বায়ুদূষণমুক্ত স্বাস্থ্যকর নগরী রাজশাহী

0
341

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: ব্রিটিশ আমল থেকেই রাজশাহীর প্রধান যানবাহন ছিল ঘোড়ার গাড়ী। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেও এই যানবাহণেরই আধিক্য ছিল নগরী ঘিরে। তবে ধিরে ধিরে কমতে থাকে মান্ধাতার আমলের ঘোড়ার গাড়ীর সংখ্যা। বিশজুড়ে যেখানে আধুনিক পরিবহণের পালে হাওয়া পড়ে বিভিন্ন নগরকে করে তুলেছে চাকচিক্যময়। সেখানে রাজশাহীতে এখনো আথুনকি যানের সংখ্যা নেহায়েতই হাতে গোনা।

এগুলোর মধ্যে রয়েছে কিছু অত্যাধুনিক ঢাকা-রাজশাহী রুটের বাস, কিছু সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার-মাইক্রোবাস ও পাজেরো এবং কিছু ব্যক্তি মালিকানাধিন কার-মাইক্রোবাস। আর কিছু ট্রাক। ট্রাকগুলো এখনো দিনের বেলা মূল শহরে নিষিদ্ধ। আর এখানকার নগরবাসীর অন্যতম যানবাহণ হলো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।

এগুলোই এ নগরবাসীর চলাচলের মূল ভরসা। এর ফলে নগরবাসীকে যেমন যানবাহণের কালো ধোয়ায় আচ্ছন্ন হতে হয় না, তেমনি তিলে তিলে সবুজে গড়ে উঠা নগরীতেও প্রাণভরে নিঃশ্বাস পেতে কোনো সমস্যায় পড়তে হয় না এখানকার বাসীন্দাদের। যার পুরস্কার স্বরুপ সারা বিশ্বে  বাতাসে ভাসমান মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর কণা কমিয়ে আনার দিক থেকে পৃথিবীর ১০ শহরের মধ্যে রাজশাহীই প্রথম স্থানটি দখল করে নিয়েছে।
গত দুই বছরে রাজশাহীতে এই সফলতা এলেও এর জন্য আসলে রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও নগরবাসী কাজ করে যাচ্ছেন বছরের পর বছর ধরে। তারই সাফল্য এতোদিনে এসে ধরা দিয়েছে নগরবাসীর হাতের মুঠোই। ফলে সবুজ নগরী এখন বায়ু দূষণরোধের সেরা নগরী। বলা যায় রাজশাহী নগরীর বাতাসই এখন সারা বিশ্বের নগরীগুলোর মধ্যে সেরা বাতাস। জাতিসংঘের তথ্যের ভিত্তিতে দ্য গার্ডিয়ান গত শুক্রবার (১৭ জুন) এমনই একটি তথ্য প্রকাশ করে সারা বিশ্বকে চমকে দেয়।
দ্যা গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাতাসে ১০ মাইক্রোমিটার ব্যাসের যে ক্ষতিকর কণা ভেসে বেড়ায়-তা ২০১৪ সালে রাজশাহীর বাতাসে প্রতি বর্গ মাইলে ছিল ১৯৫ মাইক্রোগাম। গত দুই বছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৩ দশমিক ৯। প্রায় দুই তৃতীয়াংশ ক্ষতির কণা হ্রাসের হার প্রথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। আবার ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার ব্যাচের ৭০ থেকে ৩৭ মাইক্রোগ্রামে নেমে এসেছে।
প্রতিবেদনের ভারতের তিনটি, চীনের দুইটি ও ইরান, জর্ডান, ম্যাক্সিকো ও বাংলাদেশের রাজশাহীর শহরের বাতাসের মধ্যে জাতিসংঘের জরিপ থেকে নেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দ্যগার্ডিয়ান এ তথ্য তুলে ধরে।
রাজশাহী নগরীর এমন সফলতার পেছনে যারা নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন-তাদের মধ্যে একজন হলেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলম। বুধবার দুপুরে কথা হয় এ মানুষটির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘নিরমল বাতাসের নগরীতে পরিণত করতে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি এ নগরবাসীরও অক্রান্ত পরিশ্রম রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে নানামুখি কার্যক্রমের ফলেই আজ রাজশাহী বায়ু দূষণরোধে অন্যতম নগরীতে পরিণত হয়েছে।’
তিনি বলেন, এর জন্য অন্তত ২০০৯ সাল থেকেই রাজশাহী নগরী কাজ করে যাচ্ছে। ওই সময় থেকে জিরো সয়ের প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন। যে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো নগরীর কোথাও খালি জায়গা থাকবে না। সেখানে হয় ঘাস দিয়ে নয় তো গাছ দিয়ে এক কথায় সবুজে ঢেঁকে দেওয়া হবে। আর সেটিই করে আসা হচ্ছে এখন পর্যন্ত। এর ফলে ক্রমেই সবুজ নগরীতে পরিণত হয়েছে রাজশাহী। রাজশাহীর কোথাও আর খালি মাটি বা ফাঁকা পড়ে নাই। সবস্থানেই ঘাস অথবা গাছ-পালা বা ফুলের গাছ রয়েছে।
তিনি আরো জানান, নগরীর আইল্যান্ড রাস্তার ধারের ফুপটাতেও রয়েছে হাজার রকমের গাছ-পালা। দুই লেনের রাস্তাগুলো করা হচ্ছে চার লেনে। এতে করে ফাঁকা জায়গা পড়ে থাকছে না। গত ১০ বছরে অন্তত ১৫ কিলোমিটার ফুটপাত নির্মাণ করা হয়েছে। সেখান দিয়ে মানুষ হেঁটে চলাচল করতে পারছে। রাস্তার ধারে ফুটপাত দিয়ে দিয়ে বাইসাইকেল নির্বিঘ্নে চালানো যায়, এর জন্য সাইকেল লেন তৈরী করা হচ্ছে। এতে মানুষ যানবাহন ছেড়ে সাইকেলে আকৃষ্ট হচ্ছে। বায়ুর ওপর চাপ কমছে। ধুলা-বালিও কম হচ্ছে।
আশরাফুল আলম জানান, নগরীর পদ্মা পাড়ে অবাধে গড়ে উঠা বালুমহলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে করে বাসাতে ধুলা-বালির পরিমাণ কমে গেছে। পদ্মাপাড়কে সবুজায়ন করা হচ্ছে। বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে। সেখানে মানুষ অবসর সময় কাটাতে পারছে। বিনোদনের সুযোগ পাচ্ছে। রাতের আঁধারে নগরীর সব আবজর্ন পরিস্কার করে ভাগাড়ে ফেলা হচ্ছে। এতেও নগরীর বায়ুদূষণের মাত্রা কমে এসেছে।
তিনি আরো জানান, অটোরিকশা নিষিদ্ধ হলেও আমরা রাজশাহীতে সেটা অবাধ করে দিয়েছে। ফলে ডিজেল ও পেট্রল চালিত যানের আধিক্য কমে গেছে। ডিজেল ও পেট্রল চালিত যানের কারণে বাতাস দূষণের পরিমাণ বেশি হয়। কিন্তু অটোরিকশার ফলে দূষণের কোনো সম্ভাবনা থাকে না। বিদ্যুৎ দিয়ে এর ব্যাটারি চার্জ হওয়ার পরে দিনের বেলা সেগুলো রাস্তায় নামে যাত্রী পরিবহণে। এর কারণে ধোয়া সৃষ্টি হয় না।
এর বাইরে নগরবাসী ব্যাপক হারে বনায়নে ঝুঁকে পড়ার কারণটিও রাজশাহীকে বায়ু দূষণরোধে কাজ করেছে। নগরীর আশে-পাশের কৃষি জমিতে ব্যাপক পরিমাণ ফসল উৎপাদন হয় বলে সারা বছর প্রায় জমিগুলো থাকে সবুজে আচ্ছন্ন। ফলে সেটিও বায়ু দূষণরোধে ভ’মিকা রেখেছে বলেও দাবি করেন ওই প্রকৌশলী।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক বলেন, ২০১৩ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশন প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ পদক পেয়েছে। তার আগের তিন বছর বৃক্ষ রোপনে সেরা পদক পেয়েছে। তিনি বলেন, গত ২০ বছরে নগর সবুজায়নে তারা যে কাজ করেছেন তার কারণে নগরের বাতাস নির্মল হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস এর পরিচালক উদ্ভিদবিজ্ঞনী অধ্যাপক এম. মনজুর হোসেন বলেন, রাজশাহীতে ডিজেল চালিত যানবাহণের সংখ্যা খুবই কম। এমনকি পেট্রোল চালিত যানবাহণের সংখ্যাও কম। আবার যাত্রী পরিবহণের জন্য বর্তমান ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার থাকার কারণে ডিজেল চালিত যানবাহন শহরে ব্যবহৃত হচ্ছে না। ফলে রাজশাহীর বাতাসে এই কণা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
মনজুর হোসেন বলেন, ১০ মাইক্রোমিটার অথবা তার চেয়ে কম ব্যাসের যে কণা ভেসে বেড়ায় তা পিএম-১০(পার্টিকুলেট ম্যাটার) নামে পরিচিত। এরা কোনো নির্দিষ্ট উৎস অথবা জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ে। এরা সারাসরি শ্বাসনালি হয়ে ফুসফুসে ঢুকে যায়। মানব দেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তিনি বলেন, ডিজেল চালিত যানবাহন থেকে এই কণা বেশি ছাড়ায়।

 

তিনি বলেন, পিএম-২.৫ ব্যাসের সরু কণা শুধুমাত্র ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপ এর সাহায্যে দেখা যায়। এগুলো মোটরগাড়ি, পাওয়ার প্লান্ট, বাসাবাড়ি কাঠ পোড়ানো দাবানল, কৃষিতে ব্যবহৃত আগুন ও শিল্প প্রক্রিয়ারসহ যে কোনো দহন থেকে ছড়ায়।
রাজশাহী নগরীর পথচারি সুমন হোসেন বলেন, ‘এই নগরীর সবুজের নগরী। এখানকার বাতাস নির্মল। বুকভরে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া যায়। পদ্মার বুকে বসে বুক ভরে শ্বাস নিলে প্রাণটা জুড়ে যায়। এ নগরীতে বায়ুদূষণের পরিশাণ খুবই কম। তবে এটি আমাদের ধরে রাখতে হবে। এর জন্য সকলকেই কাজ করতে হবে।’
নগরীর কাদিরগঞ্জের বাসীন্দা মজিবুর রহমান বলেন, রাজশাহীর মানুষ বৃক্ষপ্রেমী। এখানকার সবাই বৃক্ষকে ভালবাসে। ফলে বাড়ির ছাদ থেকে শুরু করে বাড়ির আশে-পাশে ফাঁকা জায়গা, রাস্তা-ঘাট সবখানেই দেখা মেলে সবুজের সমারোহের। যা নগরীকে করে তুলেছে একটি বায়ুদূষণমুক্ত নগরী।

 

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY