‘মানসিক চাপ’ কতটা হলে একজন মানুষ ‘আত্মহত্যা’ করতে পারে?

0
302

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: মতিহারের সবুজ চত্বরে নেমে এসেছে কালো অমানিশা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের হাহাকার ছড়িয়ে পড়েছে এ ক্যাম্পাসে। প্রিয় শিক্ষক আকতার জাহান জলিকে এভাবে হারাতে হবে এটা তারা কিছুতেই মানতে পরছেন না।

মতিহারের সবুজ চত্বর ছাপিয়ে শিক্ষার্থীদের এ হারানোর বেদনা ছড়িয়ে পড়ছে সামজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও। শিক্ষার্থীরা নিজেদের হারানোর বেদনা আর প্রিয় শিক্ষকের সঙ্গে স্মৃতিগুলো ফেসবুকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

আকতার জাহানের মাস্টার্সের ছাত্র মাহবুব আলম। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আপনি তো অনেক যত্ন করেই রিপোর্টিং শেখাতেন ম্যাম। তারপরও কেন আজ আপনার রিপোর্ট লিখতে গিয়ে হাতটা কাঁপছিল, কেন সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছিল? রিপোর্টিং শিখিয়ে কী আজ সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটা নিলেন আপনি?’

মাহবুব আরও লিখেন, ‘পরীক্ষার হলে তো এসে বলতেন, ‘মাহবুব, পরীক্ষা কেমন হচ্ছে?’ আজ কেন জিজ্ঞেস করলেন না ম্যাম? কেন শিখিয়ে গেলেন না ‘মানসিক চাপ’ কতটা হলে একজন মানুষ ‘আত্মহত্যা’ করতে পারে? সেই মানসিক চাপটা কিভাবে বর্ণনা করতে হয়?

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মেহেরুল হাসান সুজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘পরীক্ষার হলে যতোবারই ম্যাডাম পরিদর্শক হিসেবে থাকতেন, অতিরিক্ত খাতা আনতে গেলেই বলতেন, ‘ মেহেরুল, তুমি যেন এখন কোন কাগজে কাজ করছো?’ আমি হাসিমুখে বলতাম। উত্তর শুনে ম্যাডাম হেসে বলতেন, ‘ও, ভুলে যাই শুধু।’

তিনি আরও লিখেন, ‘থার্ড ইয়ারে ম্যাডাম রিপোর্টিং কোর্স পড়াতেন আমাদের। একদিন ম্যাডাম ডেথ রিপোর্টিং পড়াচ্ছিলেন। আমি তখন ব্যাক বেঞ্চে কারও সঙ্গে দুষ্টুমি করে হাসাহাসি করছিলাম। ম্যাডাম টের পেয়ে দাঁড় করালেন। বললেন, ‘আমি ডেথ রিপোর্টিং পড়াচ্ছি, আর তুমি হাসছো!’ আমি বললাম, ‘ম্যাডাম, হাসছি না তো। আমার তো স্মাইলিং ফেস, তাই আপনার হয়তো অমন মনে হয়েছে।’ ম্যাডাম বললেন, ‘ক্লাসে মনোযোগ নেই, ভাইভাতে গিয়ে তো চুপ করে থাকবে। কোনো কিছুর উত্তর দিতে পারবে না। তখন দেখবো তোমার স্মাইলিং ফেস।’

আরেক সাবেক ছাত্র রমজান আলী লিখেছেন, ‘উনি তো বলেছেন কেউ দায়ী না। আমাদের তো নিশ্চিন্ত থাকার কথা! কেন এতো ভাবতে যাচ্ছি, ঠিক হয়েছে কি হয়নি। যারা ভালো থাকার তারা ভালো থাকুক। সবাই ভালোবাসত বলেই সবচেয়ে নির্মম সংবাদটা আমাদের লিখতে হলো। জীবনে যেন আর এমন সংবাদ লিখতে না হয়।’

‘ব্যাচের পর ব্যাচে কতশত জনকে আপনি সংবাদের ‘ইনট্রো’ লেখা শিখিয়েছেন, যত্ন নিয়ে বোঝাতেন শিরোনামের গুরুত্ব। বুঝতে পারছেন কী ম্যাম-আপনার সেই ছাত্রদের আজ আপনাকে নিয়েই করুণ ‘ইনট্রো’ লিখতে হচ্ছে ? বার বার হাত কাঁপছে আপনাকে নিয়ে শিরোনাম করতে?’ এভাবেই নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন দেবাশিষ রায় নামের সাবেক এক শিক্ষার্থী।

আকতার জাহানের বর্তমান শিক্ষার্থী হাসান আদিব লিখেছেন ‘চার বছর ক্লাস করেছি উনার। শ্রেণিকক্ষে বসে মাঝে মাঝে বিরক্ত হতাম! সব ছাত্রীদের তো বটেই, ছাত্রদেরও যে কারও ব্যক্তিগত সমস্যা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন ম্যাডাম। সমাধান করার চেষ্টা করতেন, মানসিকভাবে তাদেরকে সাহস যোগাতেন। মানসিক অশান্তির চূড়ান্ত রূপ ম্যাডাম মনে হয় দেখেছেন! তাই তো কেউ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলে, তার সহযোগিতায় এগিয়ে আসতেন।’

ডি আরাফানিয়া নামের তার এক শিক্ষার্থী লিখেছেন, ‘চুউউউপ! কথা বলিস না !!! ম্যাম ঘুমুচ্ছে! এতদিন বাদে শান্তিতে ঘুমুচ্ছে আজ। আজ থেকে নেই কোন ফিজিক্যাল প্রেশার, নেই কোন মেন্টাল প্রেশার!’

প্রিয় শিক্ষককে হারিয়ে সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা ফেসবুকে এমনভাবেই তাদের হাহাকার ব্যক্ত করেছেন। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি রাজশাহীতে কর্মরত গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীরাও আকতার জাহানকে নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। কেওই এরকম একজন শিক্ষকের এভাবে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরি ভবনের ৩০৩ নম্বর কক্ষে থাকতেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আকতার জাহান জলি। শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে দরজা ভেঙে ওই কক্ষের ভেতর থেকে আকতার জাহানের (৪৫) মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই কক্ষে আকতার জাহানের হাতে লেখা একটা সুইসাইড নোট পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা তিনি আত্মহত্যা করেছেন।

কয়েক বছর আগে একই বিভাগের শিক্ষক তানভীর আহমেদের সঙ্গে বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে আকতার জাহানের। পরে সাবেক স্বামী আরেক শিক্ষককে বিয়ে করে ঘর-সংসার করলেও আকতার জাহান জুবেরি ভবনের ওই কক্ষে একাই থাকতেন।

শিক্ষক আকতার জাহান সুইসাইড নোটে লিখেছেন, ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। শারীরিক, মানসিক চাপের কারণে আত্মহত্যা করলাম। সোয়াদকে (ছেলে) যেন ওর বাবা কোনোভাবেই নিজের হেফাজতে নিতে না পারে। যে বাবা সন্তানের গলায় ছুরি ধরতে পারে- সে যে কোনো সময় সন্তানকে মেরে ফেলতে পারে বা মরতে বাধ্য করতে পারে।’

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY