তদন্তে পুলিশের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে সিআইডি

0
234

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের কিশোর শামছুদ্দিন মিলনকে (১৬) ‘ডাকাত সাজিয়ে’ পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় চার পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে সিআইডি। ঘটনার ভিডিওচিত্র, ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা ব্যক্তিদের সাক্ষ্য এবং আদালতে দেওয়া এক আসামির জবানবন্দিতে পুলিশের জড়িত থাকার বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে বলে সিআইডির (পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ) নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়।
গত বছরের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে নোয়াখালী জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি, ডিবি) আতাউর রহমান ভূঁইয়া মিলন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শনাক্ত হওয়া চার পুলিশ সদস্যসহ ৩১ আসামির সবাইকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন। তিনি এ মামলার দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন। এ নিয়ে ওই বছরের ২৭ জুলাই ‘বিচার মাটিচাপা দিল পুলিশ’ শিরোনামে প্রথম আলোয় প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। পরে ৫ নভেম্বর নোয়াখালীর ২ নম্বর আমলি আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম ফারহানা ভূঁইয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ না করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন।
এখন মামলাটি তদন্ত করছেন নোয়াখালী জেলা সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার জালাল উদ্দিন আহম্মদ। আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হতে পারে বলে তিনি জানান।
২০১১ সালের ২৭ জুলাই কোম্পানীগঞ্জের চরকাঁকড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা কিশোর মিলনকে ডাকাত সাজিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ গাড়িতে করে এনে উন্মত্ত জনতার হাতে এই কিশোরকে ছেড়ে দেয়। সেখানে পুলিশের উপস্থিতিতেই তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যায়। পুলিশের গাড়ি থেকে তাকে নামিয়ে দেওয়াসহ পুরো ঘটনাটির ভিডিওচিত্র প্রকাশিত হলে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে প্রশাসনসহ সাধারণ মানুষ।
এ ঘটনার পর ২০১১ সালের ৩ আগস্ট মিলনের মা কোহিনুর বেগম বাদী হয়ে নোয়াখালীর ২ নম্বর আমলি আদালতে মামলা করেন। আদালতের নির্দেশে ওই বছরের ৮ আগস্ট কোম্পানীগঞ্জ থানার পুলিশ এটিকে নিয়মিত মামলা হিসেবে গ্রহণ করে। প্রথমে এ মামলার তদন্ত করে থানার পুলিশ। পরে মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় নোয়াখালী জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি)।
গত বছরের জুলাই মাসে আদালতে দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বাদী মামলা চালাতে চান না বলে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি ‘এজাহারে বর্ণিত ঘটনা সত্য বলিয়া প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হইলেও কে বা কাহারা উক্ত ঘটনা করিয়াছে, উহা প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত সুনির্দিষ্ট কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় ভবিষ্যতে মামলা প্রমাণ করার মতো সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা হইবে’ বলেও উল্লেখ করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা ভিডিওচিত্র দেখে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হিসেবে চিহ্নিত ২৭ জন আসামি এবং এ ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের মামলার দায় হতে অব্যাহতির আবেদন করেন। ২৭ জন আসামির মধ্যে একজনের আদালতে জবানবন্দি প্রদানের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। এই মামলার সব আসামি জামিনে রয়েছেন।
পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে মামলাটি আপসরফা করার বিষয়ে মিলনের মা কোহিনুর বেগম তখন প্রথম আলোকে বলেছিলেন, বছরের পর বছর তিনি ছেলে হত্যার বিচারের আশায় আদালতের বারান্দায় ঘুরেছেন। ডিবি পুলিশের কাছে বারবার ধরনা দিয়েছেন। ৫২ বার আদালত থেকে সময় নিয়েও আদালতে অভিযোগপত্র দেয়নি ডিবি পুলিশ। আদালত ও ডিবি পুলিশের কাছে যাতায়াত করতে করতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, কিন্তু বিচার পাননি। পুলিশ মিলনের বাবাকে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর সংসারের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় মিলনের ছোট ভাই সালাউদ্দিন পাভেলকে পুলিশে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেওয়ায় এবং নানামুখী চাপ দেওয়ায় তিনি মামলা নিষ্পত্তিতে রাজি হন।
মিলন হত্যার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা চার পুলিশ সদস্যকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অবশ্য কিছুদিন পর তাঁরা স্বপদে ফিরে যান। অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ইন্সপেক্টর রফিক উল্লা বর্তমানে বান্দরবান সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), এসআই আকরাম উদ্দিন শেখ বাগেরহাটের মোংলা থানায়, কনস্টেবল হেমা রঞ্জন চাকমা হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে ও আবদুর রহিম চৌমুহনী পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত আছেন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY