ব্রডব্যান্ডের সংজ্ঞা বদলায়, হালনাগাদ হয় না নীতিমালা

0
263

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: দেশে জাতীয় ব্রডব্যান্ড নীতিমালা প্রণয়ন করা হয় ২০০৯ সালে। ৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও নীতিমালা হালনাগাদ বা সংশোধন করা হয়নি। নীতিমালায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি তিনটি লক্ষ্য ছিল। সেসবেরও মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৫ সালে। তবে নীতিমালা হালনাগাদ না হলেও এরই মধ্যে ব্রডব্যান্ডের সংজ্ঞা বদলেছে দুবার।

সংজ্ঞা বদলে ৭ বছরে ব্রডব্যান্ডের গতি ১২৮ কেবিপিএস থেকে ৫ এমবিপিএস হলেও নীতিমালা হালনাগাদ না হওয়ায় এর লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং অর্জন নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ না হওয়ায় ‘কোনও ধরনের দিক নির্দশনা’ ছাড়াই স্থিতাবস্থায় রয়েছে জাতীয় ব্রডব্যান্ড নীতিমালা।

নীতিমালা হালনাগাদ কবে হবে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেন, আমরা করে ফেলবো। একটা একটা বিষয় ধরে আমরা কাজ করছি। বিষয়গুলোর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে আমরা অগ্রাধিকার ঠিক করছি। ব্রডব্যান্ড নীতিমালাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ (হালনাগাদ) করা হবে।

প্রশ্ন উঠেছে, ২০০৯ সালে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছিল বর্তমানে সেসব অসার ও গুরুত্বহীন কিনা। দেশে ব্যান্ডউইথের সরবরাহ, ব্যবহার, আমদানি বেড়েছে, বেড়েছে গতি। কিন্তু অবকাঠামোগত সমস্যায় সারাদেশে এর বিতরণ সমানভাবে হয়নি। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পাঠাগার, হাসপাতাল, বিভিন্ন ক্লাবে ব্রডব্যান্ড সরবরাহ করা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। কিন্তু নীতিমালা হালনাগাদ না হওয়ায় অনেক কাজই করা সম্ভব হচ্ছে না।

প্রসঙ্গত, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের ন্যূনতম গতি ১ থেকে বাড়িয়ে ৫ মেগাবাইট করা হয়েছে সম্প্রতি। বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, গত বছর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিসিসি ভবনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ঘোষণা দিয়েছিলেন, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হবে। এর ন্যূনতম গতি হবে ৫ মেগাবাইট পার সেকেন্ড।

টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির চেয়ারম্যান ড. শাহাজাহান মাহমুদ গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে জানিয়েছিলেন, ‘৫ মেগার নিচে ব্রডব্যান্ড নয়’ ঘোষণা আসতে ২-৩ সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। তবে প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম জানিয়েছেন, ন্যূনতম গতি ৫ মেগা করার কাজ শুরু হয়েছে। একবারেইতো বাস্তবায়ন করা যাবে না। কোথাও ২, কোথাও ৩ এমবিপিএস করার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সর্বনিম্ন গতি ৫ এমবিপিএস। তবে ৫ এমবিপিএসের কম গতির ইন্টারনেট সংযোগকে ‘ন্যারোব্যান্ড’ বা ধীরগতির ইন্টারনেট হিসেবে বিবেচনা করবে সরকার। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ বলছে, গ্রাহক পর্যায়ে দ্রুতগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করতেই ব্রডব্যান্ডের সর্বনিম্ন গতি বদলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিটিআরসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে (এপ্রিল মাস পর্যন্ত)  ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৩ লাখ ৪৩ হাজার।ব্রডব্যান্ড২০০৯ সালে প্রণীত জাতীয় ব্রডব্যান্ড নীতিমালায় ব্রডব্যান্ডের সংজ্ঞায় বলা হয়েছিল, ‘যাহার ন্যূনতম গতি হবে ১২৮ কেবিপিএস। এর চেয়ে গতি কম হইলে তাকে বলা হইবে ন্যারোব্যান্ড ইন্টারনেট।’ ২০১৩ সালে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির জারি করা এক নিদের্শনায় নতুন করে ব্রডব্যান্ডের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়। নতুন সংজ্ঞায় বলা হয়, ‘যাহার ন্যূনতম ব্যান্ডউইথ ১ এমবিপিএস (মেগাবাইট পার সেকেন্ড) হইবে। ১ এমবিপিএস হইতে কম ব্যান্ডউইথকে ন্যারোব্যান্ড বলা হইবে।’ ব্যক্তি পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা ২০১৩ সালের মে মাসের ১ তারিখ থেকে এই গতি উপভোগ করছেন। বিটিআরসি একই বছরের এপ্রিলের ১ তারিখে এ বিষয়ে নির্দেশনা জারি করে। ২০১৬ সালে আবারও ব্রডব্যান্ডের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হয়।

দেশে উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান আমাদের গ্রামের প্রকল্প পরিচালক  রেজা সেলিম বলেন, ব্রডব্যান্ডের নীতিমালা হালনাগাদ না হলেও বারবার এর সংজ্ঞা বদলাচ্ছে। ফলে নীতিমালার মূলে হাত পড়ছে না। তিনি  ব্রডব্যান্ড নীতিমালায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদের লক্ষ্য উল্লেখ করে বলেন, এগুলোর খুব কমই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। তিনি মনে করেন, তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক অবকাঠামো তৈরি হলে এগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন, একসেস নেটওয়ার্ক, স্থানীয় কনটেন্ট তৈরি করা গেলে দীর্ঘ মেয়াদে সফলতা আসবে।

তিনি বলেন, ব্রডব্যান্ড পলিসি নতুন করে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কিন্তু প্রথমটিই তো ব্যর্থ।এই নীতিমালা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি), দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র (পিআরএসপি)-এর পরিপূরক ছিল কিন্তু আমরা তার কিছুই করতে পারিনি।

রেজা সেলিম বলেন, নীতিমালার উদ্দেশ্যের ৪.১ অংশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি ভোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী, অত্যাধুনিক ও নির্ভরযোগ্য ব্রডব্যান্ড সেবা নিশ্চিতকরণ। দেশে সরকারি ইন্টারনেট সংযোগ পেতে দীর্ঘসূত্রতা, প্রক্রিয়াগত জটিলতা ও ব্যয়বহুল হওয়ায় তা মোটেও গ্রাহকবান্ধব নয় বলে মন্তব্য করেন রেজা সেলিম।

উদ্দেশ্যয় আরও বলা (৪.৬) হয়েছে, ২০১৫ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ ব্রডব্যান্ড পেনিট্রেশন অর্জন। কিন্তু আইটিইউ ও ইউনেস্কো প্রকাশিত দ্য স্টেট অব ব্রডব্যান্ড-২০১৫ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাসাবাড়িতে ইন্টারনেটের সংযোগ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ১০১তম এবং ব্রডব্যান্ড পেনিট্রেশন (ব্যবহারের হার) ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

ব্রডব্যান্ড পেনিট্রেশন লক্ষ্যমাত্রার স্বল্পমেয়াদে (২০১০) বলা হয়েছে, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সব বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল ও প্রকৌশল কলেজ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ব্রডব্যান্ড সংযোগ নিশ্চিতকরণ। যা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।

নীতিমালায় মধ্যমেয়াদি (২০১২ সালের মধ্যে) লক্ষ্যে বলা হয়েছে, ১০ শতাংশ গ্রামকে ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্কের আওতায় আনা। অথচ ২০১৫ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশের ব্রডব্যান্ড ব্যবহারের হার মাত্র ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। সব ইউনিয়ন পরিষদ ভবনকে ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্কের আওতায় আনার কথা থাকলেও ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলোতে (ইউডিসি) এখনও ব্রডব্যান্ড সংযোগ পৌঁছেনি। জানা গেছে, এসব সেন্টারে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার হয় মডেমের মাধ্যমে। দেশের সব কৃষি বাজারকে নেটওয়ার্কের আওতায় আনার কথা থাকলেও তা এখনও হয়নি। ব্যর্থ হয়েছে কমিউনিটি একসেস পয়েন্টের মাধ্যমে দেশের সব গ্রামকে ব্রডব্যান্ড সংযোগের আওতাভুক্তকরণ।

নীতিমালায় দীর্ঘ মেয়াদের যেসব লক্ষ্য ২০১৫ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার সাফল্য খুবই কম। যদিও এরই মধ্যে মেয়াদ শেষ হয়েছে।

নীতিমালায় (স্বল্প মেয়াদে) লোকাল কনটেন্ট ডেভেলপমেন্টের বিষয়ে বলা হয়েছে সব সরকারি সংস্থাগুলোর নিজস্ব ওয়েবসাইট থাকবে যা নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে। এই বিষয়টির বিপুল উন্নতি হয়েছে। যদিও ২০১০ সালের মধ্যে ওয়েবসাইট করার কথা থাকলেও ওয়েবসাইট (২৫ হাজার ওয়েবসাইটের পোর্টাল) চালু হয় ২০১৪ সালের ২৩ জুন। স্থানীয় কনটেন্ট তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। তবে হতাশার কথা হলো দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অনলাইন ব্যাংকিং সুবিধা চালু করার কথা থাকলেও এখনও তা হয়নি।

হালনাগাদের বিষয়ে দেশের সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, অল্প অল্প কাজ হচ্ছে। কিন্তু নীতিমালা কবে নাগাদ হালনাগাদ হবে সে বিষয়ে কোনও স্পষ্ট তথ্য নেই। ইন্টারনেট সেবাদাতাগুলোর সংগঠন আইএসপিএবির সভাপতি এম এ হাকিম বলেন, আইএসপি নীতিমালা হচ্ছে। খসড়া নীতিমালা গণশুনানির পরে আইএসপিএবি মত জানাবে। তাতে ইন্টারনেটের দামের বিষয়টিও স্পষ্ট করা হবে। তারমতে আইএসপিএবি নীতিমালা তৈরির পরে ব্রডব্যান্ড নীতিমালা হালনাগাদ করা হতে পারে।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

 

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY