বাসাতেই ভাইবোন খুন?

0
354

‘রেস্তোরাঁর খাবার খেয়ে দুই সন্তানের মৃত্যু হয়েছে’—স্বজনদের এমন দাবির পর ২৪ ঘণ্টাও পেরোয়নি। এর মধ্যেই ঘটনা মোড় নিয়েছে অন্যদিকে। ময়নাতদন্তের পর চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে তাঁরা মনে করছেন, শিশু দুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। রাজধানীর বনশ্রীর এ ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত পরিবার কোনো মামলা করেনি।
পুলিশ বলছে, এ ঘটনায় বাবা-মাসহ কেউ সন্দেহের বাইরে নন। দুই সন্তানের মরদেহ মর্গে রেখে বাবা-মায়ের গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ায় এবং মামলা না করায় এ ঘটনা নিয়ে রহস্য ঘনীভূত হয়েছে। গতকাল রাত নয়টার দিকে জামালপুর কবরস্থানে দুই ভাইবোনের লাশ দাফনের পর র্যাবের সদস্যরা বাবা-মাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তবে রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁরা কী বলেছেন, তা জানা যায়নি।
এ ছাড়া কাল বনশ্রীর বি ব্লকের ৪ নম্বর রোডের বাসা থেকে দুই দারোয়ান, দুই গৃহশিক্ষিকা ও এক স্বজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র্যাব-৩-এর ক্যাম্পে নেওয়া হয়।
দুই শিশুর মৃত্যুর পর গত সোমবার রাতে চায়নিজ রেস্তোরাঁর যে তিন কর্মচারীকে আটক করা হয়েছিল, গতকাল তাঁদের ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়। পরে আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
মৃত দুই শিশু নুসরাত আমান (১২) ও আলভী আমানের (৬) লাশের ময়নাতদন্তের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের শিক্ষক সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি, শিশু দুটিকে হত্যা করা হয়েছে। দুজনের গলাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন আছে। নিশ্চিত হতে তাদের পাকস্থলী, কিডনি ও যকৃতের নমুনা মহাখালীর রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে।’
লাশের ময়নাতদন্ত করেছেন—এমন একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শিশু দুটিকে খুব সম্ভবত গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। এমন হতে পারে, শিশু দুটির মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। দুজনেরই জিব কামড়রত অবস্থায় ছিল। গলার মাঝখানে ও চিবুকে নখের আঁচড় ছিল ও চোখে রক্ত জমাট বেঁধে ছিল। সাধারণত কাউকে গলা টিপে হত্যা করলে জিব কামড়রত অবস্থায় থাকে। ওদের পাকস্থলীতে থাকা খাবারের অংশেও অস্বাভাবিক কিছু পাওয়া যায়নি।
গত সোমবার রাতে শিশু দুটির বাবা আমান উল্লাহর বন্ধু জাহিদুল ইসলাম পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে বলেন, চায়নিজ রেস্তোরাঁ থেকে আগের দিন আনা খাবার খেয়ে দুটি শিশু অচেতন হয়ে যায়। তাদের মা মাহফুজা মালেক ফোনে আমান উল্লাহকে বিষয়টি জানান। আমান উল্লাহ বাড্ডায় নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ছিলেন। আমান উল্লাহই তাঁকে ফোন করে বাসায় যেতে বলেন। তিনি (জাহিদুল ইসলাম) দ্রুত বনশ্রীতে যান ও সেখান থেকে শিশু দুটিকে নিয়ে প্রথমে আল-রাজী হাসপাতাল ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
ঢাকা মেডিকেল কলেজে শিশু দুটির ময়নাতদন্ত চলার সময় বাবা আমান উল্লাহ ও মা মাহফুজা মালেক কেউ-ই উপস্থিত ছিলেন না। সকালেই তাঁরা ঢাকা ছাড়েন। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে জামালপুর সদরের ইকবালপুরের বাসায় পৌঁছে আমান উল্লাহ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘বিকেলে বাচ্চাদের দুই গৃহশিক্ষিকা একই সময়ে এসেছিলেন বলে শুনেছি। যখন তাঁরা পড়াচ্ছিলেন, তখন ওদের মা পাশের ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন। বিকেল পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটার দিকে ওদের মা উঠে দেখেন বাচ্চারা মেঝেতে অচেতন পড়ে আছে। দরজা খোলা।’ তিনি আরও জানান, সন্ধ্যা ছয়টার দিকে স্ত্রী ফোন করে সন্তানদের অচেতন হওয়ার খবর দিলে তিনি তখনই বাসার দিকে রওনা হন। এর মধ্যেই ওদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর ওদের মৃত ঘোষণা করা হয়।সন্তানদের মরদেহ মর্গে রেখে ঢাকা ছাড়লেন কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে আমান উল্লাহ বলেন, ‘বাচ্চা মারা গেছে। আমাদের হুঁশ নাই। আত্মীয়স্বজনেরা আছেন, তাঁরাই বাচ্চাদের নিয়ে আসবেন।’ মামলা করেননি কেন—এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব তিনি এড়িয়ে গেছেন। শুধু বলেছেন, ‘আমি বিচার চাই।’ মা মাহফুজা মালেক কোনো কথা বলেননি। গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পর পরিবারের সদস্যরা জানান, তিনি অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে শিশু দুটির লাশ গ্রহণ করতে গিয়েছিলেন চাচা আবুল হোসেন। তিনি বলেছেন, পরিবারের সবার সঙ্গে আলোচনার পর মামলা করবেন কি না, সিদ্ধান্ত নেবেন।
পুলিশের মতিঝিল অঞ্চলের উপকমিশনার মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন নিশ্চিত করেছেন, গতকাল রাত আটটা পর্যন্ত পরিবারের তরফ থেকে কোনো মামলা হয়নি। পুলিশ ঘটনাটি খতিয়ে দেখছে। সন্দেহের তালিকা থেকে কেউই বাদ যাচ্ছে না বলে উল্লেখ করেন তিনি।
গতকাল সকালে বনশ্রীর ৪ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাসার পঞ্চমতলার যে ফ্ল্যাটটিতে আমান উল্লাহ ও মাহফুজা মালেক দম্পতি থাকেন, সেখানে গিয়ে বাসার সদর দরজা খোলা পাওয়া যায়। শুধু একটি কক্ষ ছিল তালাবদ্ধ। অগোছালো অবস্থায় পড়ে থাকা দুই কক্ষের দুই টেবিলে নুসরাত ও আলভী আমানের বই-খাতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা গেছে। বাসাটিতে নিহত দুই ভাইবোন ও তাদের মা-বাবার সঙ্গে দাদিও থাকতেন। সকালে তিনিও ছেলে-ছেলে বউয়ের সঙ্গে জামালপুরে রওনা দেন। চাবি রেখে যান ওবায়দুল ইসলাম নামের একজনের কাছে। ওবায়দুল বলেন, নিহত শিশু দুটির মা মাহফুজা মালেক তাঁর ফুফাতো বোন। খবর পেয়ে সোমবার রাত সাড়ে তিনটার দিকে তিনি বাসায় আসেন। এরপর সকাল সাড়ে আটটার দিকে তাঁর কাছে বাসার চাবি রেখে সবাই জামালপুর চলে যান। তিনি শিশু দুটির আকস্মিক মৃত্যু সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
ওই ভবনের অন্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারাও কিছু বলতে পারেননি। ঘটনার দিন আমান উল্লাহর ফ্ল্যাটের পাশের ফ্ল্যাটটি (পাঁচ-বি) ফাঁকা ছিল। বাসার দারোয়ান পিন্টু মিয়া বলেন, ‘সোমবার বেলা তিনটার দিকে একজন এবং চারটার দিকে আরেকজন শিক্ষক বাড়িতে পড়াতে এসেছিলেন। সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার দিকে একটি গাড়ি নিয়ে দুজন বাসায় আসেন। তাঁরা দুই বাচ্চাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। তারপর জানতে পেরেছি তারা মারা গেছে।’ বাসায় কোনো সমস্যার কথা কখনো শুনেছিলেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মারামারি বা ঝগড়ার কোনো ঘটনার কথা শুনিনি।’ এক বছর ধরে আমান উল্লাহ সপরিবারে ওই ফ্ল্যাটে বসবাস করছিলেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই গাড়িতে চালক ছাড়াও আরও দুজন ছিলেন।

প্রতিবেশী কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে তাঁরাও মৃত্যুর খবর ছাড়া আর কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন।
জানা গেছে, শিশু দুটিকে প্রথম আল-রাজী হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। আল-রাজী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা বা সাতটার দিকে তারা হাসপাতালে এসে পৌঁছায়। ওই সময় চিকিৎসকের সঙ্গে ছিলেন ব্রাদার মো. জুবায়ের। তিনি জানান, শিশু দুটির জীবন ছিল না। সে কারণেই কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমান উল্লাহ ও মাহফুজা মালেক পরস্পরের চাচাতো ভাইবোন। জামালপুরের ইকবালপুরের বাসাটি মাহফুজা মালেকের বাবার বাড়ি। মাহফুজা মালেকের বোন আফরোজা মালেক গত সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকেই গ্রামের বাড়িতে ফোন করে দুই শিশুর মৃত্যুসংবাদ দেন।
ঘটনাস্থল থেকে একটু দূরের হলি ক্রিসেন্ট (ইন্টারন্যাশনাল) স্কুল অ্যান্ড কলেজের নার্সারিতে পড়ত আলভী আমান। স্কুলটির প্রভাতি শাখার সমন্বয়ক মাহাদি মাসুদ বলেন, আলভী প্রভাতি (গোলাপ) শাখার ছাত্র ছিল। প্রতিদিনের মতো সোমবার সকাল নয়টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ক্লাস করে সে বাসায় ফিরে যায়। আলভী নিয়মিত ক্লাসে আসত এবং পড়ালেখাতেও ভালো ছিল। ঘটনার দিন আলভীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ওর হাতের একটি আঙুলে একটু ফোসকা পড়েছিল। আর কোনো সমস্যার কথা আলভী বলেনি। সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক।
নুসরাত আমান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের (প্রধান শাখা) পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত। স্কুল কর্তৃপক্ষের কারও সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে ওই এলাকার একটি কোচিং সেন্টারে গিয়ে জানা যায়, নুসরাত কোচিংটিতে গত জানুয়ারি মাসে ভর্তি হয়েছিল। ২০ থেকে ২৫ দিনের মতো ক্লাস করার পর আর ক্লাসে আসেনি।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY