নেতৃত্বে নয়, রাজনীতিতে পরিবর্তন আসবে – বিএনপি

0
339

 

ছয় বছর পর আজ শনিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন। দলের নেতারা বলছেন, নেতৃত্বের কোনো পদে নির্বাচন না থাকায় সম্মেলনে নতুনত্ব থাকছে না। তবে সবার দৃষ্টি দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার বক্তব্যের দিকে।
খালেদা জিয়ার বক্তব্য তৈরির সঙ্গে যুক্ত একাধিক নেতা জানান, খালেদা জিয়ার বক্তব্যে দলের ভবিষ্যৎ পথচলা ও দেশের চলমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ নিয়ে তাঁর ভাবনার কথা থাকবে। এতে নতুন কিছু উপাদানও থাকবে। তবে সেটা কী, তা এসব নেতা খোলাসা করতে রাজি হননি।
আজ সকাল ১০টায় রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন চত্বরে খালেদা জিয়া সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন। ‘দুর্নীতি দুঃশাসন হবেই শেষ, গণতন্ত্রের বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে এবারের সম্মেলন হচ্ছে।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বিএনপির সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের চারজন রাজনীতিক যোগ দিচ্ছেন। তাঁরা হলেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের স্বতন্ত্র সাংসদ সায়মন ডেনচুক, সে দেশের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) আন্তর্জাতিক-বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ও সাবেক ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ফিল বেনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা বারবারা মুর ও শিকাগো সিটির কাউন্সিলর জোসেফ মুর। এর মধ্যে সায়মন ডেনচুক ঢাকায় পৌঁছেছেন। ফিল বেনিয়ন, জোসেফ মূর ও বারবারা মুর আজ এসে পৌঁছাবেন বলে বিএনপির নেতা জানিয়েছেন।
বিএনপির সূত্র জানায়, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো সিটিতে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নামে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়। এতে কাউন্সিলর জোসেফ মুরের ভূমিকা ছিল। এ কারণে তাঁকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
সম্মেলনে প্রায় অর্ধশত বিদেশি রাজনীতিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে প্রতিবেশী ভারতসহ সার্কভুক্ত দেশগুলোর ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের প্রধানেরা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, কানাডা, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড; এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের প্রধানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
সম্মেলনের আন্তর্জাতিক-বিষয়ক উপকমিটির আহ্বায়ক শফিক রেহমান বলেন, সম্মেলনের স্থান ও সময় নিয়ে জটিলতা থাকায় অনেকের সঙ্গে শেষ মুহূর্তে যোগাযোগ হয়। যে কারণে অনেকের ইচ্ছা থাকলেও সময়স্বল্পতার কারণে আসতে পারছেন না। আবার অনেকে ভিসা চেয়েও পাননি।
বিএনপির আন্তর্জাতিক-বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, আগামী সোমবার থেকে যুক্তরাজ্যে পার্লামেন্টে বাজেট অধিবেশন শুরু হওয়া এবং ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নির্বাহী কমিটির অধিবেশন শুরু হওয়ায় এসব দেশের আমন্ত্রিত অতিথিরা অনেকে আসতে পারছেন না।
বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা বলেন, সম্মেলন ঘিরে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনা আছে। তবে চেয়ারপারসন পদে খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদে তাঁর ছেলে তারেক রহমান ইতিমধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। অন্য পদগুলোতেও নির্বাচন হচ্ছে না। তাই কোনো চমক থাকছে না। তবে সম্মেলনে মহাসচিব পদে কারও নাম ঘোষণা করা হলে সেটা একটা আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, অতীতে কোনো সম্মেলনে মহাসচিবের নাম ঘোষণা করা হয়নি। সম্মেলনের পরে ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে বিএনপির কাঠামোগত পরিবর্তনের কিছু সুপারিশ দলের স্থায়ী কমিটি গত বৃহস্পতিবার রাতের বৈঠকে নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় কমিটির আকার আরও বড় হবে। পাশাপাশি ঘোষণাপত্রে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দলের অবস্থান এবং দলের ১৯ দফা কর্মসূচিও আলাদাভাবে যুক্ত করবে বিএনপি। সম্মেলনে সেগুলো অনুমোদনের পর গঠনতন্ত্রে যুক্ত হবে।

বিএনপির গঠনতন্ত্রে সম্ভব হলে বছরে একবার সম্মেলন করা এবং প্রতি তিন বছরে একবার সম্মেলনের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাহী কমিটি করার বিধান আছে। সর্বশেষ ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর পঞ্চম সম্মেলন করেছিল বিএনপি।
বিএনপির সূত্র জানায়, সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্ব হবে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন চত্বরে। দ্বিতীয় পর্বে কাউন্সিলরদের নিয়ে অধিবেশন হবে ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে। এ অধিবেশনে গঠনতন্ত্রের সংশোধনী অনুমোদন এবং নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। গঠনতন্ত্রে নির্বাহী কমিটি সম্মেলনে নির্বাচনের বিধান থাকলেও তা করা হয় না। দেখা গেছে, কাউন্সিলররা কমিটি গঠনের একক ক্ষমতা দলের চেয়ারপারসনকে অর্পণ করেন। তিনি পরবর্তী সময়ে কমিটির নেতাদের মনোনীত করেন। এবারও সে রকম হবে বলে নেতাদের ধারণা।
দলীয় সূত্র জানায়, সম্মেলনে কাউন্সিলর, ডেলিগেট, আমন্ত্রিত অতিথিসহ ৩০ থেকে ৩৫ হাজার নেতা-কর্মী ও সমর্থকের সমাগম হতে পারে। এর মধ্যে ৩ হাজার ১০০ জন কাউন্সিলর, ৮ থেকে ৯ হাজার ডেলিগেট আছেন। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি প্রায় ৮০০ বিশিষ্ট নাগরিককে আমন্ত্রণ করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় কমিটির আকার বাড়ছে: বিএনপির বর্তমান গঠনতন্ত্রে জাতীয় নির্বাহী কমিটি ৩৫১ সদস্যের। দলের চেয়ারপারসন চাইলে আরও ১০ শতাংশ বাড়াতে পারেন। গঠনতন্ত্রের এ ক্ষমতাবলে ইতিমধ্যে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৮৬ জনে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্ষদ বৃহস্পতিবারের বৈঠকে দলের কাঠামোগত কিছু পরিবর্তন অনুমোদন করেছে। এর ফলে নির্বাহী কমিটির সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য  বলেন, ভাইস চেয়ারম্যান ১৭ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ জন করা, যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকের সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন যুগ্ম মহাসচিব আছেন সাতজন। সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদক আছেন ছয়জন করে। তা বাড়িয়ে ৮ থেকে ১১ জন করে করা হতে পারে। তবে স্থায়ী কমিটি ১৯ সদস্যেরই থাকছে।
নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ বিএনপির গঠনতন্ত্রে যুক্ত হচ্ছে। ক্ষুদ্রঋণ-বিষয়ক একটি সম্পাদক বা এ বিষয়ক একটি উপকমিটি সৃষ্টি করা হবে। নতুন করে বিএনপির উপদেষ্টা পরিষদ গঠন এবং ১৫টি উপকমিটি করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, বিএনপির কমিটির আকার কেমন হবে তা কাউন্সিলররা সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি বলেন, বিষয়ভিত্তিক উপকমিটি গঠনের বিষয়টি এখনো গঠনতন্ত্রে আছে। জিয়াউর রহমানের সময় এটি অনুসরণ করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে এটি আর সেভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
প্রস্তুতি সম্পন্ন: গতকাল শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, কাউন্সিলকে সফল করতে গঠিত সব উপকমিটি তাদের কার্যক্রম শতভাগ সম্পন্ন করেছে। সারা দেশ থেকে কাউন্সিলর ও ডেলিগেটরা ঢাকায় পৌঁছে গেছেন। তিনি বলেন, কাউন্সিল ঘিরে সারা দেশের বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই কাউন্সিলকে ঘিরে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।
রিজভী সম্মেলনের জন্য ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের পার্শ্ববর্তী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অনুমতি দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY