষ্ঠ’র ছবি দিয়ে লেখা রয়েছে, ‘পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়’, ‘যেখানে আপনার একটি স্বপ্ন আছে’, ‘সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের।’

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি ও বীরশ্রেষ্ঠের নাম ভুল করার বিষয়টিকে অমার্জনীয় অপরাধ বলে মন্তব্য করেছেন ‘সেন্টার ফর বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার স্টাডিজ’-এর চেয়ারম্যান ও প্রধান গবেষক মেজর (অব.) কামরুল হাসান ভূঁইয়া।  শনিবার বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘এই কাজের জন্য যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন, তারা মুক্তিযোদ্ধাদের নাম, চেহারা সম্পর্কে অবগত নন। অথচ এই মুক্তিযোদ্ধারা সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাব প্রাপ্ত। যারা এই ফেস্টুন ছাপানো ও সুপাইভাইজ করার দায়িত্বে ছিলেন, তারা এ সর্ম্পকে জানেনই না। এমনকি সচিব সাহেব যদি আজ বলে থাকেন যে, তাকে চেক করে এটা বলতে হবে, তাহলে তো উনিও জানেন না। তাহলে মন্ত্রণালয় থেকে কারা এ কাজ করেছেন?’

এই মুক্তিযোদ্ধা আরও বলেন, ‘একসময় পাঠ্যবইয়ে সাত বীরশ্রেষ্ঠর নাম, ছবি পরিচিতি ছিল, এখন সেগুলো তুলে দেওয়া হয়েছে। অথচ আমরা পড়ছি মোঘল ইতিহাস আমাদের তো মোঘল ইতিহাস পড়ার কোনও অর্থ হয় না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সময়ের প্রয়োজনটা উপলব্ধি করতে হবে। আমাদের দায়িত্ব, দায়বদ্ধতা যদি নিরুপণ করা না যায়, তাহলে কী করে পরবর্তী প্রজন্মকে সোনার বাংলা ও মানচিত্র দিয়ে যাব?’

এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ শুক্রবার  বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আমরা কেবল বিকৃতিই দেখছি না, অবহেলাও দেখছি। এই অবহেলা আমাদের রোধ করতে হবে। কারণ এটাও এক ধরনের বিকৃতি। যারা কাজটা করেছেন, তারা বলতেই পারেন, কোনও অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এই ভুল কিংবা এই বিকৃতি করা হয়নি। এটা নিতান্তই একটা ভুল। কিন্তু আমি বলতে চাই, এই ভুল ক্ষমার অযোগ্য। কারণ, বাংলাদেশের সাত জন বীরশ্রেষ্ঠের নাম আমরা মনে রাখতে পারব না, তাদের একজনের ছবি দিয়ে আরেকজনের নাম দেব, এটা হতে পারে না। আমাদের বীরশ্রেষ্ঠ এক হাজার জন নন যে, এতগুলো নাম আমরা মনে রাখতে পারব না। যে ছবিগুলো ব্যানার-ফেস্টুনে ব্যবহৃত হচ্ছে সেগুলো আমরা ঠিকমতো শেখাতে পারছি না। কার ছবিতে কার নাম ব্যবহার করা হচ্ছে, তা খেয়াল করলাম না, এটা হতে পারে না।’

মন্ত্রণালয়ের এমন ভুল নিয়ে জানতে চাইলে  সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এসব ব্যাপারে অনেক সাবধান থাকা জরুরি বলে মন্তব্য করে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সাইফুর মিশু বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি তথ্য নির্ভুল হওয়া উচিত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক ব্যাপারগুলো সম্পর্কে অন্তত ভালোভাবে জানতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ  সম্পর্কে যাদের ধারণা নেই, কেবল তাদের পক্ষেই  একজন বীরশ্রেষ্ঠের ছবিতে অন্য একজন বীরশ্রেষ্ঠের নাম লেখা সম্ভব।’

সূত্র: বাংলাট্রিবিউন

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY