ঋণের সুদ হার কমলেও বাড়ছে না বিনিয়োগ

0
366

চাহিদা না থাকায় ব্যাংকে ঋণের সুদ হার কিছুটা কমেছে। সরকার চেষ্টা করছে তা আরও কমিয়ে আনতে। এরপরেও বাড়ছে না বেসরকারি বিনিয়োগ।
ঋণ দেওয়ার জন্য তাদের হাতে আছে সোয়া লাখ কোটি টাকার বাড়তি অর্থ। এর ফলে নতুন আমানত সংগ্রহেও তেমন আগ্রহ নেই ব্যাংকগুলোর।
এতে কমেছে আমানতের সুদের হারও।
দেশে অনেক দিন ধরেই বিনিয়োগের হার প্রায় একই জায়গায় স্থির হয়ে আছে। বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটাতে এবং সুদের হার কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপরে চাপ রয়েছে। ব্যবসায়ীরাও দীর্ঘদিন ধরেই সুদের হার কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের মতে, ১৫ শতাংশেরও বেশি সুদ হার নিয়ে লাভজনকভাবে ব্যবসা সম্ভব নয়।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ বিরূপাক্ষ পাল প্রথম আলোকে বলেন, বাজারব্যবস্থার চাপে দেশের মধ্যে সুদ হার কমছে। তবে কমার গতি অনেকটাই শ্লথ। গতি আরও বাড়লে সেটি ভালো হতো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোতে আমানতে গড় সুদ হার হয়েছে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আর গত বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে এই হার ছিল ৭ দশমিক ২৬ শতাংশ। দেশে এখন মূল্যস্ফীতির হার ৬ দশমিক ১ শতাংশ। এই হিসাবে আমানতের প্রকৃত সুদের হার খুবই কম, মাত্র দশমিক ২৪ শতাংশ। অন্যদিকে, এই ডিসেম্বরে ঋণের গড় সুদ হার হয়েছে ১১ দশমিক ১৮ শতাংশ। জানুয়ারিতে তা ছিল ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি নিশ্চিত যে, ব্যাংক খাতে সব ধরনের সুদ হারই ১০ বছর আগের তুলনায় এখন সর্বনিম্ন।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, দেশে এখন ব্যাংকগুলোর কাছে থাকা মোট আমানতের পরিমাণ ৭ লাখ ৪৫ হাজার ২৩ কোটি টাকা। আর ব্যাংক এখন পর্যন্ত দিয়েছে ৭ লাখ ৯১ হাজার ৫৯১ কোটি টাকার ঋণ। গত এক বছরে ব্যাংকগুলোতে আমানত বৃদ্ধির হার ১৩ শতাংশ আর ঋণ বেড়েছে সাড়ে ৯ শতাংশ। অর্থাৎ সরকার আমানতের হার কমালেও সাধারণ মানুষের বিকল্প না থাকায় ব্যাংকেই অর্থ রাখছে। অথচ বেসরকারি খাত বিনিয়োগে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
সুদ হার খানিকটা কমলেও বিনিয়োগ আকৃষ্ট হচ্ছে না কেন—জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘সুদের নিম্ন হারই যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগের জন্য বিদ্যমান অন্য প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর না হলে সুদের হার কমলেই বিনিয়োগ বাড়বে না।’ তবে তিনি এ-ও বলেন, আজকে সুদের হার কমলে কালকেই বিনিয়োগ বেড়ে যাবে না, বরং ভবিষ্যতে বাড়বে।
রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলো গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে সুদের হার সামান্য কমিয়েছে। সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক, বিডিবিএল, কৃষি—এই সাত ব্যাংক গত মাসে বৈঠক করে ঋণের সুদের হার ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন হার ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর। সরকারের আশা, এর প্রভাব পড়বে বেসরকারি ব্যাংকে।
তবে আমানত ও ঋণ—দুই সুদের হারই এখন কম এবং বিনিয়োগের জন্য এখনই উপযুক্ত সময় বলে মনে করেন ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার। বেসরকারি ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর অনেক পরে সরকারি ব্যাংকগুলো এগিয়ে এসেছে উল্লেখ করে প্রথম আলোকে আলী রেজা ইফতেখার বলেন, ‘এটা না করলে সরকারি ব্যাংকগুলো নির্ঘাত ভালো গ্রাহক হারাবে।’ শীর্ষ ২০ ভালো গ্রাহককে ইস্টার্ন ব্যাংক একক অঙ্কের সুদে ঋণ দিয়ে আসছে বলেও জানান তিনি।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের সুদের হার ‘একটি উপাদান’ বলে উল্লেখ করলেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি হোসেন খালেদ। তিনি বলেন, ব্যাংকঋণের সুদের হার যেটুকু কমেছে, সেই বিবেচনায় কিন্তু বিনিয়োগ বাড়ছে না। বর্তমানে তারল্যের কোনো সমস্যা নেই। অনেক বড় প্রতিষ্ঠানই ৯ শতাংশ সুদ হারে ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছে।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি আরও বলেন, বিনিয়োগে বড় সমস্যা হচ্ছে অবকাঠামোগত—গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ মিলছে না। এর সঙ্গে রয়েছে বন্দরের বাধাবিপত্তি। কাস্টমের প্রক্রিয়া যেখানে সহজ হওয়ার কথা ছিল, সেখানে দিন দিন জটিলতা বাড়ছে। গ্যাস-সংযোগের দুই হাজারের বেশি আবেদন পড়ে আছে তিতাসে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব সংযোগ দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে উদ্যোক্তারা কারখানা করেছেন। সংযোগ পেলে এ মুহূর্তেই তাঁরা উৎপাদন শুরু করতে পারেন।
বিরূপাক্ষ পালও মনে করেন, সুদ হার বিনিয়োগের কেবল একটি শর্ত। দ্বিতীয়টি হচ্ছে অবকাঠামো। তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আস্থা। আশার কথা হচ্ছে, উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থা ফিরে পাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
এদিকে, বছর ঘুরলেই টাকার মান কমে। অর্থাৎ আমানতের সুদ বর্তমানে এত কম যে, মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলে ব্যাংকে টাকা রাখাকে অনেকে লাভজনকই না মনে করতে পারেন—এমন প্রশ্নের জবাবে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, মূল্যস্ফীতির এই হিসাব অর্থনীতিবিদদের, সাধারণ মানুষের নয়। টাকার নিরাপত্তার জন্যই মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখে এবং যুগ যুগ ধরে রাখবেও।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY