চাঁদার কারণে হকারদের পক্ষে পুলিশ!

0
250

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: রাজধানীর গুলিস্তানে হকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংঘর্ষে গ্রেপ্তার হওয়া ১৯০ জনের অধিকাংশই ব্যবসায়ীপক্ষের। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ফুটপাত ও রাস্তায় বসা হকারদের কাছ থেকে স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বড় অঙ্কের চাঁদা পান। পুলিশ তাই হকারদের পক্ষ নিয়ে ব্যবসায়ীদের গণহারে গ্রেপ্তার করেছে।
গুলিস্তানে ঢাকা ট্রেড সেন্টারের (দক্ষিণ) বারান্দা ও সামনের ফুটপাতে দোকান বসানো নিয়ে হকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে গত শুক্রবার দ্বিতীয় দিনের মতো সংঘর্ষ হয়। এতে পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনারসহ অন্তত ২৫ জন আহত হন। ট্রেড সেন্টারে অভিযান চালিয়ে ১৯০ জনকে আটক করে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার হকারদের পক্ষ থেকে করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।
গতকাল শনিবার গুলিস্তানে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা ট্রেড সেন্টারে পুরোদমে বেচাকেনা চলছে। মার্কেটের চারপাশের ফুটপাতেও পসরা সাজিয়ে বসেছেন হকাররা। তবে রাস্তার ওপর দুপুর পর্যন্ত কোনো হকারকে বসতে দেখা যায়নি।
ঢাকা ট্রেড সেন্টার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আফজাল হোসেন  বলেন, ‘গণহারে দোকানের মালিক ও কর্মচারীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অথচ সংঘর্ষ হয়েছে দুই পক্ষে। এ ঘটনায় আমরা হতবাক।’ তিনি বলেন, পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হকারদের উচ্ছেদের কথা বলে, কিন্তু স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে গলদ থাকায় তা সফল হয় না।
গলদটা কী, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি আফজাল হোসেন। মালিক সমিতির অন্য নেতারাও সে বিষয়ে নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে নারাজ।
ব্যবসায়ী ও হকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মার্কেটটির চারপাশে ফুটপাত ও রাস্তার ওপর প্রায় ১ হাজার ৫০০ হকার বসেন। তাঁদের কাছ থেকে প্রতিদিন ১৫০-২০০ টাকা হারে চাঁদা তোলা হয়, যা মাসিক সর্বনিম্ন ৬৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৯০ লাখে দাঁড়ায়। এই চাঁদা ভাগ-বাঁটোয়ারা হয় স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে।
ব্যবসায়ীরা জানান, সংঘর্ষের সময় পুলিশ হকারদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। হকারদের দিক থেকে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। কিন্তু পাশেই পুলিশ দাঁড়ানো থাকলেও তাঁদের থামাতে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বৃহস্পতিবার দুই পক্ষের সংঘর্ষের পর হকারদের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন লুৎফর রহমান। প্রথম আলোর কাছে নিজেকে তিনি আওয়ামী লীগের গুলিস্তান ইউনিটের আহ্বায়ক হিসেবে পরিচয় দেন। লুৎফর বলেন, হকারদের ১০-১২ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। সংঘর্ষের সময় পুলিশের আচরণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পুলিশ ভাইরা আমাদের সহযোগিতা করেছেন। কোনো ঝামেলা করেন নাই। পিটানও নাই।’ দুই পক্ষের সংঘর্ষে হকারদের প্রতি পুলিশের এমন সদয় আচরণের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে লুৎফর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তবে হকারদের পক্ষ থেকে পুলিশকে প্রতিদিন চাঁদা দেওয়ার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেননি।
দিনে সংঘর্ষের পর রাতে মালিক সমিতির সঙ্গে হকাররা আলোচনায় বসেন। সেখানে হকারদের প্রতিনিধিত্ব করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন আহম্মেদ। আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হকারদের ক্ষতিপূরণের কথা বলেছি ব্যবসায়ীদের। তাঁরা একটা ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়েছেন।’
হকারদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ভাই, আমি নিজে একদিন প্রত্যেকটা লাইনম্যানকে ডেকে তারা কার কাছ থেকে কত টাকা চাঁদা নেয়, কাকে কত টাকা দেয়, সে বিষয়ে হিসাব নিয়েছিলাম। সবকিছু হিসাব করে দেখেছি, পৌনে ৩ শতাংশ চাঁদাও স্থানীয় রাজনীতিবিদ বা নেতাদের পকেটে যায় না। বাকি চাঁদাটা তাহলে যায় কোথায়? আপনারা শুধু রাজনীতিবিদ বা নেতাদের ওপর সবকিছু চাপানোর চেষ্টা করেন।’
মার্কেটটির পাশেই সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ বক্স। সেখানে পুলিশের সহকারী কমিশনার মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, ব্যবসায়ীপক্ষকে থামানো সম্ভব হচ্ছিল না। তা ছাড়া তাঁদের বিরুদ্ধে হকারদের মামলাও রয়েছে। তাই গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে ব্যবসায়ীদের সংখ্যা বেশি। হকারদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়ার বিনিময়ে তাঁদের বসার জায়গা করে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে আমাদের কোনো ইন্টারেস্ট নেই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদের বিষয়ে আমাদের যেভাবে নির্দেশনা দেয়, আমরা সেভাবে কাজ করি।’

 

সূত্র: প্রথম আলো

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY