রাতের রামেক হাসপাতাল দালালদের আস্থানা

0
288

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক:  দিনের বেলায় মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদের আধিপত্য আর রাতে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ফার্মেসির দালালদের প্রতারণা। এই উভয়সঙ্কটে বিপর্যস্ত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগী ও তার স্বজনরা।

দিনের বেলায় হাসপাতালের বহির্বিভাগে ওষুধ কোম্পানির লোকজনদের উপস্থিতি বেড়ে যায়। রোগীরা ডাক্তারের জন্য নির্ধারিত কক্ষ থেকে বের হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর প্রেসক্রিপশন নিয়ে ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলে।

অনেক সময় রোগীদের দাঁড়ানো লম্বা সারি থাকা সত্ত্বেও রিপ্রেজেনটেটিভরা ডাক্তারের কক্ষে ঢুকে পড়ে। এতে বিড়ম্বনার শিকার হন রোগীরা। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ডাক্তারের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য রিপ্রেজেনটেটিভদের নির্দিষ্ট সময় দেওয়া আছে। কিন্তু রিপ্রেজেনটেটিভরা সেই সময়ের বাইরেও ডাক্তারদের সঙ্গে দেখা করেন।

আর রাতে দালালরা রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে নির্দিষ্ট ওষুধের দোকান থেকে উচ্চ মূল্যে ওষুধ কিনে এনে দেয়। রোগীরা না চাইলে তারা নিজেদের হাসপাতালের স্টাফ পরিচয় দিয়ে রোগীর স্বজনদের প্রতারণা করে ফার্মেসির কাছ থেকে কমিশন নিয়ে রোগীদের কাছ থেকে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে প্রতিটি ওয়ার্ডের বয় ও আয়াদের। তারাই ডাক্তারদের কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে গিয়ে দালালদের দেয়।

এরই প্রেক্ষিতে গত কয়েকদিনে সাত জন দালালকে আটক করেছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্বরত পুলিশরা। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার রামেকের বহির্বিভাগ থেকে মহিলাসহ দুই দালালকে আটক করে পুলিশ। আটককৃতরা হলেন, নগরীর রাজপাড়া থানার আলিগঞ্জ এলাকার শাহাদতের স্ত্রী তহমিনা (৩৫) ও  কোর্ট স্টেশন এলাকার মৃত শামসুলের ছেলে রবিউল ইসলাম (৩০)। এর আগে গত ২৬ জুন রোববার হাসপাতাল থেকে ৪ জন দালালকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। তখন এদের প্রত্যেককে ৩ দিন করে বিনাশ্রম কারাদ- দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। কারাদ-প্রাপ্তরা হলো, নগরীর মতিহার থানার শ্যামপুর এলাকার ইনছানের ছেলে সুমন হোসেন (২২), গোদাগাড়ীর ভান্ডারিয়া এলাকার প্রফুল্ল রায়ের ছেলে চিরঞ্জিত (১৯), বোয়ালিয়া থানার সিপাইপাড়া এলাকার মালেকের ছেলে সিরাজুম মনির (৩০) ও নগরীর মতিহার থানার কাজলা এলাকার ফরহাদ হোসেন (২২)। এর আগেও হাসপাতাল থেকে বক্স পুলিশের ইনচার্জ এএসআই এনামুল হক সঙ্গীয় ফোর্সসহ কয়েকজনকে হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে আটক করেছিলেন। একইদিন গত কয়েকদিন আগে রোববার দুপুরে হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংক থেকে হৃদয় হোসেন (২২) নামের এক রক্তের দালালকে আটক পুলিশ। আটককৃত দালাল পবা উপজেলার তেঘর এলাকার জসিমের ছেলে। তাদের সবাইকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়।

কিন্তু এতেও কমেনি দালালদের আধিপত্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখকে ফাঁকি দিয়ে হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় ও আয়াদের সহযোগিতায় দালালরা তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

কয়েকদিন আগে রাত প্রায় পৌনে ১২টায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে এসে পৌঁছায় চাঁপানবাবগঞ্জ থেকে মুমূর্ষ শিশু রোগী বহনকৃত একটি মাইক্রোবাস। সঙ্গে আসে রোগীর মা-বাবাসহ আত্মীয়স্বজন। তখন জরুরি বিভাগের ট্রলিম্যানও ওইখানে উপস্থিত ছিলেন। ফার্মেসির একজন দালাল ট্রলি নিয়ে এসে তাকে জরুরি বিভাগের ভেতরে নিয়ে যেতেই ট্রলিওয়ালা এসে উপস্থিত হয়।

তখন ট্রলি ঠেলাওয়ালাকে দেখে দালাল তথ্য কেন্দ্রের রাস্তায় দাঁড়ালেন। জরুরি বিভাগের ডাক্তার রোগীকে দেখে ভর্তি করে হাসপাতালের ২ নম্বর ওয়ার্ডে যেতে বললেন। তথ্য কেন্দ্রের সামনে থেকে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে চলে গেল দালাল। ওয়ার্ডে ভর্তির কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরে প্রেসক্রিপশন রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে নিয়ে দালাল নিচে নেমে আসে। তার পিছু ছুটতে ছুটতে রোগীরে স্বজনও তার সাথে চলে আসে। তখন বাধ্য হয়েই দালালের নির্দিষ্ট ফার্মেসি থেকে তাকে ওষুধ কিনতে হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালে রাতে ৫/৬ জন দালাল কাজ করে। যাদের লক্ষ্মীপুরে অবস্থিত কিছু ফার্মেসির সঙ্গে যোগাযোগ আছে। সেখানে তারা কমিশনের ভিত্তিতে কাজ করে। প্রেসক্রিপশন নিয়ে গেলে  ফার্মেসির মালিকরা রোগীর কাছ থেকে উচ্চ মূল্যে ওষুধের দাম নেয়। দালালদের কাজ হচ্ছে হাসপাতাল থেকে রোগীর লোকজনসহ প্রেসক্রিপশন নিয়ে আসা। এইজন্য দালালরা রাত ১০টার পর থেকে জরুরি বিভাগের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে।

রোগীর স্বজনদের পরিচয় দেয় হাসপাতালের স্টাফ বলে। দালালরা রোগীর স্বজনদের পরিচিত দোকান আছে যেখানে ওষুধের দাম কম নেয় বলে রোগীর স্বজনদের প্রভাবিত করে। অনেকসময় হাসপাতালে চিকিৎসা ভালো হয় না বলে কম খরচে ভালো চিকিৎসা দেওয়া হবে বলে রোগীদের বাইরের ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করায়।

একইভাবে নাটোর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে একজন রোগী আসেন। তাকেও একই কায়দায় জরুরি বিভাগ থেকে ওয়ার্ডে নিয়ে গিয়ে তার প্রেসক্রিপশন নিয়ে ফার্মেসির দোকান থেকে ওষুধ কিনে এনে দেয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা রোগীর বাবা নরেশ বাবু জানায়, ‘লোকটা আমাকে হাসপাতালের স্টাফ বলে ফার্মেসির দোকানে নিয়ে গিয়ে ওষুধ কিনে এনে দেয়। দালালটি আমাকে বলে, আপনার মেয়ের তো ওষুধ লাগবে। আমার পরিচিত দোকান আছে ওখানে বলে কয়ে কম দামে ওষুধ কিনে দেব। তার ওপর আপনি গরিব মানুষ। আমি বলেছিলাম, যে ওষুধ আছে তাতেই চলবে। লাগলে সকালে গিয়ে নিয়ে আসব। কিন্তু সে আমাকে জোর করে তার পরিচিত ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনাতে বাধ্য করে।

এছাড়া হাসপাতালের বহির্বিভাগে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেনটেটিভরা (প্রতিনিধি) রোগীর স্বজনদের নানাভাবে হয়রানি করে। রোগীদের দীর্ঘ সারি থাকা সত্ত্বেও ডাক্তারদের চেম্বারে দেখা করে। এছাড়া রোগীরা ডাক্তারের চেম্বার থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে বের হলে প্রেসক্রিপশন নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করে দেয়। ছবি তোলে। এতে ভোগান্তির শিকার হন চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সপ্তাহে সোম ও বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত হাসাপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের (রিপ্রেজেনটেটিভদের) দেখা করার সময় নির্ধারণ করা রয়েছে। এর বাইরে অন্য কোনো সময় ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করার কোনো নিয়ম নেই। কিন্তু নিয়ম লঙ্ঘন করেই ওষুধ প্রতিনিধিদের চিকিৎমকদের সঙ্গে দেখা করতে দেখা যায়।
হাসপাতালের বর্হিবিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা নওগাঁর এনামুল হক ‘মিরর বাংলা নিউজ’ কে বলেন, ‘অনেকক্ষণ ধরে বাইরে অপেক্ষা করার পর ভেতরে গিয়ে ডাক্তার দেখানোর সুযোগ পেলাম। চেম্বার থেকে বের হতেই ওষুধ কোম্পানির লোকজন প্রেসক্রিপশন নিয়ে ছবি তুলতে লাগলো। কিন্তু পুলিশ আসলে দ্রুত সরে পড়ে রিপ্রেজেনটেটিভরা।

এ বিষয়ে জানতে চেয়ে ফোন দেওয়া হলে হাসপাতালের উপপরিচালক গাজী সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, আমি হাসপাতালে প্রায় রাত ১০ টা পর্যন্ত থাকি। এরপর বাড়িতে চলে আসি। এসময় দালাল ভিড় করলে করতে পারে। তবে দালালদের পেলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া আছে পুলিশ ও আনসারদের।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY