পাকিস্তানি পতাকা ওঠেনি সারদায়

0
456

১৯৭০-এর মার্চ মাসে আমি সারদা পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল ছিলাম। ২৩ মার্চ সারদা একাডেমিতে পাকিস্তানের পতাকা ওঠানো হয়নি, এ খবর পেয়ে রাজশাহী গ্যারিসনের লোকজন এমনকি জেলা প্রশাসনের কেউ কেউ সারদা এসেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কর্মসূচির সঙ্গে সংগতি রেখে সারদায় কালো পতাকা ওঠানো হয় এবং পাকিস্তানি পতাকা নিশ্চিহ্ন করা হয়।
৩১ মার্চের শেষ রাতে খবর পেলাম যে একাডেমির পাশ দিয়ে রাতের অন্ধকারে কিছু সংখ্যক সৈন্য চলাচল করেছে। মিনিটকাল বিলম্ব না করে পরিবারসহ আমার নিজস্ব গাড়িতে করে একাডেমির বাইরে চলে আসি। সঙ্গে ব্যবহারের জন্য কাপড় চোপড় ও টাকা পয়সা কিছুই নিয়ে আসার সময় পাইনি। একাডেমিতে এই নির্দেশ রেখে আসি যে, এবার যেন প্রত্যেকে নিজ নিজ নিরাপত্তার পথ বেছে নিতে বিলম্ব না করে।
অন্ধকারে গরুর গাড়িতে নওগাঁর দিকে এগোতে শুরু করি। রাত ১১টায় পথিমধ্যে বাগমারা থানাঘরে উঠে দেখি, সেখানে কেউ নেই। কিছুক্ষণ পর একজন সিপাহীর দেখা পেলাম। ওসি বা অন্যান্য পুলিশ কোথায় সে জানে না। ওসির পরিবারের কাছে পরিচয় দিয়ে বৈঠকখানায় বসি। গভীর রাতে তিনি আমাদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করেন। ওই সিপাহী খবর দিল, ওই জায়গায় আমাদের থাকা নিরাপদ হবে না।
সিপাহী বহু কষ্টে একটি গরুর গাড়ির বন্দোবস্ত করে দেয়। আমরা ওই রাতেই নওগাঁর দিকে এগিয়ে চলি। সকাল নয়টার দিকে একটি বাজারে এসে পৌঁছাই। সেখানে আমাকে পাঞ্জাবি বলে সন্দেহ করা হয় এবং আমার বাঙালিত্বের পরিচয় দিতে হয়। পরিবারসহ নওগাঁয় আমাদের আত্মীয় পুলিশ ইনসপেক্টর লোদীর বাসায় যাচ্ছিলাম।
এই সময় সান্তাহারে বাঙালি-অবাঙালিদের মধ্যে হিংসাত্মক কার্যকলাপ বন্ধ করার কাজে লোদী ব্যতিব্যস্ত। ম্যাজিস্ট্রেট আজিজুর রহমান ও মেজর নাজমুল হক মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত। রাজশাহী জেলার জন্য প্ল্যান বানানো হলো। আমি সারদা অঞ্চলের ভার নিই। সঙ্গে থাকেন সারদা ক্যাডেট কলেজের ক্যাপ্টেন রশীদ ও অধ্যাপক আজিমুদ্দিন। ব্যবস্থা করা হলো যে পাক-সেনাবাহিনীর আক্রমণে নওগাঁর নিরাপত্তা বিপন্ন হলে ইনসপেক্টর লোদীর পরিবার আমার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকে নিয়ে ধামুরহাট বর্ডার দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেবে।
১২ এপ্রিল আমি সারদায় ফিরে আসি। তখন একাডেমি প্রায় জনশূন্য। ভাইস প্রিন্সিপাল শৈলেন্দ্র কিশোর চৌধুরীর স্ত্রী সন্তানসম্ভবা ছিলেন বলে নিরুপায় হয়ে তাঁরা সারদায় রয়ে গেছেন। জনশূন্য একাডেমিতে থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই দেখে রশীদ ও আমি ঠিক করি, ১৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় চারঘাট হয়ে কুষ্টিয়ার পথে ভারতে প্রবেশ করব।
এদিকে ঢাকা থেকে মাঠ-ঘাট পুড়িয়ে জ্বালিয়ে পাকবাহিনী নাটোরে এসে পৌঁছেছে। গুপ্তচরেরা আমাদের অবস্থান ওদের জানিয়ে দেবে, এ বিষয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ ছিল না। দুটি রাত সারদার বাইরে চারঘাট থানাঘরে কাটাই। থানায় কেউ ছিল না। শুধু আমি এবং সারদার একজন বাঙালি সিপাহী।
১৪ এপ্রিল বিকেল চারটায়, সঙ্গে কিছু কাপড় চোপড় নিয়ে সারদা থেকে বেরিয়ে পড়ার জন্য তৈরি হচ্ছি, ঠিক এমন সময় মেশিনগানের বিকট শব্দ শুনতে পেলাম। মিনিট খানেকের মধ্যে খবর পেলাম যে, পাকবাহিনী তিন দিক থেকে একাডেমি ঘেরাও করেছে এবং অফিসার্স মেসে পৌঁছেছে। মুহূর্তকাল বিলম্ব না করে সবকিছু ফেলে পদ্মার দিকে দৌড়ে পালাই।
সাঁতরে পার হবার জন্য পানিতে নেমেছি, পেছনে তাকিয়ে দেখতে পাই নিকটবর্তী চরের নালায় একটি ছোট ঘাসের নৌকায় কয়েকজন লোক ওঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু ওই সময় নদীতে এগোলেই মাঝি গুলি খেয়ে মরবে, এই ভয়ে বুড়ো মাঝি কাউকে নৌকাতে উঠতে দিচ্ছে না। ঘাসভর্তি ছোট নৌকাটিতে বড়জোর দু’জন উঠতে পারে। আমি চরে ফিরে আসি। নৌকার কাছে গিয়ে মাঝিকে অনুরোধ জানাই, আমাকে ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে চরের ধার দিয়ে কিছুদূর নিয়ে যাওয়ার জন্য। সৈন্যদের চোখে ধূলো দিয়ে পালানোর আর কোনো বুদ্ধি সে সময় মাথায় আসেনি। একাডেমির গণ্ডির বাইরে এসে নৌকাটি সরাসরি নদী পার হওয়ার পথে এগিয়ে চলে। এ সময় সামরিক হেলিকপ্টার থেকে আগুন ছেড়ে গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। দিশেহারা হাজার হাজার লোক পালিয়ে পদ্মা নদীর ধারে চলে এসেছে, কিন্তু নদী পার হতে পারছে না। এদের মধ্যে প্রায় দেড় হাজার লোককে নদীর ধারে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে মাত্র চার-পাঁচ শ গজ দূরে ঘাসের নৌকা ও আমি।
ঘণ্টা খানেক পর পদ্মার অপর পারে পৌঁছাই। সঙ্গে কিছু নেই। ভেজা প্যান্ট ও শার্ট।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY