রাজশাহীতে রাসেল ভাইপারের কামড়ে ১০ জনের মৃত্যু

0
590

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: বিষধর সাপ রাশেল ভাইপার আতঙ্কে ভূগছেন রাজশাহীর পবা ও গোদাগাড়ী উপজেলার পদ্মা নদীর তীরবর্তি এলাকার মানুষরা। গত দুই মাসে এ সাপের কামড়ে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও সাপের কামড়ে আহত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে আরো দুজন। অন্যদিকে প্রায় প্রতিদিন গড়ে ২০-২৫টি সাপ মারা পড়ছে স্থানীয়দের হাতে।

এ নিয়ে এ দুটি উপজেলায় ব্যাপক হারে রাসেল ভাইপার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দিনের বেলা অনেকেই মাঠে-বা বিলের জমিতে কাজ করতে যেতেও ভয় পাচ্ছেন। আবার রাতের বেলাতে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে বা ঘরে বিছানায় ঘুমাতে যেতেও ভয় পাচ্ছেন।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গোদাগাড়ীর বেনাবোনা এলাকার জিয়ারুল ইসলাম (১৯) ‘মিরর বাংলা নিউজ’ কে জানান, তিনি গত ২৮ আগস্ট দোকানে ব্যবসা শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। এসময় বাড়ির কাছে আসামাত্র তাঁকে একটি সাপে কামড় দেয়।

পরে তাঁর চিৎকারে আশেপাশের লোকজন দ্রুত ছুটে এসে সাপটিকে লাঠি দিয়ে আঘাত করে ধরে ফেলে। পরে সাপসহ আহত জিয়ারুলকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেই থেকে জিয়ারুল এখন রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, জিয়ারুল ২৫ নম্বর বেডে শুয়ে আছেন। তার আশে-পাশে বসে আছেন পরিবারের লোকজন। একই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি চলে গেছে শিহাব উদ্দিন নামের আরেক কিশোর। দুজনের অবস্থায় শঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান খলিলুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘দ্রুত রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার কারণে বিষ গোটা শরীরে ছড়াতে পারেনি। সেইসঙ্গে সাপটিকেও চিহ্নিত করার কারণে রোগীর চিকিৎসা দিতেও তেমন কোনো অসুবিধা হয়নি। ফলে বিপদমুক্ত হয়েছে তারা। তবে বিষধর এই সাপের কামড়ের কারণে শরীরের বিষক্রিয়া এখনো পুরোপুরো জায়নি। এর পার্শ্বপ্রক্রিয়া হতে পারে বলেও সন্দেহ করা হচ্ছে।’
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ সূত্র জানায়, ২০-২৫ বছর পরে বিলুপ্তপ্রায় এই সাপ রাজশাহী অঞ্চলে ফের দেখা দেয় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। ওইসময় জেলার তানোরের শিবরামপুর গ্রাম থেকে জার্মানির আন্তর্জাতিক বিষ গবেষণা কেন্দ্রের একটি দল পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য দুটি সাপ ধরে নিয়ে যান। আর একটি সাপ রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তৎকালীন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ আজিজুল হক আজাদ নমুনা হিসেবে তাঁর কার্যালয়ে রেখে দেন। এরপর সাপগুলো রাসেল ভাইপার বলে চিহ্নিত করা হয়।
চিকিৎসক আজিজুল হক আজাদ জানান, প্রায় ২৫ বছর পর এই সাপ আবার দেখা যাচ্ছে। এই সাপে কামড় দিলে দ্রুত মানুষের শরীরে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। চিকিৎসা দেওয়ার প্রায় সময় পাওয়া যায় না। এই সাপ দু-তিন ফুট লম্বা হয়। বছরে দুই বার ২০ থেকে ৩০টি ডিম দেয় এরা।
গোদাগাড়ী উপজেলার নিমতলা এলাকার সাইফুল ইসলাম ‘মিরর বাংলা নিউজ’ কে জানান, বর্ষা শুরু হওয়ার পরপরই গত দুই মাসে গোদাগাড়ী ও পাশ্ববর্তি পবা উপজেলা মিলে অন্তত ১০ জন মারা গেছে রাসেল ভাইপারের কামড়ে। দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে নিতে পারায় এক-দুই এবং তিনদিনের মাথায় সাপে কামড়ানো রোগীরা মারা গেছে।
বেনাবোনা এলাকার শামিউল ইসলাম জানান, সুস্ক মৌসুমে সাপগুলো সাধারণত পদ্মার চরে বার জমিতে বিলের মধ্যে থাকে। কিন্তু বর্ষা আসার সঙ্গে এরা আশ্রয় খোঁজার জন্য ওপরে ওঠে আসে। এ কারণে পদ্মায় এবং বিলে পানি জমার ফলে সাপগুলো এখন জনবসতি এলাকায় ঢুকে পড়েছে। বিশেষ করে পদ্মার তীরবর্তি গ্রামগুলোতে এই সাপের ব্যাপক বিচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তিনি আরো জানান, প্রতিদিন পবার বেড়পাড়া, গহমাবনা, গোদাগাড়ীর নিমতলা, বেনাবোনা, আলীপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে গড়ে ২০-২৫টি করে রাসেল ভাইপার স্থানীয়দের হাতে মারা পড়ছে। কিন্তু তারপরেও এই সাপের কামড়ে একের পর এক মানুষ দংশিত হচ্ছেন। অনেকেই মারাও যাচ্ছেন। গত দুই মাসে অন্তত এসব এলাকায় ১০ ব্যক্তি মারা গেছেন বলেও দাবি করেন স্থানীয়রা।
তারা আরো জানান, রাসেল ভাইপারে গত দুই মাসে মারা যাওয়ার মধ্যে একজন নারীও রয়েছেন। তিনি হলেন নেমতলা এলাকার ফারুক হোসেনের স্ত্রী মৌসুমি (২২)। এছাড়াও এ সাপের কামড়ে মারা গেছেন আলীপুর গ্রামের কাওছার আলী (১৮), নিমতলা এলাকার নাইমুর রহমানসহ (৩৫) আরো অন্তত ৭ জন।
এদিকে গোদাগাড়ী উপজেলার নিমতলা এলাকার আরেক বাসীন্দা হযরত আলী ‘মিরর বাংলা নিউজ’ কে বলেন, ‘রাসেল ভাইপার আতঙ্কে দিন কাটাতে হচ্ছে পদ্মা পাড়ের মানুষদের। দিনের বেলা কেউ পদ্মার চরে যেতে সাহস পাচ্ছে না। আবার রাতের বেলা তীরবর্তি এলাকার রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতেও ভয় লাগছে। অনেকই বিছানায় ঘুমাতে যেতেও সাহস পাচ্ছে না।’

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY