ক্রসফায়ারেই সমাধান ?

0
269

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: মাদারীপুরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সন্দেহভাজন জঙ্গি গোলাম ফয়জুল্লাহ ফাহিম নিহত হওয়ার ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই ঢাকায়ও একই ঘটনা ঘটল। গতকাল রোববার ভোররাতে ঢাকায় নিহত শরিফুল ওরফে সাকিব লেখক অভিজিৎ রায়সহ অন্তত সাতটি খুনে জড়িত ছিলেন বলে দাবি পুলিশের।
এ নিয়ে চলতি মাসে সন্দেহভাজন সাত জঙ্গিসহ ১৪ জন নিহত হয়েছে কথিত বন্দুকযুদ্ধে। তাদের যথাযথ তদন্ত ও বিচারের আওতায় না এনে বন্দুকযুদ্ধের মুখে পাঠানো নিয়ে সব মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান  বলেন, ২৪ ঘণ্টায় দ্বিতীয় যে ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটল, এর সঙ্গে কারা আছেন, কার নির্দেশে এটি হলো—এগুলো নিয়ে পূর্ণ তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ভাষ্য, অভিযানের সময় বন্দুকযুদ্ধে এসব জঙ্গির সহযোগীরাই তাদের হত্যা করছে।
সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে খোঁজ করে জানা গেছে, সাম্প্রতিক হামলা ও হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে ‘ক্রসফায়ারকেই’ জঙ্গি সংকট সমাধানের উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার জঙ্গিদের বিষয়ে আর বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় যেতে চাইছে না।
সরকারের দায়িত্বশীল এক ব্যক্তি গতকাল বলেন, এসব জঙ্গি ধরে বাস্তবে খুব বেশি তথ্য মিলছে না। তাদের কারাগারে পাঠানো হলে পরে জামিনে বেরিয়ে আবার নাশকতায় যুক্ত হয়। তবে সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের কয়েকজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, বিচারব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে ‘ক্রসফায়ারের’ মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চিন্তাকে তাঁরা সমর্থন করেন না। তবে তাঁরা গণমাধ্যমে এ নিয়ে পরিচয় প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি হননি।
এরই মধ্যে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গত শুক্রবার নিজ নির্বাচনী এলাকা আখাউড়ায় এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেছেন, জঙ্গি কর্মকাণ্ডের বিচার দেশের প্রচলিত আইনেই সম্ভব।
সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, সন্দেহভাজন এসব জঙ্গিকে বাঁচিয়ে রাখলে দেশব্যাপী বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে বের করতে তারা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারত। কিন্তু তাদের কথিত বন্দুকযুদ্ধের মুখে ফেলে জঙ্গিবাদের মূল পর্যন্ত পৌঁছানোর পথটি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
অভিধানে বন্দুকযুদ্ধের সংজ্ঞা হচ্ছে, দুটি পক্ষের পরস্পরের দিকে গুলি ছোড়া। আর ক্রসফায়ার হচ্ছে, দুটি পক্ষের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে হতাহত হওয়া। কিন্তু বাংলাদেশে প্রচলিত ধারণায় ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধ শব্দ দুটিকে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হেফাজতে হত্যার সমার্থক হিসেবেই ধরা যায়।
অবশ্য দেশে ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু ব্যাপকভাবে এর চর্চা শুরু হয় ২০০৪ সালে বিএনপি সরকার আমলে। তখন থেকেই এটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং দেশি–বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো এর প্রতিবাদ জানিয়েছে আসছে। গত এক যুগের ইতিহাসে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে সরকারগুলো ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ বিভিন্ন সংকটের সমাধান খুঁজেছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, বিএনপির নেতৃত্বাধীন তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের শেষ তিন বছরে কথিত ক্রসফায়ারে ৭৪৬ জন সন্দেহভাজন অপরাধী নিহত হয়। তখন বিএনপির নেতা-মন্ত্রীরা এর পক্ষে আর আওয়ামী লীগের নেতারা এর বিপক্ষে কথা বলতেন। এখন পরিস্থিতি উল্টে গেছে।
২০০৭ ও ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে ক্রসফায়ার কমে দাঁড়ায় ২৫৬তে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রথম চার বছরে একইভাবে ‘ক্রসফায়ারে’ ৩৩৮ জন সন্দেহভাজন নিহত হয়। এ সময়গুলোতে বেড়ে যায় গুম ও গুপ্তহত্যার ঘটনাও। গুম ও গুপ্তহত্যার শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের স্বজনেরা নিখোঁজ হয়েছে, পরে কারও কারও লাশ মিলেছে।
অথচ ২০০৮ সালে নির্বাচনী ইশতেহারে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের কথা বলে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু ‘ক্রসফায়ার’, ‘বন্দুকযুদ্ধ’ তো বন্ধ হয়ইনি, সঙ্গে যোগ হয় ‘গুম-গুপ্তহত্যা’। আসকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ সালে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ৪৩ জন। কিন্তু এ বছর বিরোধী দলের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে সহিংসতা-সংঘর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে নিহত হয় আরও ১৭৯ জন।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের ইশতেহার থেকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’র প্রসঙ্গটি বাদই পড়ে যায়। আসকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ১২৮ জন, ২০১৫ সালে ১৪৬ জন কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে নিহত হয়। আর চলতি বছরের গতকাল (১৯ জুন) পর্যন্ত ৫৯ জন নিহত হয়। তাদের মধ্যে ১১ জন আইনগতভাবে গ্রেপ্তারের পর হেফাজতে থাকা অবস্থায় নিহত হয়।
তবে ধর্মের নামে জঙ্গি তৎপরতায় সন্দেহভাজনদের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার ঘটনা শুরু হয় গত ২৪ নভেম্বর। ওই দিন রাতে ঢাকায় কথিত বন্দুকযুদ্ধে এক জেএমবি সদস্য, এরপর ১৩ জানুয়ারি আরও দুই জেএমবি সদস্য নিহত হয়। পুলিশের দাবি, তারা সবাই পুলিশ হত্যা এবং গত অক্টোবরে হোসেনি দালানে বোমা হামলায় জড়িত ছিল।
৫ জুন চট্টগ্রামে পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রীকে হত্যার পর গত দুই সপ্তাহে ঢাকা, রাজশাহী, বগুড়া, গাইবান্ধা ও মাদারীপুরে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় আরও সাতজন সন্দেহভাজন জঙ্গি। সব কটি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে প্রায় একই রকম কথা বলা হয়েছে।
এর মধ্যে একমাত্র মাদারীপুরে কলেজশিক্ষক রিপন চক্রবর্তীকে কুপিয়ে পালানোর সময় জনতার হাতে ধরা পড়েন ফাহিম (১৯)। তিনি চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। মাদারীপুরের পুলিশ সুপারের ভাষ্য, ফাহিম হিযবুত তাহ্রীরের সদস্য বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন। আর প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ফাহিম শিবিরের সদস্য।
হাতেনাতে ধরা পড়া এই তরুণকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার পর প্রথম দিন সকালেই কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। এর মধ্য দিয়ে তাঁর কাছ থেকে আরও তথ্য পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেল কি না, সে প্রশ্ন ব্যাপকভাবে উঠেছে। এরপর ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই গতকাল ভোরে ঢাকার খিলগাঁওয়ে গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে একই রকম বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন শরিফুল ওরফে সাকিব, যাঁকে ধরতে গত ১৯ মে পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ গণমাধ্যমে তাঁর ছবি প্রকাশ করে। পুলিশ দাবি করছে, নিহত শরিফ লেখক অভিজিৎ রায়সহ অন্তত সাতটি হত্যা ও হামলার ঘটনায় জড়িত। তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সামরিক ও আইটি শাখার প্রধান ছিলেন।
ডিবির উপকমিশনার (দক্ষিণ) মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া পুরস্কার ঘোষিত জঙ্গি সুমন হোসেন পাটোয়ারীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। এর অংশ হিসেবে গতকাল ভোররাতে খিলগাঁও এলাকায় অভিযানে যায় ডিবি। এ সময় সন্দেহভাজন তিন যুবকের সঙ্গে ডিবির গুলিবিনিময় হয়। এতে একজন নিহত হন। তবে বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ার নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বহুল ব্যবহৃত এই বক্তব্য মানবাধিকারকর্মীসহ সচেতন নাগরিকেরা বিশ্বাস করেন না।
মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল  বলেন, এসব সন্দেহভাজন অপরাধীকে ধরে বিচারে দিলে কোনো লাভ হতো না, কোনো সাক্ষী আসত না—এসব কথা বলা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র যে নিজেই বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থাহীন, সে বার্তাই মানুষের কাছে যাচ্ছে। এর ফলে মানুষও বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাচ্ছে।

সূত্র: প্রথম আলো

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY