শিশু ব্যবসাকে ঘিরে তোলপাড়

0
233

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: এক-একজনের দাম ভারতীয় মুদ্রায় ছয়-সাত লাখ টাকা। ফর্সা ছেলেশিশু হলে দাম সব চেয়ে বেশি। তার পর দাম বেশি ফর্সা মেয়েশিশুর। কালো বা শ্যামলা রঙের হলে ছেলে-মেয়ের দাম একটু কম। সে ক্ষেত্রে যত কম কালো, দাম তত বেশি।

এই দামেই কলকাতা ও আশপাশের কয়েকটি নার্সিংহোম থেকে বিক্রি করা হতো সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুদের। এ সপ্তাহের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের অপরাধ দমন শাখা (সিআইডি) এই চক্রের সন্ধান পায় উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়ায়। ঘটনার সঙ্গে মছলন্দপুরের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার নাম উঠে আসে। তার পর তদন্তে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, খাস কলকাতার কয়েকটি নার্সিংহোম ও কয়েক জন চিকিৎসকও এই শিশু পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িত।

শুক্রবার কলকাতার দক্ষিণ প্রান্তের ঠাকুরপুকুরে মানসিক প্রতিবন্ধীদের একটি হোম থেকে ১০টি ১০ মাসের শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। মছলন্দপুরের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার অফিসের পেছনে খোলা জায়গায় মাটি খুঁড়ে মিলেছে দু’টি শিশুর দেহাবশেষ ও হাড়গোড়। এর আগে বাদুড়িয়ার একটি নার্সিংহোম থেকে তিনটি শিশু উদ্ধার করা হয়।

শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা দেশের মধ্যে নয়, সদ্যোজাতদের বিক্রি করে দেওয়া হতো বিদেশেও। শিশু বিক্রির আস্তানাগুলোর অন্যতম কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের শ্রীকৃষ্ণ নার্সিংহোমের কর্ণধার পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে মিলেছে প্রচুর বিদেশি মুদ্রা। ২০০০ ইউরো, ১০৬০ মার্কিন ডলার, ২০০ হংকং ডলার, ১০ গ্রাম ওজনের ১০টি সোনার কয়েন এবং লক্ষাধিক টাকার গয়না।

সিআইডির শীর্ষ কর্মকর্তা, অতিরিক্ত ডিরেক্টর জেনারেল রাজেশ কুমার বলেন, ‘পার্থ চট্টোপাধ্যায় শিশু বিক্রি করে ওই আয় করেছিলেন।’ তার বক্তব্য, ‘আরও কয়েকটি নার্সিংহোম ও লোকজনের নাম এই ঘটনায় উঠে এসেছে।’

সিআইডির একটি সূত্রের খবর,অপরাধীচক্র সদ্যোজাত কোনও শিশুকে পাশ্চাত্য দেশে পাচারের সময়ে, অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে প্রথমে বাংলাদেশে ঢোকে। সেখানে ভুয়া নামে পাসপোর্ট-ভিসা করায়,কিংবা সে দেশের কোনও নাগরিককে ব্যবহার করে শিশুটিকে  পশ্চিমা কোনও দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

সিআইডির এক তদন্তকারী অফিসার বলেন,‘‘অন্য যেসব শিশুকে ইউরোপ-আমেরিকায় পাচার করা হয়েছে, তাদের বেবি পাসপোর্ট করিয়ে, সরাসরি এই রাজ্য থেকেই রওনা হয়েছিল পাচারকারীরা। কিন্তু ওই শিশুটিকে পাচার করার সময়ে বোধহয় কোনও সমস্যা হয়েছিল।’ সিআইডির ডিআইজি ভরতলাল মিনা বলেন, ‘এ ব্যাপারে নিশ্চিত তথ্য পেলে নিশ্চয়ই সেটা জানানো হবে।’

গোয়েন্দারা এখনও পর্যন্ত যেটুকু জানতে পেরেছেন, উদ্ধার করা শিশুদের কিন্তু চুরি করা হয়নি। কখনও প্রসবের পর প্রসূতিকে মিথ্যে করে বলা হতো, তিনি মৃত সন্তান প্রসব করেছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শোকে-হতাশায় মৃত সন্তানকে দেখতে চাইতেন না প্রসূতি বা তার স্বজনরা।  সেই সুযোগেই হতো শিশু পাচার। আবার কখনও কুমারী মা বা দেরিতে গর্ভপাত করাতে আসা কোনও বিবাহিত মহিলার প্রি ম্যাচিওরড ডেলিভারি করিয়ে, শিশুকে ইনকিউবেটরে দীর্ঘ দিন রেখে সুস্থ করে তুলে বিক্রি করা হতো। এখানেই আসছে চিকিৎসকদের ভূমিকার কথা। চিকিৎসকেরা, বিশেষ করে স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ কিংবা শিশু চিকিৎসক জড়িত না থাকলে, এই চক্র চালানো মুশকিল। ৬০ বছরের এক চিকিৎসককে যে কারণে গ্রেফতার করেছেন গোয়েন্দারা।

তদন্তে জানা গেছে, কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা দালালের কাজ করত। তাদের কাছেই থাকত ডেটা বা তথ্যপঞ্জি, যেখানে  সন্তান দত্তক নিতে মরিয়া দেশি-বিদেশি দম্পতিদের তালিকা ও তাদের বিস্তারিত বিবরণ লেখা থাকে।

এখনও পর্যন্ত এই ঘটনায় ১৬ জনকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি। তবে তদন্তকারীরা জানাচ্ছেন, এটা শুরুর শুরু, গ্রেফতারের সংখ্যাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, গোয়েন্দারাও সেটা আন্দাজ করতে পারছেন না।

সূত্র : বাংলাট্রিবিউন

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY