ওয়াটার বাস চলছে কি না কেউ জানে না

0
212

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: ঢাকার যানজট নিরসনে রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোকে কাজে লাগিয়ে নৌপথ চালু করা ছিল মূল উদ্দেশ্য। এর জন্য কয়েক দফায় কেনা হয় ৯টি ওয়াটার বাস। প্রতিটি ওয়াটার বাসের বডি তৈরি ও ইঞ্জিন কিনতে সরকারের ব্যয় হয়েছে কমবেশি ৫০ লাখ টাকা। এত ‘দামি’ ওয়াটার বাসগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত বিআইডব্লিউটিসিকে। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে বিআইডব্লিউটিসি।এরপর এটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে। তাতেও জনগণের ভোগান্তি কমেনি, বরং তা বেড়েছে। বর্তমানে ওয়াটার বাস সার্ভিস কেমন চলছে, নাকি চলছে না, সে খবরও ভালো কারে জানা নেই কারও। না যাত্রীদের, না সংশ্লিষ্ট মহলের। বিআইডব্লিউটিসি পরীক্ষামূলকভাবে ওয়াটার বাস পরিচালনার জন্য ইমরান ট্রেডার্স নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ দেয়। ওয়াটার বাস সার্ভিস প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর অন্যতম। লক্ষ্য ছিল এর মাধ্যমে একদিকে রাজধানীর যানজট কমবে। অপরদিকে রাজধানীবাসী কম খরচে কম সময়ে সদরঘাট থেকে টঙ্গী, গাবতলী, আশুলিয়া এমনকি নারায়ণগঞ্জ বন্দর পর্যন্ত চলাচল করতে পারবেন। এ সব স্থানে পণ্য পরিবহনে জনসাধারণের ভোগান্তি কমবে। খরচও কমবে। বেশ ঢাকঢোল পিটিয়েই ওয়াটার বাসের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। জনপ্রিয়তাও পেতে থাকে। বাড়তে থাকে ওয়াটার বাসের যাত্রী। কমতে থাকে সড়কপথে রাজধানীতে বাসে চলাচলকারী যাত্রীর সংখ্যা। এ কারণেই শুরুর পর থেকেই এটি নিয়ে নানা রকমের সমস্য দেখা দেয়। পিছু নেয় এক ধরনের সুবিধাবাদী সিন্ডিকেট। যারা এই নৌ-রুট ও জাহাজগুলোকে ভোগান্তিতে পরিণত করার চক্রান্তে মেতে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, সড়কপথে পরিবহন ব্যবসায়ীদের পক্ষে গড়ে ওঠা ওই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয় সরকারের কিছু অসৎ কর্মকর্তা ও কর্মচারী। ফলে দিনের পর দিন ওয়াটার বাসের পরিচালনায় ইচ্ছা করে ব্যাঘাত ঘটানো হয়। আদায় করা হয় সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া। অমান্য করা হয় সরকারের দেওয়া নির্দিষ্ট টাইম শিডিউল। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা ও মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেন যাত্রীরা। এর ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এই প্রকল্পটি। মুখ থুবড়ে পড়ে অনেক দামে কেনা জাহাজ ও নৌরুটের ভবিষ্যৎ। বর্তমানে এই ওয়াটার বাসগুলো ঠিকমতো চলছে কিনা তা জানেন না কেউ। জানা গেছে, ওয়াটার বাসের এই সার্ভিস অজনপ্রিয় করতে নানা অজুহাতে জাহাজের গতি কমানো হয়েছে। বলা হয়েছে, দ্রুত গতিতে চললে নদীর পাড় ভেঙে যায়। এতে নদীতে চলাচলকারী ছোট নৌকা ও ট্রলারেরও ক্ষতিসাধিত হয়। এজন্য গতি কমিয়ে চলতে হয়েছে ওয়াটার বাসকে।  ফলে যে সময়ে গন্তব্যে পৌঁছার কথা ছিল, সেই সময়ে পৌঁছাতে পারেননি যাত্রীরা। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন তারা। কথা ছিল জনপ্রতি ৩০ টাকা ভাড়া হবে গাবতলী থেকে সদরঘাট পর্যন্ত। সেখানে ইজারাদার প্রতিষ্ঠান জোর করে ৪০ টাকা এবং সময় সুযোগ পেলে তার চেয়েও বেশি ভাড়া আদায় করেছে।  এতেও ক্ষুব্ধ হয়েছেন যাত্রীরা। দেখা গেছে, যাত্রীতে পরিপূর্ণ জাহাজ, সময় হয়ে গেছে ছাড়ার, তারপরেও ছাড়ছে না। আরও যাত্রী নিতে দেরি করা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, জাহাজের জ্বালানি তেল আনতে কেউ ওপরে গেছেন, তিনি আর ফেরেননি। এভাবে নানা  ছলচাতুরি করে সময় ক্ষেপণ করেছে ইজারাদার প্রতিষ্ঠান। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে যাত্রীরা বিরক্ত হয়েছেন।এছাড়া তিন জাহাজের যাত্রী গাদাগাদি করে এক জাহাজে পরিবহন করে, বাকি দুই জাহাজের তেল সাশ্রয় করারও চেষ্টা চালায় ইজারাদার প্রতিষ্ঠান। এর ফলে ওয়াটার বাসে চলাচলের ক্ষেত্রে আরামদায়ক ভ্রমণ ব্যহত হয়েছে। এতসব অভিযোগ ওঠার পরেও ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ। অপরদিকে ল্যান্ডিং স্টেশনগুলোতেও চলছে অরাজকতা। এগুলো ব্যবহারের জন্য যাত্রীদের প্রতি চলে নানা রকমের জোরজুলুম। টিকিট ও মালের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়। একবার টিকিট কেটে কেউ নিচে গেলে পুনরায় ভেতরে ঢুকতে টিকিট কাটতে বাধ্য করার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যপার। ল্যান্ডিং স্টেশনগুলোয় সন্ধ্যার পরে নামে মাদকসেবীদের আড্ডা। জ্বলে না বাতি। নেই নিরাপত্তাও। ল্যান্ডিং স্টেশনগুলোতে যাওয়ার রাস্তারও বেহাল দশা, ভেঙেচুরে একাকার। এছাড়া ল্যান্ডিং স্টেশনগুলোতে রয়েছে নারীযাত্রীদের হয়রানি। নদীতে পানির গভীরতা কম, এটিও জাহাজ পরিচালনা না করার একটি অজুহাত।স্বাভাবিক সাইজের একটি মালবাহী ট্রলার যেখানে ১০ ফুট গভীরতায় চলতে পারে। সেখানে ওয়াটার বাসগুলো চলতে পানির গভীরতা লাগে মাত্র ছয় ফুট।দেখা গেছে, এরুটে দিব্যি মাল বোঝাই ট্রলার চলছে, অথচ ওয়াটার বাস চলছে না। সুতরাং নদীর গভীরতা কম- এই অভিযোগ মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। তার পরেও এই অজুহাতে ইজারাদার প্রতিষ্ঠান জাহাজ না চালিয়ে সরকারের এই প্রকল্পকে ধীরে ধীরে অচল করে দিচ্ছে। এখানেও ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মদদ দিচ্ছেন সরকারের লোকজন, এ অভিযোগ ভূক্তভোগীদের। ২০১০ সালের আগস্ট মাসে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি ওয়াটার বাস নিয়ে রাজধানীর গাবতলী থেকে সদরঘাট পর্যন্ত রুটে নৌ সার্ভিস চালু করেছিল বিআইডব্লিউটিসি। যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ মোকাবিলায় ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে এই বহরে যুক্ত হয় আরও  ছয়টি বাস। বিআইডব্লিউটিসি সূত্রে জানা যায়, এই মুহূর্তে ৯টি ওয়াটার বাস অরক্ষিত অবস্থায় অযত্ন ও অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত বিআইডব্লিউটিসি ৯টি ওয়াটার বাস পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালনার জন্য বেসরকারি কোম্পানি ইমরান ট্রেডার্সের কাছে ছেড়ে দিলেও, তা সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে। ওয়াটার বাসগুলো দৈনন্দিন ঢাকার চারপাশের বিদ্যমান নৌপথে চলাচল করার কথা থাকলেও ইজারাদার ইমরান ট্রেডার্স কর্তৃপক্ষ তা চালাচ্ছে না। জাহাজগুলো দিনের শেষে বাদামতলী ঘাটে এসে থাকার কথা থাকলেও সেগুলো যেখানে-সেখানে রাখা হচ্ছে। এতে জাহাজের বিভিন্ন দামি যন্ত্রাংশ চুরি হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে, বিআইডব্লিউটিসির উপ-মহাব্যবস্থাপক (যাত্রী) আজমল হোসেন ”মিরর বাংলা নিউজকে জানান, ‘এটি প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প। এটি বন্ধ হবে না। বন্ধ করা যাবে না। বাংলাদেশে এ ধরনের প্রকল্প প্রথম বিধায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে  অচিরেই তা কাটিয়ে ওঠা যাবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ‘যাদেরকে এটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারা না চালানোর জন্য কিছুটা গড়িমসি করছে। নানা অজুহাতে এটি চালাচ্ছে না। আমরা বিষয়টি দেখছি। প্রয়োজন হলে আমরা ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করব।’ নতুন কোনও প্রতিষ্ঠানকে এটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলেও জানান আজমল হোসেন। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ‘জাহাজগুলো যেহেতু ইমরান ট্রেডার্সে দায়িত্বে, সেহেতু তাদেরই সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করার কথা। আমরা তাদের কার্যক্রম মনিটর করি মাত্র।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত বিআইডব্লিউটিসির সহকারী মহা ব্যবস্থাপক বরকতউল্লাহ ”মিরর বাংলা নিউজকে জানিয়েছেন, ‘ইজারাদার প্রতিষ্ঠান ইমরান ট্রেডার্স কর্তৃপক্ষ জাহাজগুলো ঠিকমতো চালায় না। বারবার সতর্ক করার পরেও নানা অজুহাতে জাহাজগুলো বসিয়ে রাখছে তারা। তাদের অজুহাত, লোকসান হচ্ছে। জ্বালানি তেল বেশি খরচ হচ্ছে। দিনে একটি জাহাজ চালালে অন্যটি চালানোর কোনও উদ্যোগ নেয় না। যাত্রীরা এলেও জাহাজ কখন ছাড়বে  তা পরিষ্কার করে জানায় না। ফলে যাত্রীরা বিরক্ত হয়ে চলে যান। তখন তারা বলে,  যাত্রী নাই। কম যাত্রী নিয়ে জাহাজ পরিচালনা করলে কোম্পানির লোকসান হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইমরান ট্রেডার্সের মালিক আশরাফ আলী ”মিরর বাংলা নিউজকে বলেন, ‘লোকসান হচ্ছে। যাত্রী কম। তেল লাগে বেশি। নানা কারণে যাত্রী আসে না। তাই ঠিকমতো জাহাজগুলো চালানো সম্ভব হয় না।’ এ রুটকে জনপ্রিয় করতে হলে প্রথম প্রথম সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে বলেও জানান তিনি। উল্লেখ্য,ওয়াটার বাস প্রকল্পের পেছনে সরকারের এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৩৬ কোটি টাকা।

সূত্র: বাংলাট্রিবিউন

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY