রাজশাহীতে ভারী কাজে শিশুরা : প্রতিরোধ নেই

0
193

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: আজ ১২ জুন শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস-২০১৬। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজকের দিনটিকে পালন করা হচ্ছে। প্রতি বছর বিভিন্ন কর্মসুচিতে দিবসটি পালিত হলেও কার্যত এই দিবসের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন খুব কমই হচ্ছে। প্রতিরোধ হচ্ছে না শিশু শ্রমের। বিশ্বেরর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও শিশুশ্রম থামানো যাচ্ছে না।  রাজশাহীতে শিশুরা নিয়োজিত হয়ে আছে ভারী কাজে। এতে তাদের মানসিক বিকাশসহ স্থাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
আইএলও’র সর্বশেষ এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা বিশ্বে প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিশু নানাভাবে শ্রম বিক্রি করছে। তাদের অর্ধেক প্রায় সাড়ে ৮ কোটি শিশু নানারকম ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত।
‘জাতীয় শিশু শ্রম জরিপ ২০১৩’ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু কোন না কোন শ্রমে নিয়োজিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত এ জরিপে দেখা যায়, এর মধ্যে ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশুই বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। শিশু শ্রম নিরসনে বাংলাদেশ সরকার ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নির্ধারণ করে ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম বন্ধের অঙ্গীকার করেছে।
শিশু অধিকার সুরক্ষা ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম শ্রতিরোধের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম সংস্থা (আইএলও) ২০০২ সাল  থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিবছর দিবসটি পালন করে। “এন্ড চাইল্ড লেবার ইন সাপ্লাই চেইন-ইটস এভরিওয়ানস বিজনেস” বা “উৎপাদন থেকে পণ্য ভোগ, শিশু শ্রম বন্ধ হোক” এই প্রতিপাদ্য নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৮০টি দেশ এ দিবসটি পালন করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের অন্যান্য জায়গার মতো রাজশাহীতে শিশুশ্রমে নিয়োজিত আছে শিশুরা। রাজশাহীর বিভিন্ন হাডওয়ার্কস, ইলেক্ট্রনিক সামগ্রীর দোকান, মোটরগাড়ি ও রিকশা সারাইয়ের গ্যারেজ, চায়ের দোকানসহ বিভিন্ন দোকান, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বাসাবাড়িতে কাজ করে জীবন-জীবিকার পথ খোঁজে শিশু। অনেক শিশু রাজমিস্ত্রির সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করে। এ ছাড়া অনেক শিশু বাস, অটো, হিউম্যান হলার এসব যানবাহনে সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিশুদের অল্প পারিশ্রমিক দিয়ে বেশি কাজ করে নেওয়া যায় বলে মালিকেরাও তাদের নিয়োগ করেন। কারখানার ও হোটেলের মালিকেরা বলেন, ‘শিশু শ্রমিকেরাই ভালো। যা মজুরি  দেই তা নিয়েই কাজ করে, বাড়াবাড়ি করে না। ওদেরও টাকা দরকার আর আমাদের শ্রমিক। দুই পক্ষেরই লাভ। লোকসান নাই।’
কয়েকজন শিশুশ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেকেই অল্প বয়স থেকে কাজ করছে।  কেউ দুই-তিন বছর বিদ্যালয়ে গেলেও অভাবের তাড়নায় তাদের বাবা-মা কাজে পাঠাতে বাধ্য করছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাধারণত অসচ্ছল পরিবার থেকে আসা শিশুরা এসব কাজে জড়িত। শিশুর পরিবার তাদের পড়াশোনার খরচ যোগাাতে না পেরে শিশুদের কাজে নিয়োজিত করেছে। আর অল্প মজুরিতে বেশি কাজ করানোর লোভে তাদের নিয়োগ করেছে বিভিন্ন দোকান মালিক ও প্রতিষ্ঠান।
অথচ বাংলাদেশের শ্রম আইন (২০০৬) অনুযায়ী, ‘শ্রমিকের বয়স ১৪ বছরের নিচে হওয়া যাবে না।’ কিন্তু রাজশাহীর বাস্তব চিত্র ভিন্ন। শ্রমে নিয়োজিত বহু শিশুরই বয়স ১৪ বছরের নিচে। রাজশাহীতে বহু শিশুকে শ্রমে নিয়োজিত থাকতে দেখা গেলে কত সংখ্যক শিশু সরাসরি শ্রমে নিয়োজিত তার পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

আজ রোববার সকালে কথা হয় রাজশাহী মহানগরীর বুধপাড়া এলাকার হোটেলের কর্মচারী অন্তরের সাথে (১২)। অন্তর বলে, ‘আব্বা রিকশা চালায়। বড় ভাই বিয়ে করে আলাদা খায়। আমি অন্তর আর আমার ছোট ভাই সাগর হোটেলে কাজ করি। আব্বা (বাবা) যে টাকা কামায় (উপার্জন) করে তা দিয়ে কিস্তি আর তেল নুন (লবন) হয়। আমার কাজের টাকা বাড়িতে দিলে বাজার করে আর কিস্তি দেয় মা। কাজ না করলে খাব কী?।’

অন্তর বলেন, ‘আমি এই হোটেলে অনেক দিন আগে থেকে ছোট ভাই সাগরকে (১০) নিয়ে কাজ করি। আমাদের বাড়ি রেল বস্তিতে। আমাদের পরিবারে তিন বোন তিন, তিন ভাই মিলে আটজনের সংসার। বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। সে শ্বশুর বাড়ি থাকে। বড় ভাই বিয়ে করে আলাদা থাকে। আর কাকোলী (বোন) ও ব্রাক স্কুলে পড়ে। কাকোলীর ছোটটা এখনো স্কুলে যায় না।’

‘আমি স্কুলে কয়েকদিন গেছি। এখানে কাজে লাগার পরে আর স্কুলে যায় না। এ হোটেলে আসতে হয় ভোর সাড়ে ৬ দিকে। সকালে, দুপুর আর রাতের খাবার এখানে খায়। রাতে বাড়িতে যেতে ১০ থেকে সাড়ে ১০ টা বাজে। বাড়িতে গিয়ে ঘুমিয়ে যায়। আবার পরের দিন আসতে হয়।

‘আগে কিছুই পারতাম না। শুধু টেবিল মুছে দিতাম। তাই তারা আাকে প্রতিদিন ৫০ টাকা করে দিতে। এ ভাবে বাড়তে বাড়তে এখন ১০০ টাকা থেকে ১২০ টাকা করে দেয়।’

ছোট ভাই সাগর বলেন, লেখতে পড়তে পারি না। টাকা গুনতে পারি। আমি চা বানাতে পারি। এখনে অনেক দিন আগে থেকে কাজ করি। স্কুলে যায়নি। গেলে পড়া না পারলে স্যার (শিক্ষক) মারতো। তাই আর স্কুলে যায় না। এখানে খায় আর এখানে কাজ করি।

‘মামা ( হোটেল মালিক) আব্বাকে টাকা দেয়। জানি না কত টাকা দেয়। কোন দিন রাতে এখনে ঘুমায়। আমাদের অনেক টাকার কিস্তি আছে। তাই আমরা আর অন্তরের কাজের আব্বা নিয়ে নেয়।’

নগরীতে সকাল নয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত চোখে কালো চশমা লাগিয়ে ওয়ারিংয়ের কাজ করে শিশু ফেরদৌস। সপ্তাহে চারশ টাকা বেতনে কাজ করে সে। অভাব অনটনের কারণে দ্বিতীয় শ্রেণীর বেশি পড়তে পারেনি সে। পরিবারের লোকজন তাকে নিয়োজিত করেছে এ কাজে।’
এ বিষয়ে ফেরদৌস বলে, ‘পড়াশোনা না করে এলাকার ছেলেদের সাথে মিশতে গেলে খারাপ পথে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, খারাপ পথে যাওয়ার থেকে কাজ করা অনেক ভালো। ভবিষ্যতে পড়াশোনা করার ইচ্ছে আছে কিনা জানতে চাইলে ফেরদৌস বলে“ ইচ্ছা আছে নাইট স্কুলে ভর্তি হব।’

শুধু অন্তর, ফেরদৌস নয়, তাদের মতো হাজার হাজার শিশু রাজশাহী শিশুশ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। শিশুদের শিশুশ্রম রোধে শিশুদের অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি শ্রম আইন বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY