গুলশানের নিরাপত্তা ‘আইওয়াশ’

0
142

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: নিরাপত্তার চাদরে রাজধানী থেকে গুলশানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হলেও সেটিকে কেবল ‘আইওয়াশ’ বলছেন খোদ পুলিশ কর্মকর্তা। জুলাইয়ে হলি আর্টিজান হামলার পর এ এলাকার নিরাপত্তা বাড়াতে বাইরে থেকে সব ধরনের গণপরিবহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাইরে থেকে এ এলাকায় প্রবেশ করলেই অন্যরকম ঢাকা যেখানে কেবল ওই এলাকার জন্য একেবারে আলাদা গণপরিবহন ও নম্বর দেওয়া রিকশা। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হচ্ছে না।

একদিকে নিরাপত্তার নামে সুনির্দিষ্ট ২০টি এসি বাস ও ৫০০টি হলুদ রঙের রিকশাই যাতায়াতের একমাত্র ভরসা। অন্যদিকে সন্ধ্যা নামলেই আগের মতো ছিনতাই, গভীর রাতে বিত্তবানদের গাড়ি ও মোটরবাইক চালনা প্রতিযোগিতা। তারওপর বাসাবাড়িতে দেখা দিয়েছে নতুন সংকট। লেকের ওপারে কড়াইল বস্তি থেকে ছোট ছোট নৌকা চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় এ এলাকায় গৃহকর্মীদের পেছনে খরচ দ্বিগুণ হতে চলেছে বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের।

গত ১০ আগস্ট রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকা গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতনের নিরাপত্তার স্বার্থে চালু হয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এসি বাস সার্ভিস ‘ঢাকা চাকা’ এবং বিশেষ রঙের রিকশা। গুলশান দুই ও এক নম্বর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রয়োজন ও যাত্রীদের তুলনায় বাস ও রিকশার সংখ্যা নগন্য। ফলে গুলশানের ভেতরে যাতায়াত করা যেমন কঠিন হয়ে পড়েছে একইভাবে বাইরে থেকে এ এলাকায় প্রবেশ করা যাত্রীদেরও রোজকার ভোগান্তিও পৌঁছেচে চরমে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে গাড়ি পাচ্ছেন না যাত্রীরা।  রিকশার দেখা পাওয়াও ভার। পেলেও ভাড়া দ্বিগুণেরও বেশি। এলাকাবাসী বলছেন, এই ভোগান্তি বাইরে থেকে আসা মানুষের কিন্তু ভেতরের মানুষের ভোগান্তি আরও বেশি।

বেসরকারি চাকরি করা ফারহানা আলম বলেন, ‘নিকেতন থেকে গুলশান ৩৫/এ সড়কে আগস্টের আগে রিকশা ভাড়া ৬০-৭০টাকা থাকলেও এখন তা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। কারণ নিকেতনের রিকশা ডিসিসি মার্কেটের সামনে ছেড়ে দিয়ে রাস্তা পার হয়ে আবারও রিকশা নিতে হয়।’

অফিসে যাওয়ার জন্য রোজকার এই হ্যাপা আর ভাল লাগে না উল্লেখ করে নিকেতন নিবাসী সেলিমা রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গুলশান-১ নম্বর ডিসিসি মার্কেটের পাশের রাস্তায় রিকশা ছেড়ে আরেকটা রিকশা কখন পাব জানি না, একটা রিকশা দেখলে ছুটে যায় দশ-পনেরো জন। আমরা মাঝে মাঝে একই রাস্তা যাব ভেবে যদি শেয়ারে কারো সঙ্গে কিছু রাস্তা যাই রিকশাওয়ালা ৫০টাকা নেন না, দুজনের কাছেই ৫০ করে ১০০ টাকা চেয়ে বসেন।এর একমাত্র কারণ অপ্রতুল রিক্সা। কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ দেখতে পাওয়া যায় বাইরের রিকশা। এগুলো দিনে দেড়শ টাকা দিয়েই বৈধতা পেয়ে যাচ্ছে। তাহলে কিসের নিরাপত্তা?’

এতকিছুর পরও সব মেনে নিতে পারতেন যদি নিজেদের মধ্যে নিরাপত্তা বোধ তৈরি হতো বলে উল্লেখ করেন গুলশান-২  নিবাসী নুজহাত হোসেন (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, ‘রাত হলেই একটু নিরিবিলি সড়কগুলোতে বিকট শব্দে চলে মোটরবাইক। সন্ধ্যার পর থেকেই লেকের আশেপাশের কোনও সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া চলার উপায় নেই। এসব নিয়ে কেউ কথা বলবে না। আমি বলছি জানলেও কী ক্ষতি হয় কে জানে।’

বুধবার গুলশান ও নিকেতন এলাকার একাধিক বাসায় গিয়ে বাসিন্দাদের মধ্যেও চাপা ক্ষোভ দেখা যায়। তারা বলছেন, নিরাপত্তার নামে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব পড়লেও বিত্তবানদের সন্তানদের গাড়ি হাঁকানো বন্ধ হয়নি। এই   আবাসিক এলাকায় কতরকমের বাণিজ্য চলে, সেগুলো কমেনি। কেবল আমরা যারা নিরীহ জীবন যাপন করি দৃশ্যত তাদের ওপরই বিভিন্ন প্রভাব পড়ছে।

গুলশান-২ এর বাসিন্দা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাহিয়ান চৌধুরী বলেন, ‘আমার বাসার সামনে দিয়ে রাতে যখন গাড়ি চলে তখন বুঝতে পারি না সারাদিন নিরাপত্তার নামে যে হয়রানিগুলো মানুষকে পোহাতে হয় সেগুলো আসলে কী কাজে লাগছে। থানায় ফোন করে অভিযোগ করেছেন কিনা প্রশ্নের জবাবে তিনি পাল্টা প্রশ্ন বলেন, আমি থানায় বলে বিপদে পড়ব কিনা সেই গ্যারান্টি আমাকে কে দিবে?’.

গুলশান

কড়াইল বস্তি থেকে গুলশানের যোগাযোগে ছোট ছোট তরি নৌকা চলাচল ছিল। হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর সেই নৌকাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর বিপরীতে চলাচল শুরু করেছে ভাসমান এক আজব যান যার নাম এলাকাবাসী দিয়েছে ‘বেলুন নৌকা’। বনানী ১১ নম্বর ও গুলশান লিংক ব্রিজের পাশে দিয়ে এসব ভাসমান যান চলাচল দেখা যায়। কড়াইল বস্তির জেবুন্নেসা কাজ করতেন গুলশান ১৭৯ নম্বর সড়কে। তিনি আগামী মাস থেকে সবগুলো বাসাবাড়িতে কাজের দাম পাঁচশ টাকা বাড়িতে দিতে বলেছেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এলাকায় গিয়ে একসঙ্গে আমাকে কয়েক বাসায় কাজ করতে হয়।এই বেলুন নৌকায় মাত্র ৬-৭জন মানুষ ধরে একবারে। সকালে পার হতে গেলে আধাঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এখন ঘুরে রিকশা বা অন্য কোনওভাবে যেতে হলে খরচ বেড়ে যাবে বলে কাজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছি।’

এ বিষয়ে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছিনতাই, মটরবাইক প্রতিযোগিতাসহ যা যা অভিযোগ এলাকাবাসী করছেন তার সত্যতা আছে। এসবই ঘটছে।’

ওসি বলেন, ‘আপনাদের কাছে যেসব তথ্য আছে সেগুলো আমাদেরকে সরবরাহ করলে আমরা ব্যবস্থা নিতে চেষ্টা করব।’

সিরাজুল ইসলাম বলেন, “টকশো বা গণমাধ্যমে যত কথাই আসুক, আসলে নিরাপত্তার বিষয়টি ‘আইওয়াশ’। আমরাও পুরোপুরি কাজ করতে পারছি বলা যাবে না।”

সূত্র : বাংলাট্রিবিউন

pana-final

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY