রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা- মূল হোতা চীনা নাগরিক

0
242

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা তদন্ত করছে ফিলিপাইনের বিচার বিভাগ, ব্ল–-রিবন সিনেট কমিটি ও অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল। তবে প্রকৃত অপরাধীদের এখনও শনাক্ত করতে পারেনি তারা। আপাতত রিজাল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (আরসিবিসি) জুপিটার স্ট্রিট শাখার ম্যানেজার মায়া সান্তোস দেগুইতোকে ঘিরেই ঘুরপাক খাছে সবকিছু। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু দেগুইতো নন, এ অর্থ চুরিতে জড়িত রয়েছে শক্তিশালী চক্র। দেগুইতোর ঊর্ধ্বতন দুই বা ততোধিক কর্মকর্তাও জড়িত রয়েছেন এতে। তবে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন এ ঘটনার মূল হোতা চীনা নাগরিক ও ব্যবসায়ী কিম অং।
অর্থ চুরির টাকা যেসব হিসাবে গিয়েছিল তাদের একজন হলেন ব্যবসায়ী উইলিয়াম গো সো। এবার তিনিই মামলা করেছেন দেগুইতোর বিরুদ্ধে। তিনি অভিযোগ এনেছেন জালিয়াতি করে তার নামে ভুয়া হিসাব খোলেন দেগুইতো ও তার সহকারী অ্যাঞ্জোলা তোরেস। ফিলিপাইনের দৈনিক ইনকোয়ারার, দ্য ম্যানিলা টাইমস, র‌্যাপলার, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্সসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমসূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল আন্তর্জাতিক এক ওয়াচডগ প্রতিষ্ঠানের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, অর্থ পাচারের বড় গর্ত ফিলিপাইনের ক্যাসিনোগুলো। লাখো কালো টাকার লেনদেনকারী এর সঙ্গে যুক্ত। সরাসরি ও অনলাইনে এতে জুয়ার চিপস কেনাবেচা হয়। এদিকে রিজার্ভের অর্থ চুরির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে এমন সন্দেহভাজন ৪৪টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এরই মধ্যে জব্দ করেছে ফিলিপাইন।
সো গোর মামলা : চুরির অর্থ যে ক’টি হিসাবের মাধ্যমে ক্যাসিনোতে গিয়েছিল তার অন্যতম হল ব্যবসায়ী উইলিয়াম সো গো। এবার তিনিই মামলা করলেন রিজাল ব্যাংকের জুপিটার শাখার ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতো ও তার ঘনিষ্ঠ পদত্যাগী সহকারী ব্যবস্থাপক অ্যাঞ্জোলা তোরেসের বিরুদ্ধে। মাকাতি সিটি প্রসিকিউটরের দফতরে শনিবার করা ওই মামলায় উইলিয়াম সো গো তার নামে ভুয়া হিসাব খোলা এবং ওই হিসাবের মাধ্যমে চুরির অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ এনেছেন। ছয় পাতার ওই অভিযোগপত্রে গো লিখেন, এটা জালিয়াতি। যে স্বাক্ষর ও কাগজপত্র দিয়ে হিসাব খোলা হয়েছে তা তার নয়, অন্য কারও। টাকা তো তোলেনইনি, মুদ্রা চুরির বিষয়ে কিছুই জানেন না তিনি।
সিনেট শুনানিতে উঠে আসে, চুরির ৬ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার উইলিয়াম সো গোর অ্যাকাউন্টে যায়। সেখান থেকে পরে কয়েকটি অ্যাকাউন্টে যায় ওই অর্থ। শুনানিতে তোরেস দাবি করেছিল, ৯ ফেব্র“য়ারি তিনি গো’কে তার হিসাব থেকে ২ কোটি পেসো (প্রায় সোয়া তিন কোটি টাকা) তুলতে দেখেছিলেন। তার লেক্সাস কারে করে ওই টাকা নিয়ে যান তিনি। তবে শুনানিতে গো এ অভিযোগ অস্বীকার করেন। শুনানিতে উঠে আসে মায়া ওই অ্যাকাউন্ট খুলতে সহায়তা করেছিলেন।
নাটের গুরু কিং অং : ব্লু-রিবন সিনেট কমিটির সদস্য সের্গিও ওসমেনা বলেছেন, ব্যবসায়ী কিং অং-ই এ চুরির মূল হোতা। ব্যাংক ম্যানেজার মায়া সান্তোস দেগুইতো মূল অপরাধী নন। অং-ই মায়াকে হিসাবগুলো খুলতে বলেছিলেন। ক্যাসিনোগুলোতে টাকা গেছে অংয়ের পরিকল্পনামতোই। চীনা এ ব্যবসায়ী ও কম্পিউটার হ্যাকারকে অবশ্যই ব্লু-রিবন কমিটির মুখোমুখি হতে হবে। তিনি বলেন, তবে এই বড় খেলোয়াড়ের সঙ্গে আপাতত কোনোভাবে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
ওসমেনা আরও বলেন, অংয়ের সুপারিশের ভিত্তিতেই মায়া হিসাবগুলো খোলেন। ভুয়া হিসাবগুলোর পরিচয়ও ‘নিশ্চিত’ করেছিলেন অং। পরে আড়াই হাজার ডলার বার্তা বাহকের মাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন তিনি। ওসমেনার মতে, পাঁচটি ভুয়া হিসাবের মধ্যে চারটি হিসাবে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ঢোকে। একটি হিসাব ব্যবহার হয়নি। হিসাবটির নাম পাইকাসি। যে চার হিসাবে টাকা গেছে তার ঠিকানায় নোটিশ পাঠাতে গিয়ে তাদের পাওয়া যায়নি।
সিন্ডিকেট জড়িত : ব্লু-রিবন সিনেট কমিটির চেয়ারম্যান তেওফিস্ত গুংগোনা বলেন, এখানে অবশ্যই একটি সিন্ডিকেট জড়িত আছে। অবশ্যই। একজনের পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব নয়। শুধু মায়াও নয়। তিনি বলেন, এটা একটা জটিল গল্প, আমরা খুঁজে দেখছি এর নেতৃত্ব দিচ্ছে কে। গুংগোনা বলেন, শুনানিতে মায়া বলেছেন, তিনি (মায়া) জীবন হারানোর হুমকিতে ছিলেন, আবার কখনও বলেছেন, আমি এর (হুমকির) পরোয়া করি না। এটিও সন্দেহের। গুংগোনা আরও বলেন, চুরিতে দেগুইতোর ‘বিগার বস’ (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা গুরু) জড়িত রয়েছে। এর মধ্যে রিজাল ব্যাংকের দুই কর্মকর্তাও রয়েছেন। তাদের নাম পাওয়া গেছে। তবে এখনই জানাতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। অবশ্য বলেন, এদের বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণ এখনও মেলেনি।
এখনই মায়ার বিশেষ নিরাপত্তা নয় : দেশটির আসন্ন নির্বাচনে ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ফ্রান্সিস এসকুডেরো বলেছেন, মায়াকে এখনই সরকারের সাক্ষী সুরক্ষা আইনের আওতায় আনার প্রয়োজন নেই। যদিও সিনেটররা এ দাবি তুলেছেন। তিনি বলেন, কেননা এখনও আমরা প্রকৃত বিষয়টি জানি না। প্রকৃত অপরাধী কে সেটিও জানি না।
অর্থ পাচারের বড় গর্ত ফিলিপাইনের ক্যাসিনো : ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি মানি লন্ডারিং ওয়াচডগ সতর্ক করে বলেছে, ফিলিপাইনের ক্যাসিনোগুলো বৈশ্বিক মুদ্রা পাচারের বড় গর্ত। এগুলো মানুষের পক্ষে নয়, বরং কালো টাকা দেশের অর্থনীতিতে ছড়িয়ে দেয়ার অস্ত্র। এগুলো ফিলিপাইনের অর্থনীতি ও ব্যাংক ব্যবস্থাকে নিশ্চিত অন্ধকারে ডুবিয়ে দেবে। উচ্চ কর ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের মাধ্যমে এগুলোকে বশে আনা জরুরি এখনই।
ওয়াচডগ বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরির তদন্তে নেমে খাবি খেয়েছে ফিলিপাইনের অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (এএমএলসি)। কেননা ক্যাসিনাগুলো আইন ও এএমএলসির আওতায় নয়। ২০১৩ সালেই প্যারিসভিত্তিক মাল্টিগভর্নমেন্ট ওয়াচডগ প্রতিষ্ঠান ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স ক্যাসিনোগুলোকে আইনের আওতায় আনতে বলেছিল। কিন্তু দেশটির আইনপ্রণেতারা তা গায়ে মাখেনি। আজ এর খেসারত দিতে হচ্ছে। তদন্তকারীরা মোটামুটি নিশ্চিত, বাংলাদেশের চুরি যাওয়া অর্থ ক্যাসিনোগুলোর চিপস কিনতে ব্যবহার হয়েছে।
এএমএলসির নির্বাহী পরিচালক জুলিয়া বেকাই আবদ বলেন, কর্তৃপক্ষ প্রমাণ পেয়েছে, লাখো অনলাইন গেম-ফার্ম, মুদ্রা পাচারকারী ও অপরাধী এগুলোতে অর্থ লেনদেন করে থাকে। এফবিআই’র তদন্তেও বিষয়টি উঠে এসেছে।
ক্যাসিনোগুলোর নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ফিলিপাইন অ্যামিউজমেন্ট অ্যান্ড গেমিং কর্পোরেশনের প্রধান ক্রিস্টিয়ানো নাগুইয়াত বলেন, অনৈতিক লেনদেন বন্ধে ব্যাংকই হচ্ছে প্রাথমিক দ্বাররক্ষী। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। ক্যাসিনো থেকে ওই অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব নয়। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান আমান্দো টেটাংক বলেন, এ গর্তগুলো বন্ধ করতে আইনপ্রণেতাদের এগিয়ে আসতে হবে।
৪৪ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ : চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনে সন্দেহভাজন ৪৪টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। তবে ব্যাংকিং ইতিহাসের অন্যতম এ বিপর্যয়ের ঘটনায় অর্থ স্থানান্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কারও জড়িত থাকার সন্দেহ উড়িয়ে দিচ্ছে। সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টার ব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন (সুইফট) বলছে, তারা বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে এ নিয়ে কাজ করছে। তবে তাদের ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক এখানে জড়িত নেই।
ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক বলছে, রিজার্ভ থেকে টাকা পাঠানোর জন্য তাদের সিস্টেমে কেউ প্রবেশের চেষ্টা করছে, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাদের কেউ এর সঙ্গে জড়িত নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট বার্তা পাওয়ার পর যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই টাকা পাঠানো হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে টাকা স্থানান্তরের জন্য পাঠানো ৩০ থেকে ৩৫টি প্রস্তাব তারা আটকে দিয়েছিলেন। বিষয়টি এখন ‘তদন্তাধীন’। তবে কেন তাদের সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিল, তা জানাতে চায়নি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক।

 

 

Jugantor+

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY