ষষ্ঠ কাউন্সিলে- ঘুরে দাঁড়ানোর ডাক দেবেন খালেদা জিয়া

0
431

জ্বালাও-পোড়াও এবং হিংসা-বিদ্বেষ নয়, ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে নিয়ে সুন্দর দেশ গড়ার ডাক দেবেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আগামী ১৯ মার্চ অনুষ্ঠেয় দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের বক্তৃতায় দলটির চেয়ারপারসন এ আহ্বান জানাবেন। অতীতের ভুল-ত্র“টি থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার আশ্বাস থাকবে তার বক্তব্যে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনাসহ বিনিয়োগের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি সংক্রান্ত নানা প্রতিশ্রুতি থাকবে তার বক্তৃতায়। দীর্ঘ ছয় বছর পর আয়োজিত সম্মেলনে খালেদা জিয়া ভাষণ দেবেন। দেশী ও বিদেশীরা যাতে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে সেদিকটিই প্রাধান্য দিয়ে ভাষণের স্ক্রিপ্ট তৈরি হচ্ছে।
আগামী ১৯ মার্চ দলের সম্মেলন উপলক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা চেয়ারপারসনের বক্তব্য চূড়ান্তের জন্য ব্যস্ত সময় পার করছেন। এরই মধ্যে তৈরি করা হয়েছে বক্তব্যের খসড়া। এই বক্তব্যকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমত, বর্তমান সরকারের অপশাসন, গুম, খুন, নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরা হবে। দ্বিতীয়, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বিশেষ নির্দেশনা দেবেন খালেদা জিয়া। আর তৃতীয়, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে কী করবেন সে বিষয়ে প্রতিশ্রুতি তুলে ধরবেন তিনি। খালেদা জিয়ার বক্তব্যের খসড়ায় জামায়াত নিয়ে বিএনপির অবস্থান কী হবে সেই বিষয়টি এখনও রাখা হয়নি। বিএনপিও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চায় এই বিষয়টি আবারও তুলে ধরবেন খালেদা জিয়া। তবে তা যেন আন্তর্জাতিক মানের হয় সে বিষয়টি নিশ্চিতের আহ্বান থাকবে।
জানা গেছে, বর্তমান সরকারের অন্যায় আবদার রাখতে গিয়ে পুলিশ প্রশাসন, সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তা দুর্নীতি, অপশাসন, জুলুম, নির্যাতনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে বাধ্য হয়েছেন তাদের জন্য দায়মুক্তির ঘোষণা থাকবে। ক্ষমতায় গেলে ওইসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ার আশ্বাস দেয়া হবে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নিয়ে দলের অবস্থান স্পষ্ট করে এর বিরুদ্ধে বিশ্ব সম্প্রদায়কে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানাবেন খালেদা জিয়া।
বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনই দায়ী- তার বক্তব্যে এই বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সব দলের অংশগ্রহণে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক সব রাজনৈতিক দল ও শ্রেণী-পেশার মানুষকে একই প্লাটফর্মে আসার আহ্বান জানাবেন তিনি। তবে বিগত পৌর, উপজেলা ও সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের উদাহরণ টেনে বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় সে বিষয়টিও স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করবেন। সবার সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের আশ্বাস দেবেন। সবমিলিয়ে কাউন্সিলে খালেদা জিয়ার এমন একটি বক্তব্য তৈরি হচ্ছে যাতে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে বিএনপির প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস জন্মে। তারা যেন বিশ্বাস করে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় গেলে তার দেয়া প্রতিশ্রুতি তিনি রক্ষা করবেন। চেয়ারপারসনের প্রতিশ্রুতি তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে। সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এসব তথ্য।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, আগামী ১৯ মার্চ বিএনপির কাউন্সিল ঘিরে নেতাকর্মী ছাড়াও সব শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কাউন্সিলে বিএনপি চেয়ারপারসন কী বক্তব্য রাখেন সেদিকে সবার নজর থাকবে।
তিনি বলেন, এবারের কাউন্সিলে দলের চেয়ারপারসনের বক্তব্যে বিশেষ কিছু নির্দেশনা থাকতে পারে। বর্তমান এই প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। চেয়ারপারসনের বক্তব্যে সেই আহ্বানও আসতে পারে।
আগামী কাউন্সিলে খালেদা জিয়ার বক্তব্যের খসড়া তৈরির কাজ করছেন ড্রাফটিং উপ-কমিটি। ওই কমিটির আহ্বায়ক স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। বক্তব্যের খসড়া তৈরিতে তারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। সংশ্লিষ্ট অনেকের পরামর্শও নেয়া হচ্ছে। জাতীয়তাবাদী ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের মতামতও নেয়া হচ্ছে। চেয়ারপারসনের প্রায় এক ঘণ্টার বক্তব্যের খসড়া তৈরি শেষ করে এনেছেন তারা। আগামীকাল বৈঠকে বসছেন ড্রাফটিং কমিটি। ড্রাফটিং কমিটি বক্তব্যের খসড়া তৈরির কাজ শেষ করার পর তা খালেদা জিয়ার কাছে জমা দেবেন। তিনি সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে তা নিয়ে আলোচনা করবেন। কোথাও ভুল-ত্র“টি থাকলে তা সংশোধনের পাশাপাশি নতুন কোনো তথ্য সংযোজন বা বিয়োজনও হতে পারে। এরপর চূড়ান্ত হবে তার বক্তৃতা। ড্রাফটিং কমিটি যে বক্তব্য তৈরি করছেন শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে নতুন আরও নানা বিষয় সংযোজন হতে পারে বলে দলের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র দাবি করে। কাউন্সিলের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘোষণা থাকবে। যা চেয়ারপারসন কারও সঙ্গেই শেয়ার করছেন না। কাউন্সিলের আগের দিন আস্থাভাজন সিনিয়র কয়েক নেতার সঙ্গে আলোচনা করে ওই বিষয়গুলো চূড়ান্ত করা হতে পারে।
জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম খান যুগান্তরকে বলেন, চেয়ারপারসনের বক্তব্য এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এ লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে। খসড়া তৈরির পর তা চেয়ারপারসনকে দেখানো হবে। তিনি অনুমোদন দিলেই তা চূড়ান্ত করা হবে।
খসড়া বক্তব্যের সঙ্গে জড়িত নেতারা জানান, খালেদা জিয়া তার বক্তব্যের শুরুতে জাতীয় নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। স্বাধীনতার মাসে শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করবেন তিনি। এরপর বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সমালোচনা থাকবে। দেশে কোনো গণতন্ত্র নেই, হত্যা, খুন, গুম আজ নিত্যদিনের ঘটনা। ঘরের মধ্যেও কারও নিরাপত্তা নেই। ব্যাংক, শেয়ারবাজার লুট, বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচারসহ সরকারের নানা অপকর্ম। বড় বড় প্রকল্পের নামে অর্থ লুটপাট, কুইক রেন্টালের নামে ক্ষমতাসীন দলের কিছু লোকদের লুটপাটের সুযোগ করে দেয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হতে পারে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা নানাভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার এই বিষয়টিও তার বক্তৃতায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।
খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে কোনো বিনিয়োগ নেই। চাঁদাবাজির কারণে অনেকে বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছেন না। গার্মেন্ট শিল্প ধ্বংসের পথে। গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে দেশীয় বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগে উৎসাহ পাচ্ছেন না। বর্তমানে গণমাধ্যমের কোনো স্বাধীনতা নেই। বক্তব্যের বড় একটি অংশজুড়ে থাকবে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বিষয়। নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে খালেদা জিয়ার আহ্বান থাকবে, বর্তমান সরকার জাতির ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে। এই জগদ্দল পাথরকে সরাতে আমাদের আবারও তৈরি হতে হবে কঠোর-কঠিন সংগ্রামের জন্য। এর জন্য প্রয়োজন শুধু নিজেদের ঐক্য এবং জনগণকে পাশে পাওয়া। আগামী দিনে এটাই হবে আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তার আরও আহ্বান থাকবে, অতীতে নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি থাকলে তা দূর করতে হবে। কারও কোনো অভাব-অভিযোগ থাকলে তা দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হবে। তৃতীয় কোনো পক্ষ যাতে দলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারে সেদিকে সতর্ক থাকার পরামর্শ থাকবে তার। কাউন্সিলের পরপরই নির্বাহী কমিটি পুনর্গঠন করা হবে। বিগত সময়ে যারা রাজপথে ছিলেন তাদের মূল্যায়ন করা হবে। এবার তরুণদের প্রাধান্য দেয়া হবে বলেও ঘোষণা আসবে। যারা নিষ্ক্রিয় ছিলেন, তাদের দল থেকে বাদ দেয়া হবে না এমন আশ্বাসও দেবেন তিনি।
ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে কী করবেন তার একটি ফিরিস্তি তুলে ধরবেন খালেদা জিয়া। দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও অনাচার কঠোর হাতে দমন করাকেই অগ্রাধিকার দেয়া হবে। এবারের কাউন্সিলের স্লোগানেও তার বহিঃপ্রকাশ রয়েছে। ‘দুর্নীতি, দুঃশাসন হবে শেষ, গণতন্ত্রের বাংলাদেশ’ হচ্ছে এবারের কাউন্সিলের মূল স্লোগান। ক্ষমতায় গেলে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয়, শক্তিশালী ও কার্যকর করা, জনগণের মৌলিক অধিকার তথা অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের অধিকার নিশ্চিত করা; আইনের শাসন, সর্বজনীন মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্র“তি দেবেন তিনি। বাংলাদেশকে একুশ শতকের উপযোগী করে গড়ে তোলা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশে নানামুখী উদ্যোগ নেয়ার কথাও জানাবেন তিনি।
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ সম্পর্কেও বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট করবেন খালেদা জিয়া। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কোনো সন্ত্রাসীগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হবে না। জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না। যারা এর সঙ্গে জড়িত থাকবে তাদের কঠোরভাবে দমন করার ঘোষণাও থাকছে তার বক্তব্যে। প্রতিবেশী দেশগুলোকে আশ্বস্ত করতেই তার বক্তব্যে এই বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে দেশীয় বিনিয়োগে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হবে। এর মধ্যে ব্যাংকের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা, গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চয়তাসহ কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো, চাঁদাবাজি বন্ধে নেয়া হবে বিশেষ উদ্যোগ। ক্ষমতায় গেলে নারী উন্নয়ন, সবার কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসনের ব্যবস্থা ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি করাসহ নানা প্রতিশ্র“তি তুলে ধরবেন খালেদা জিয়া।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY