কি সত্যি প্রকাশ করলেন তনুর বাবা ?

0
294

বাবা বাড়িতে। রাত সোয়া ১০টা বাজে। মেয়ে ফেরেনি। তিনি মেয়েকে খুঁজতে বেরোলেন। বাবার হাতে টর্চলাইট। বাড়ির অদূরেই কালভার্টের কাছে পড়ে আছে একপাটি জুতা। তাঁরই মেয়ের। টর্চ মেরে দেখলেন একটু দূরে তার মোবাইল পড়ে আছে। কালভার্টের আরেক পাশে পাওয়া গেল তনুকে। বাবার চিৎকারে তনুর ছোট ভাই রুবেলও ততক্ষণে ছুটে এসেছে।

এই পর্যন্ত পড়েই  বুকটা চেপে ধরে। শরীর হিম হয়ে আসে। আহা, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহকারী ইয়ার হোসেন সাহেব। আপনার মনের ভেতর দিয়ে কী ঝড় বয়ে গেছে তখন, তনুর মায়ের মনের ওপর দিয়ে, আপনাদের সমস্ত অস্তিত্বজুড়ে কী অসহ্য অমেয় বেদনার পাহাড় চেপে বসে আছে! আমি কল্পনা করতে পারছি না। আমি এই চাপ নিতে পারছি না।

কী প্রাণবন্ত একটা মেয়ে ছিল তনু। সোহাগী জাহান তনু। আপনাদের আদরের সোহাগী। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ওর ছবি ছড়িয়ে পড়েছে, একাধিক, মাথায় স্কার্ফ, মুখে হাসি, চোখে বুদ্ধির ঝলক। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাসের ছাত্রী। নাটক করে। সংস্কৃতি চর্চা করে। প্রাণহীন বিক্ষত দেহ পড়ে রইল কালভার্টের পাশে, জঙ্গলের ভেতরে। বাড়ির খুব কাছে।

আমিও তো বাবা। আমার বুকের মধ্যে সন্তানহারানো বাবার সমস্ত বেদনা এসে চেপে ধরে। আমিও একজন মানুষ! আরেকটা মানুষের এই অপরিসীম উত্তরহীন শোক, বেদনা, যন্ত্রণা আমাকেও খানিকটা স্পর্শ করে।

হয়তো তনুর এই খবর আমি অগ্রাহ্য করে নিস্তরঙ্গ হয়েই থাকতাম। রোজ তো তাই করি। এত দুঃসংবাদ, এত মৃত্যু, এত নারী নির্যাতন, আত্মহত্যা, সড়ক দুর্ঘটনা, রেল-নৌ দুর্ঘটনার খবরের চাপে পলায়নবাদী হয়ে গেছি। ওই সব খবর পাশ কাটিয়ে চলে যাই। নিরাপদ তন্দ্রায় আশ্রয় নিতে চাই। পড়লে সহ্য করতে পারব না। কান্নাকাটি করব। বাকি সব কাজ তুচ্ছ মনে হবে। বুঝি, এ হলো বার্ধক্যের লক্ষণ। উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে বহমান ঝড়কে ভুলে থাকার চেষ্টা।

কিন্তু তরুণেরা তা হতে দিল না। আমার মতো আধমরাদের ঘা মেরে বাঁচানোর জন্য সারা বাংলাদেশের অপরাজেয় তারুণ্য জেগে উঠেছে। হাজার হাজার ছেলেমেয়ে দখল করেছে কুমিল্লার সড়ক-মহাসড়ক। প্রতিবাদে রুখে উঠেছে দেশের নানা জায়গার তরুণসমাবেশ। তারুণ্য তো তাই। প্রতিবাদ করাই তো তারুণ্যের ধর্ম। হেলাল হাফিজ তো সেই কবেই লিখে রেখেছেন, এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।

 

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY