শিশু হত্যাকারীরা ঘৃণ্য জীব: প্রধানমন্ত্রী

0
344

শিশুহত্যার ঘটনায় ক্ষোভ ও ধিক্কার জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশে শিশুহত্যার প্রবণতা বেড়ে গেছে। মানুষের মধ্যে এত জিঘাংসা কেন? যারা শিশু হত্যা করে, তারা সমাজের সবচেয়ে ঘৃণ্য জীব। এর চেয়ে জঘন্য, নোংরামি কাজ আর কী হতে পারে?
শেখ হাসিনা আশা প্রকাশ করে বলেন, যারা শিশুহত্যায় জড়িত, আদালত তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেবেন। একই সঙ্গে তিনি হত্যাকারীদের ধরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, প্রত্যেককেই নিজ নিজ এলাকায় দৃষ্টি দিতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে হবে।
গতকাল সোমবার সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ সম্পর্কে আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে এবং চলতি সংসদের নবম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনে না এসে রাজনৈতিক ভুল করেছে। কিন্তু এর খেসারত জনগণ দেবে কেন? তাদেরই সেই খেসারত দিতে হবে। তাদের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের জন্য স্থানীয় নির্বাচনেও জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করছে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ২০২১ সাল নাগাদ ২৪ হাজার এবং ২০৪১ সাল নাগাদ ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়লেও দেশে বিনিয়োগ বাড়ায় চাহিদা বেড়েছে। তিনি বিদ্যুৎ ব্যবহারে সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের একপর্যায়ে ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর সমালোচনা করে বলেন, মিডিয়ার জন্য তিনি যত বেশি সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন, কখনো কেউ তা দেয়নি। তারপরও তিনি সব থেকে বেশি ভুক্তভোগী।
সংসদ নেতা বলেন, ‘দুটি পত্রিকা ২০টা বছর অনবরত আমার বিরুদ্ধেই লিখে গেছে। ২০০৮ সালে আমি বন্দিখানা থেকে বের হওয়ার পর থেকে এ দুটি পত্রিকা পড়ি না। কারণ, আমি জানি, এরা সব সময় এমনকি একটা ভালো কথা লিখলেও শেষ বেলায় গিয়ে একটা খোঁচা দেবে। আর এ খোঁচা খেয়ে আমি হয়তো আমার আত্মবিশ্বাস হারাব।’
শেখ হাসিনা বলেন, ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো। নামগুলি সুন্দর। ডেইলি স্টার মানে আকাশের তারা। প্রথম আলো মানে আলো ফুটেই বের হয়। আর তাদের কাজ হলো অন্ধকারের কাজ। অন্ধকারের কাজটা কী, ডিজিএফআইয়ের লেখা ছাপানো। তিনি বলেন, ষড়যন্ত্রের প্রথম আঘাতটা এল তাঁর ওপর। বিরোধী দলের নেতা থাকার পরও গ্রেপ্তারটা তাঁকেই আগে করা হলো। তারপর একটার পর একটা মামলা। বিএনপির আমলে এক ডজন মামলা দিয়ে দিয়েছিল, মিথ্যা মামলা। আর তত্ত্বাবধায়ক এসে আরও পাঁচ-ছয়টা মামলা দিয়ে দিল।
সংসদ নেতা বলেন, ‘এই মামলা দেওয়া এবং গ্রেপ্তারের আগে ওই পত্রিকা সমানে আমাকে দুর্নীতিবাজ বানানোর জন্য মিথ্যা কথাগুলো লিখে গেছে। আর সেই অসত্য তথ্যের সাপ্লায়ার কে? ডিজিএফআই। ডিজিএফআইয়ের কারা? ওই ১/১১-এর ডিজিএফআইয়ের দুই অফিসার একজন ব্রিগেডিয়ার আমিন, আরেকজন ব্রিগেডিয়ার বারী। তাদের অত্যাচারে এ দেশের শিক্ষক, ছাত্র, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে কেউই রেহাই পায়নি। প্রত্যেকের ওপরই অত্যাচার করেছে। যখন যাকে খুশি ধরো, যখন যাকে খুশি জেলে পোরো, যাকে খুশি অত্যাচার করো, নির্যাতন করো। সেগুলি তারা করে গেছে। তাহলে যারা সে সময় এভাবে শিক্ষকদের ওপর অত্যাচার করেছে, যারা ছাত্রদের ওপর অত্যাচার করেছে, ব্যবসায়ীদের ওপর অত্যাচার করেছে, রাজনীতিবিদদের ওপর অত্যাচার করেছে তাদের সাথে কী এমন সখ্যতা ওই এডিটরের ছিল, আমি সেটাই প্রশ্ন করি। মাহ্ফুজ আনাম সম্পাদক, তাঁর কাছে আমার প্রশ্ন, সে কি তার উত্তর দিতে পারবে? বা প্রথম আলোর মতিউর রহমান কি উত্তর দিতে পারবে? যে এত সখ্যতা কেন? তাহলে একটা প্রশ্ন জাগে, হয় গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল এদের সাথে মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়ন করার জন্য বা রাজনীতি থেকে চিরতরে বিদায় করে দেওয়ার জন্য অথবা নির্ভীক সাংবাদিকতা না ডিজিএফআইয়ের এজেন্ট হিসেবেই কাজ করেছে তারা?’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাজনীতি করার যদি ইচ্ছা থাকে, ক্ষমতায় যাওয়ার যদি ইচ্ছা থাকে, তো নিজেরা দল গঠন করে রাস্তায় নামুক। আমরা তো রাস্তায় নেমেছি, পুলিশের বাড়ি খেয়েছি। বারবার কারাবরণ করেছি, নির্যাতিত হয়েছি। জনগণের কথা বারবার বলেছি, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, যখন আমাকে আসতে দেয়নি, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফিরে এসেছি। জানি হয় জেল হবে, না হয় মৃত্যু হবে। মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে আমরা রাজনীতি করেছি। সর্বদা জীবনের ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থেকেছি। রাজনীতি করার যদি এত শখ থাকে, আর ক্ষমতায় যাওয়ার যদি শখ থাকে, তো মানুষের ভোট নিয়ে আসুক। মানুষের ভোটে বিশ্বাস নাই, জনগণে বিশ্বাস নাই, ওই ডিজিএফআইয়ের সাথে ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন দেখে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই স্বপ্নের সঙ্গে আবার আরেকজনও জড়িত। যিনি দল করার চেষ্টা করে ঘোষণা দিলেন। আর তাঁর দেওয়া তালিকা নিয়ে একজন সম্পাদক নেমে পড়লেন দলের লোক গোছাতে। কেউ আসে না। সাড়া দেয় না। তিনি বলেন, ‘সেই ভদ্রলোককে মোবাইল ফোনের ব্যবসাটা আমিই দিয়েছিলাম।’
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম উল্লেখ না করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৬০ বছর পর্যন্ত আইনত ব্যাংকের এমডি থাকা যায়। কিন্তু আইন লঙ্ঘন করে তিনি প্রায় ৭০ বছর বয়স পর্যন্ত ব্যাংকের এমডি থাকলেন। তাঁকে আরও মর্যাদা দেওয়ার কথা বলা হলো। অ্যাডভাইজার ইমেরিটাস করা হবে, উনি তা না শুনে মামলা করলেন হাইকোর্টে সরকারের বিরুদ্ধে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে, সবার বিরুদ্ধে। কোর্ট দেখল, উনি আরও বেশি ১০ বছর বেশি থেকে গেছেন। কোর্ট তাঁকে বললেন যে আপনি আর থাকতে পারবেন না। আর সেই এমডি পদ হারানোর ক্ষোভ গিয়ে পড়ল পদ্মা সেতুর ওপর। আমেরিকাকে বলে পদ্মা সেতুর টাকা বিশ্বব্যাংক বন্ধ করে দিল শুধু এই একটা কারণে। আর বলল, দুর্নীতি ষড়যন্ত্র হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘কোথায় দুর্নীতি হয়েছে। বারবার যখন আমি বলছি যে, প্রমাণ দিতে হবে। সেই প্রমাণ তারা দেখাতে পারে নাই। কানাডা কোর্টে মামলা, কানাডাও তাদের কাছে প্রমাণ চেয়েছে, সেই প্রমাণ কিন্তু দেখাতে পারে নাই। তাহলে একটা এমডির পদ হারাবার ক্ষোভে আগুনে জ্বলল আমার বাংলাদেশে। তাহলে এত বড় আন্তর্জাতিক খেতাবের কী মূল্য আছে?’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এদের ষড়যন্ত্রের এখনো শেষ নাই। কিন্তু বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। যে যতই ষড়যন্ত্র করুক বাংলাদেশের এ অগ্রযাত্রা কেউ রোধ করতে পারবে না।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আরও আলোচনা করেন বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পর রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত হয়। এ সময় স্পিকার জানান, ২৭ কার্যদিবস স্থায়ী এই অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ২১১ জন সাংসদ ৫৩ ঘণ্টা ৪৬ মিনিট আলোচনা করেন। প্রধানমন্ত্রীর উত্তর দেওয়ার জন্য মোট ৩০০টি প্রশ্ন পাওয়া যায়। এর মধ্যে তিনি ৮৯টি প্রশ্নের উত্তর দেন। এরপর স্পিকার অধিবেশনের সমাপ্তি-সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির ঘোষণা পড়ে শোনান।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY