অ্যাপেনডিক্সের যন্ত্রণা বলে কিডনি কেটে সাফ

0
174

মিরর বাংলা নিউজ  ডেস্ক: ওটি-তে যাওয়ার সময়ে তাঁরা জানতেন, অ্যাপেনডিসাইটিসের জন্য অস্ত্রোপচার হবে। অস্ত্রোপচার হতো ঠিকই। তবে জ্ঞান ফেরার পরে বুঝতে পারতেন, অ্যাপেনডিক্স নয়, একটি কিডনিই কেটে নেওয়া হয়েছে তাঁদের!

তাঁরা সবাই গরিব মানুষ। কারও বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনা, কারও নদিয়ার বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা গাঁ-গঞ্জে। দেশে-বিদেশে কাজ দেওয়ার নাম করে তাঁদের সঙ্গে ভাব জমাত কিডনি চক্রের দালালরা। কাজ দেওয়ার টোপ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো দেশের নানা শহরে, এমনকী ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন ঠেকে। ভুয়ো পাসপোর্ট, আধার কার্ড তৈরি করে দেওয়ার কাজও করত এই পাচারকারী দলটি।

প্রশিক্ষণ দেওয়ার নামে এই সব ঠেকে তাঁদের রেখে দেওয়া হতো কিছু দিন। খাবার দেওয়া হতো। বিষ মেশানো খাবার। যা খেয়ে অবধারিত পেটের অসুখ, পেট ব্যথা। তখন তাঁদের নিয়ে যাওয়া হতো চিকিত্সকের কাছে। আগে থেকে শিখিয়ে-পড়িয়ে রাখা ও টাকা দিয়ে রাখা সেই চিকিত্সকরা বলতেন, ‘‘ও কিছু না, অ্যাপেনডিক্সের ব্যথা। অপারেশন করলে ভোগান্তি শেষ।’’ পরে দরকার মতো এ-ও বোঝানো হতো, একটি কিডনি দিয়ে দিলেও শরীর সুস্থ থাকে। বিনিময়ে মেলে মোটা টাকা। সেই অপারেশনের নামে কেটে নেওয়া কিডনি মোটা টাকায় বিক্রি করা হতো।

আন্তর্জাতিক কিডনি পাচার চক্রের চাঁই, রাজারহাটের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে মঙ্গলবার ধৃত টি রাজকুমার রাওকে বুধবার বারাসত আদালতে পেশ করে এমন তথ্যই দিয়েছে দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। কিডনি পাচারের দুনিয়ার এই ‘বেতাজ’ বাদশাকে এ দিন বারাসত আদালতে বিচারক অপূর্বকুমার ঘোষের এজলাসে হাজির করানো হয়। এর পর তাকে ট্রানজিট রিমান্ডে দিল্লি নিয়ে গিয়েছে দিল্লির সরিতা বিহার থানার পুলিশ। রাজকুমারের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪১৯, ৪২০, ৪৬৮, ৪৭১ এবং ১২০(বি) ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। এ ছাড়া মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচার আইনের কয়েকটি ধারাতেও অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।

রাজকুমার এই রাজ্যে কেন ঘাঁটি গেড়েছিল? তদন্তকারীদের একটি অংশ জানাচ্ছেন, এটা সস্তায় শ্রমিক পাওয়ার মতো। দেশের অন্যত্র কিডনিদাতাকে ১০-১২ লক্ষ টাকা দিতে হয়। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের প্রান্তিক মানুষদের ৪-৫ লক্ষ টাকার বেশি দিতে হয় না। কাউকে কাউকে তো ৫০ হাজার বা ১ লক্ষ টাকা দিলেও চলে। এ ভাবে ‘কেনা’ এক একটি কিডনির দাম উঠত প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা। ডাক্তার, হাসপাতাল সবাইকে দিয়েথুয়ে কিডনি পিছু রাজকুমারের নিট আয় ছিল ১০ লক্ষ টাকা।

জেরায় রাজকুমার জানিয়েছে, কিডনি পেতে এ রাজ্যের বাংলা সংবাদপত্রগুলিতে বিজ্ঞাপন দিত তারা। লেখা থাকত, ‘এ-পজিটিভ এবং ও-পজিটিভ কিডনিদাতা চাই। বয়স ৩৬ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। আগ্রহীরা সচিত্র পরিচয়পত্র এবং আইনি অভিভাবক-সহ যোগাযোগ করুন।’ রাজকুমারের কাছ থেকে  এমন বিজ্ঞাপন-সহ একটি সংবাদপত্রও উদ্ধার হয়েছে। যোগাযোগের জন্য দু’টি মোবাইল নম্বর দেওয়া থাকত বিজ্ঞাপনে। নাম থাকত মণীশ শর্মা নামের এক ব্যক্তির। ওই নম্বরে আড়ি পেতেই পুলিশ দু’জনের নাম পায়।

২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতায় একটি আন্তঃরাজ্য কিডনি পাচার চক্রের সন্ধান পায় লালবাজার। পুরুষ-মহিলা মিলিয়ে জনা বারোকে গ্রেফতার করা হয় সে সময়ে। তখনই ভিন্ রাজ্যের কয়েকটি বড় বেসরকারি হাসপাতাল ও তাদের সঙ্গে যুক্ত কয়েক জন চিকিৎসকের নাম উঠে এসেছিল। ওই চক্রের সঙ্গে রাজকুমারের চক্রের কোনও যোগ আছে কি না, দেখা হচ্ছে।

সূত্রের খবর, রাজকুমারের হদিস পেয়ে দিন তিনেক আগেই কলকাতায় এসে পৌঁছয় দিল্লি পুলিশের বিশেষ দল। রাজারহাটের শিবতলা খামারপাড়ায় রাজকুমারের বাড়িতে পুলিশ যখন হানা দেয়, সেই সময়ে দীপক কর নামে কিডনি পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত আর এক জন উপস্থিত ছিল। তখনকার মতো সে পালিয়ে যায়। বুধবার বাগুইআটির জ্যাংড়ায় তার বাড়িতেও হানা দিয়েছিল দিল্লি পুলিশ। কিন্তু হদিস পায়নি। বুধবার বিকেলে দীপক নিজেই বাগুইআটি থানায় হাজির হয়। সেখানে রাত পর্যন্ত দীপককে বসিয়ে রাখা হয়েছে। দিল্লি পুলিশের দাবি, দীপক ২০০৮ থেকে এই চক্রে কাজ করছে। বিধাননগর কমিশনারেটের পুলিশের একটি সূত্রের বক্তব্য, দিল্লি পুলিশ এর তদন্ত করছে, ফলে বিষয়টি তাদের জানানো হবে।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের একটি সূত্রের খবর, রাজকুমারের চক্রে পশ্চিমবঙ্গের কারা কারা সামিল, কোন কোন চিকিৎসক জড়িত, সেটা জানতে চাইবে সিআইডি। সে জন্য বুধবার সিআইডি বারাসত আদালতে আবেদনও করেছে। ওই চক্রেরই আর এক পান্ডার খোঁজে শিলিগুড়িতেও তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ।

সূত্র: আনন্দ বাজার

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY