বাংলাদেশ ‘চুরিতে’ কেন পিছিয়ে থাকবে ?

0
214

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সোজাসাপ্টা কথা বলেন। এমনকি সেটি নিজের বা সরকারের বিপক্ষে গেলেও তিনি সত্য বলতে কুণ্ঠিত নন।
গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের মঞ্জুরি দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী স্বতন্ত্র সাংসদ রুস্তম আলী ফরাজীর সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের কিছু কিছু ক্ষেত্রে যে লুটপাট হয়েছে, সেটা শুধু পুকুর চুরি নয়, সাগর চুরি। (প্রথম আলো ৮ জুন, ২০১৬)
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিরোধী দল কিংবা স্বতন্ত্র সাংসদের সঙ্গে সহমত প্রকাশের নজিরও বিরল।
কিন্তু যে প্রশ্নটি এখানে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, সেটি হলো ব্যাংক ও আর্থিক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির কথা স্বীকার করলেই অর্থমন্ত্রী বা সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় কি না? কখনোই নয়। অর্থমন্ত্রী মহোদয় কিংবা সরকারের দায়িত্ব সেই অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করে ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে সঠিক পথে পরিচালিত করা।
সেদিন সংসদে অর্থমন্ত্রী অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা স্বীকার করেও ব্যাংক ও আর্থিক খাতে বাড়তি মঞ্জুরির পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। কেননা, তিনি তো টাকা খরচ করে ফেলেছেন। এখন সেই টাকা সংসদ পাস করাতে না পারলে তিনি থাকেন না। সরকারও থাকে না। তাই ব্যাংক ও আর্থিক খাতে যতই সাগর চুরি হোক না কেন, সংসদে বাড়তি মঞ্জুরি পাস করাতেই হবে। কিন্তু তিনি এই নিশ্চয়তা কি দিতে পারবেন যে আগামী বছর ব্যাংক ও আর্থিক খাতে কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি হবে না। প্রতিবছরই আমরা বাজেটে ভালো ভালো কথা শুনি। কিন্তু বাস্তবায়নেই দেখা যায় মস্ত গলদ। তবে সেই দায়িত্ব একা অর্থমন্ত্রীর নয়, গোটা সরকারের।
সাগর চুরি নিয়ে কথা বলার আগে পুকুর চুরির গল্পটির উৎসটা জেনে নিই। কোনো এক প্রকল্প কর্মকর্তা নাকি তাঁর ঊর্ধ্বতনের কাছ থেকে পুকুর খননের জন্য মোটা অঙ্কের বরাদ্দ পাস করিয়ে নেন। পরে কাগজপত্রে কাজের বিস্তারিত বিবরণসহ বিল জমা দিয়ে টাকাও তুলে নেন। এর কয়েক বছর পর আবার সেই কর্মকর্তা ঊর্ধ্বতনকে দিয়ে একই স্থানে পুকুর ভরাটের প্রকল্প পাস করিয়ে নেন। এরপর তিনি যে দ্রুততায় পুকুর খননের বিল তুলে নিয়েছিলেন, তার চেয়েও বেশি দ্রুততায় পুকুর ভরাটের বিল তুলে নিলেন। পরে সরেজমিন তদন্ত করে জানা যায় যে সেখানে পুকুর কাটাই হয়নি। এভাবে পুকুর না কেটে দুই দফায় টাকা তুলে নেওয়ার ঘটনা থেকেই পুকুর চুরির গল্পের উদ্ভব।
তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে গত ৪৫ বছরে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের বড় বড় কেলেঙ্কারির কাছে পুকুর চুরি কিছুই না। এখানে জমি নেই, সম্পদ নেই, কারখানা নেই, ব্যবসা নেই; অথচ এসবের নামে ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। সেই লোপাটকারী ব্যক্তিদের কেউ এ সরকারে, কেউ ও সরকারে আসর জাঁকিয়ে বসেন। কেউবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কক্ষে ঢুকে তাঁকে হুমকি দেন।
অর্থমন্ত্রী মহোদয় এখন যতই আফসোস করুন, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের এই সাগরচোরদের ধরা সহজ হবে না। প্রথম আলোয় আড়াই হাজার কোটি টাকার হল-মার্ক কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পর সরকার সজাগ হলে হয়তো পরের কেলেঙ্কারিগুলো এড়ানো যেত। সে সময় অর্থমন্ত্রীও ওসব কিছু না বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে দিনে দিনে সাগর চুরির সংখ্যা বেড়েছে।
এই যে একের পর এক ব্যাংকে সাগর চুরির ঘটনা ঘটছে, কিন্তু এই সাগরচোরদের ধরতে সরকার কী করছে? সরকার ফি বছর এই সাগর বা পুকুরচোরদের দায় জনগণের ওপর চাপিয়ে যাবে? বর্তমান অর্থমন্ত্রী দায়িত্বে আছেন সাড়ে সাত বছর। আগের চুরিচামারির কথা বাদ দিলেও এই সাড়ে সাত বছরের দায় কিন্তু তিনি এড়াতে পারেন না। ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে পুরো অজ্ঞ অথচ তদবিরবাজিতে অভিজ্ঞ, বিএনপি আমলে বিএনপির লোক, আওয়ামী লীগের আমলে আওয়ামী লীগের লোকদের পরিচালনা পর্ষদে বসিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সর্বনাশ করা হয়েছে, হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, গত সাত বছরে বাজেটের আকার ৯১ হাজার কোটি থেকে বেড়ে সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এটি নিশ্চয়ই বাংলাদেশের বড় অর্জন। তিনি আশা করছেন, আগামী বছর প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশের কম হবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাজেটের আকার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চুরির আকারও বেড়ে যাবে কি না? হল-মার্কে ও বেসিক ব্যাংকের মতো বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির হোতারা শাস্তি পাবেন কি না?
বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির হোতা সাবেক চেয়ারম্যানকে আসামি করা যায়নি বলে অর্থমন্ত্রী একাধিকবার আক্ষেপ করেছেন। তবে তিনি আশা করছেন, অন্যান্য আসামির জবানবন্দিতে তাঁর নাম আসবে। তাহলে এই চেয়ারম্যান কি মাননীয় অর্থমন্ত্রীর চেয়েও ক্ষমতাবান? তাহলে কি সরকারের ভেতরেই এমন কেউ কেউ আছেন, যাঁরা সাগরচোরদের পোষণ করেন?
সহকর্মী শওকত হোসেন সম্প্রতি প্রথম আলোয় ব্যাংক ডাকাতি নিয়ে দুটি সরস নিবন্ধ লিখেছেন। প্রথম নিবন্ধে দেখা যায়, এক নবিশ ও অভিজ্ঞ ডাকাত মিলে বন্দুকের মুখে ব্যাংক কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাঁচ কোটি টাকা ডাকাতি করেছে। নবিশ ডাকাত টাকাগুলো গুনতে চাইলে অভিজ্ঞজন বলল, তার প্রয়োজন হবে না। বাড়িতে গিয়ে টিভিতেই জানা যাবে কত টাকা ব্যাংক থেকে খোয়া গেছে। কিন্তু পরে ব্যাংকের কর্মকর্তারা আরও পাঁচ কোটি টাকা সরিয়ে ঘোষণা দিলেন যে ১০ কোটি টাকা ডাকাতি হয়েছে। ফলে দুই ডাকাত এই বলে আফসোস করল যে তারা এত কষ্ট করে পাঁচ কোটি টাকা পেল। আর ব্যাংক কর্মকর্তারা কোনো পরিশ্রম না করে পাঁচ কোটি টাকা লোপাট করে দিলেন।
দ্বিতীয় গল্পে ব্যাংক ডাকাতেরা যখন ব্যাংকের ভল্ট থেকে সব টাকা লুট করে নিয়ে যাচ্ছে, তখন একজন ব্যাংক কর্মকর্তা তাঁদের কাছে লেজার বুকটাও নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানান। কেননা, ওই হিসাবে অনেক গরমিল ছিল। আমাদের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও এ ধরনের কর্মকর্তা বা পরিচালক নেই, সে কথা হলফ করে বলা যায় না। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে গত ৪৫ বছরে যে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে, তার একটি বড় অংশ যে কর্মকর্তা ও পরিচালকদের পকেটে গেছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
পাদটীকা: বাংলাদেশের ধারেকাছে সাগর নেই। আছে বঙ্গোপসাগর। সে ক্ষেত্রে যাঁরা ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সাগর চুরি করে সাগরের সঙ্গে আমাদের সরাসরি পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের অশেষ মোবারকবাদ জানাই। একই সঙ্গে এই আশা রাখি, ভবিষ্যতে তাঁরা আমাদের কেবল সাগর নয়, মহাসাগরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন।
বাংলাদেশে সব ক্ষেত্রেই উন্নতি হচ্ছে। তাহলে ‘চুরি’তে কেন পিছিয়ে থাকবে?

সূত্র: প্রথম আলো

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY