রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত হয়ে ঢুকছে অস্ত্র

0
588

রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে সীমান্ত পার হয়ে চোরাচালানের মাধ্যমে অবাধে আসছে অবৈধ অস্ত্র। রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা সীমান্ত এলাকা দিয়ে সাম্প্রতিক কালে ব্যাপক হারে অবৈধ অস্ত্র আমদানির পরিমাণ বেড়েছে বলে একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে শিবগঞ্জ সীমান্ত হয়েই আসছে অন্তত নব্বই ভাগ অস্ত্র। মূলত মাদক ব্যবসায়ীরাই এসব অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন।

মাদক আমদানীর পাশাপাশি তারা বিদেশী পিস্তল, রিভালবারসহ নানা ধরনের মরণাস্ত্রগুলো সীমান্তের অপর ভারত থেকে আমদানি করে আনছে। আর সেগুলো রাজশাহী হয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।

পথিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খবর পেয়ে কিছু অস্ত্র উদ্ধার এবং এর সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারও করছে। কিন্তু তার পরেও থেমে নেই অস্ত্র আমদানির মাত্রা। বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে বলেও দাবি করেছেন রাজশাহীর একাধিক গোয়েন্দা সূত্রগুলো। বিশেষ করে ছোট অস্ত্র আমদানির হার বেড়েছে কয়েক গুন।
রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন থানা সূত্র মতে, গত বছর এ দুটি জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কেবল র‌্যাব রাজশাহী-৫-এর সদস্যরাই ৯৪টি অস্ত্র উদ্ধার করে। এর মধ্যে ৬০টিই ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকা থেকে। অস্ত্রগুলোর মধ্যে বিদেশী পিস্তল ৬৪টি, রিভালবার ১৩টি, সুটারগান ১৩টি, পাইপ গান ১টি এবং এলজি ৩টি।

চলতি বছর র‌্যাব-৫-এর সদস্যরা এরই মধ্যে ৩৮টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে। যার মধ্যে ২৬টিই উদ্ধার করা হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকা থেকে। উদ্ধারকৃত অস্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদেশী পিস্তল ২৯টি, রিভালবার ১টি, সুটারগান ১টি, এসএমজি ১টি, রাইফেল ২টি, ব্যাজএমটি এয়ার ক্রাফট গান ১টি, হেভি মেশিন ২টি এবং পাইপ গান ১টি।
সর্বশেষ গত ১৩ মার্চ সকালে ৮টি বিদেশী পিস্তল, ১৬টি ম্যাগজিন ও ১৪০ রাউন্ড গুলিসহ আলাউদ্দিন (৫০) নামে এক অস্ত্র ব্যবসায়ীকে আটক করে র‌্যাব। তিনি শিবগঞ্জের ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন গ্রাম চাঁপাটিলার বাসিন্দা। অস্ত্রগুলো নিয়ে বাইসাইকেলে চেপে আলাউদ্দিন সোনামসজিদ-চাঁপাইনবাবগঞ্জ সড়ক হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন। এসময় র‌্যাব তাকে আটক করে।
অস্ত্র উদ্ধার সম্পর্কে জানতে চাইলে র‌্যাব-৫ চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্যাম্প কমান্ডার মেজর আব্দুস সালাম জানান, রাজশাহী অঞ্চলে যেসব অস্ত্র তারা উদ্ধার করেছেন বা করছেন সেগুলোর মধ্যে অধিকাংশই চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায়। এগুলোর বহনকারী বা ব্যবসায়ী যাদের আটক করা হয়েছে তাদের অধিকাংশরই বাড়ি আবার শিবগঞ্জ এলাকায়। ফলে অস্ত্রগুলো কোন রুট দিয়ে আসছে, এটি এখনো খুঁজে বের করতে তদন্ত করে যাচ্ছে র‌্যাব।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘অস্ত্রের রুটের সন্ধানে র‌্যাব কাজ করে যাচ্ছে। এটি উচ্চতর তদন্তের বিষয়। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন রুট দিয়ে অস্ত্র আসছে-তা বলা ঠিক হবে না।’
অন্যদিকে শিবগঞ্জ থানা সূত্র মতে, গত বছর শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে র‌্যাব, বিজিবি ও পুলিশ মিলে মোট ৬১টি অস্ত্র উদ্ধার করেন। এর মধ্যে অধিকাংশই ছিল বিদেশী পিস্তল। চলতি বছর এরই মধ্যে ২৩টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে। যেগুলো সবই এসেছে সীমান্ত এলাকা হয়ে।
তবে পুলিশ একাধিক গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত করেছে, রাজশাহী অঞ্চলে সাম্প্রতিক কালে যেসব অস্ত্রের চালান ধরা পড়ছে, তার সবগুলোই ভারতীয় সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে এসেছে। এর মধ্যে অধিকাংশই আসছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্ত এলাকা দিয়ে। আর কিছু অস্ত্র আসছে রাজশাহীর গোদাগাড়ী সীমান্ত হয়ে।
সূত্র আরো জানায়, কিছু কিছু অস্ত্র ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাকে করে অপার থেকে আমদানি করা হয়েছে। আর কিছু আসছে সীমান্তের কাটা তারের বেড়ার ফাঁক গলিয়ে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছরের ২২ জানুয়ারি জেলার গোদাগাড়ীতে বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ এক শিবির ক্যাডারকে আটক করে পুলিশ। আনারুল ইসলাম (২৭) নামের ওই শিবির ক্যাডারের বাড়িও ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার ঠুটাপাড়া গ্রামে।
গত বছরের ২৩ মার্চ রাজশাহী রেলওয়ে পুলিশ ধূমকেতু এক্সপ্রেস ট্রেনে অভিযান চালিয়ে দু’টি বিদেশি পিস্তল, ৫৭ রাউন্ড গুলিভর্তি চারটি ম্যাগজিনসহ এক নারীকে আটক করে। আক্তারা বেগম জান্নাত (৩৫) নামের ওই নারীর বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার কর্ণখালি গ্রামে। সে ওই গ্রামের মৃত আফসার আলীর মেয়ে।
গত বছরের ১ আগস্ট রাজশাহী মহানগর গোয়েন্দা শাখার পুলিশ একটি বিদেশী পিস্তলসহ ছাত্রলীগের ৪ কর্মীকে আটক করে। তারা গোদাগাড়ীর দিক থেকে আসার সময় অটোরিকশা তল্লাশি করে তাদের আটক করা হয়।

আটককৃতরা হলো, নগরীর হেতেম খাঁ এলাকার বিদ্যুৎ হোসেন (২৬), তার সহযোগী ও দরিখরবোনা এলাকার মেহেদী হাসান সুমন (২৫), হোসনীগঞ্জ এলাকার শাহীন কাদির (৩৩) এবং শহীদুল আলম ওরফে রিপন (২৮)।
সোনা মসজিদ বন্দর হয়ে পণ্যবাহী ট্রাকে অবৈধ অস্ত্র আসা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বন্দর শ্রমিক সম্নয় পরিষদের সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন, বন্দরের ভিতর দিয়ে কোনো অবৈধ মাল উঠে না। যা উঠে বাইরে গিয়ে রাস্তার মধ্যে। আর সেগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হচ্ছে বলে আমাদের কাছেও তথ্য আছে। এসব রোধে আমরা প্রতি সপ্তাহে অথবা ১৫ দিনের মাথায় একবার করে মাইকিং করা হয়। কিন্তু তার পরেও এসব বন্ধ হচ্ছে না।’
রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানার ওসি আবু ফরহাদ  বলেন, সীমান্তের অপর হয়ে কিছু অস্ত্র আসছে। এগুলো উদ্ধারে পুলিশ চেষ্টা চালাচ্ছে। কখনো অস্ত্রসহ ব্যভসায়ীদের আটকও করা হচ্ছে।
শিবগঞ্জ সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধ অস্ত্র প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিবগঞ্জ থানার ওসি এমএম মইনুল ইসলাম বলেন, সীমান্তের অপর দিয়েই সাধারণত অস্ত্রগুলো আসছে। এগুলো সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে। তবে অস্ত্র পাচার রোধে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু বন্ধ করা যাচ্ছে না। বরং বেড়েই চলেছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY